বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দেশের বহু নদী আজ মৃতপ্রায়। বিশেষ করে, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলো শুষ্ক মৌসুমে পানিশূন্য হয়ে পড়ে। খুলনা, সাতক্ষীরা, যশোর, বাগেরহাট, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, গোপালগঞ্জ, রাজবাড়ীসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এখন নদী আছে, কিন্তু প্রবাহ নেই; খাল আছে, কিন্তু পানি নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও লবণাক্ততার বিস্তার।
এই সংকট শুধু পরিবেশগত নয়; এটি খাদ্যনিরাপত্তা, পানি নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য, জীবিকা ও ভবিষ্যৎ অর্থনীতির সংকট। তাই পদ্মা ব্যারাজ এখন আর শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়, এটি দক্ষিণাঞ্চলকে টিকিয়ে রাখার দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় কৌশল।
কেন পদ্মা ব্যারাজ অপরিহার্য?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফারাক্কা ব্যারাজ চালুর পর থেকেই শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকায় পানিপ্রবাহে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৩৪-১৯৭৪ সময়কালের তুলনায় ১৯৭৫-২০০৫ সময়ে ডিসেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত গঙ্গা-পদ্মা নদীর প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে। গড়াই নদীর প্রবাহ কমে যাওয়ায় খুলনা অঞ্চলে লবণাক্ততা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। নদীতে মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়ার ফলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, সুপেয় পানির সংকট তৈরি হচ্ছে, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বাড়ছে, মাছের প্রজনন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, নদীর নাব্যতা কমছে এবং সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র ঝুঁকির মুখে পড়ছে। একসময় দক্ষিণাঞ্চল ছিল নদী, মাছ ও উর্বরতার প্রতীক। নদীর বুকজুড়ে চলত নৌকা, খাল-বিল ভরা থাকত মাছের প্রাচুর্যে। অথচ আজ অনেক নদী শুধু চর আর পলিতে ভরাট। এই বাস্তবতায় পদ্মা ব্যারাজের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে পানি সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রিত প্রবাহ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
কৃষিতে আসতে পারে নতুন বিপ্লব
বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার বড় শক্তি কৃষি। কিন্তু দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশাল কৃষিজমি এখনও পুরোপুরি ব্যবহৃত হচ্ছে না। লবণাক্ততা ও পানির অভাবে অনেক জমি এক ফসলি হয়ে পড়েছে, কোথাও আবার জমি অনাবাদি থাকে। একসময় এধহমবং-কড়নধফধশ ওৎৎরমধঃরড়হ চৎড়লবপঃ দেশের অন্যতম বৃহৎ সেচ প্রকল্প ছিল। প্রায় ১ লাখ ২১ হাজার হেক্টরের বেশি জমি এই প্রকল্পের আওতায় সেচ সুবিধা পেত। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে পানির স্তর কমে যাওয়ায় অনেক পাম্প অকার্যকর হয়ে পড়ে। পদ্মা ব্যারাজ কার্যকর হলে দক্ষিণাঞ্চলে সেচব্যবস্থা সম্প্রসারিত হবে। বছরে একাধিক ফসল উৎপাদন সম্ভব হবে। ধান ছাড়াও গম, ভুট্টা, ডাল, তেলবীজ, সবজি ও ফল উৎপাদনে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। বাংলাদেশের জনসংখ্যা বাড়ছে, খাদ্যচাহিদাও বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় ভবিষ্যতের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দক্ষিণাঞ্চলের কৃষিকে পুনর্জীবিত করা অত্যন্ত জরুরি।
মৎস্যসম্পদ পুনরুদ্ধারে বড় সম্ভাবনা
বাংলাদেশের সংস্কৃতি, পুষ্টি ও অর্থনীতির সঙ্গে মাছ গভীরভাবে জড়িত। কিন্তু নদীতে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় দেশীয় মাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, গঙ্গা অববাহিকার স্বাভাবিক স্রোত, ঘোলাভাব, পুষ্টিগুণ ও লবণাক্ততার ভারসাম্য নষ্ট হওয়ায় মাছের প্রজনন ক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একসময় এই নদীব্যবস্থায় ২০০টির বেশি স্বাদুপানির মাছ এবং অন্তত ১৮ প্রজাতির চিংড়ির আবাস ছিল। বর্তমানে অনেক দেশীয় মাছ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে। পদ্মা ব্যারাজের মাধ্যমে যদি নদীতে সারা বছর ন্যূনতম প্রবাহ বজায় রাখা যায়, তাহলে দেশীয় মাছের প্রজনন বৃদ্ধি পাবে, জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাবে এবং নদীনির্ভর মৎস্যসম্পদ পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হবে। এটি শুধু পরিবেশগত বিষয় নয়; এর সঙ্গে লাখো জেলের জীবন-জীবিকা জড়িত।
লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর সমাধান
দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো লবণাক্ততা। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, নদীতে মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়া এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। গবেষণায় খুলনা অঞ্চলের রূপসা নদীতে ক্লোরাইডের মাত্রা ৫৬৩.৭৫ মিলিগ্রাম/লিটার পর্যন্ত পাওয়া গেছে। অনেক এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানিতে ঞড়ঃধষ উরংংড়ষাবফ ঝড়ষরফং (ঞউঝ) ১,২০০ মিলিগ্রাম/লিটার ছাড়িয়েছে, যেখানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গ্রহণযোগ্য সীমা ৫০০ মিলিগ্রাম/লিটার। ফলে কৃষিজমি অনাবাদি হচ্ছে, সুপেয় পানির সংকট বাড়ছে এবং জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে পড়ছে। বিশেষ করে নারীরা দূর-দূরান্ত থেকে পানি সংগ্রহে সবচেয়ে বেশি কষ্ট ভোগ করেন। যদি পদ্মা ব্যারাজের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত মিঠাপানি সরবরাহ করা যায়, তাহলে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হতে পারে।
সুন্দরবন রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ
বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন ঝঁহফধৎনধহং বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সুরক্ষাবর্ম। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থেকে উপকূলকে রক্ষা করতে সুন্দরবনের ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু এই বনও আজ সংকটে। নদীতে মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় লবণাক্ততা বাড়ছে, যা সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় হুমকি। পরিবেশবিদদের মতে, সুন্দরবনকে টিকিয়ে রাখতে হলে নিয়মিত মিঠাপানির প্রবাহ নিশ্চিত করা জরুরি। পদ্মা ব্যারাজ সেই সুযোগ তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ এই প্রকল্প শুধু মানুষের জন্য নয়; বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
নদী বাঁচলে অর্থনীতিও বাঁচবে
বাংলাদেশের অর্থনীতি ঐতিহাসিকভাবে নদীকেন্দ্রিক। নদী শুধু পানির উৎস নয়; এটি পরিবহন, কৃষি, বাণিজ্য ও সংস্কৃতির অংশ। কিন্তু নদীতে পানি কমে যাওয়ায় নাব্যতা নষ্ট হচ্ছে। তথ্য অনুযায়ী, শুষ্ক মৌসুমে প্রায় ৩২০ কিলোমিটারের বেশি নৌপথ অকার্যকর হয়ে পড়ে। এতে নদীনির্ভর অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং হাজার হাজার মাঝি ও নৌযানশ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েন। যদি নদীতে স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় থাকে, তাহলে নৌপরিবহন সহজ হবে, পলি ব্যবস্থাপনা উন্নত হবে এবং নদীর প্রাণ ফিরে আসবে। এতে পরিবহন ব্যয় কমবে, আঞ্চলিক বাণিজ্য বাড়বে এবং অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। আগামী কয়েক দশকে পানি ব্যবস্থাপনা হবে জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্বব্যাপী এখন ডধঃবৎ ঝবপঁৎরঃু বা পানি নিরাপত্তাকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। কারণ, ভবিষ্যতের খাদ্যসংকট, অভিবাসন ও সামাজিক অস্থিরতার সঙ্গে পানির সম্পর্ক গভীর। বাংলাদেশ যদি এখন থেকেই দীর্ঘমেয়াদি পানি অবকাঠামো গড়ে তুলতে না পারে, তাহলে ভবিষ্যতে সংকট আরও তীব্র হবে। পদ্মা ব্যারাজ সেই দীর্ঘমেয়াদি অভিযোজন কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।
তবে একটি বাস্তবতা স্বীকার করতে হবে, ব্যারাজ নির্মাণ মানেই সব সমস্যার সমাধান নয়। বিশ্বের অনেক দেশে অপরিকল্পিত বাঁধ ও ব্যারাজ পরিবেশগত বিপর্যয়ও তৈরি করেছে। তাই পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক, বিজ্ঞানভিত্তিক ও সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে অবশ্যই পূর্ণাঙ্গ পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন করতে হবে, যাতে নদী, জীববৈচিত্র্য, কৃষি ও স্থানীয় জনজীবনের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব সঠিকভাবে নিরূপণ করা যায়। একই সঙ্গে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখা এবং কার্যকর পলি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নদীর প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। মাছের স্বাভাবিক চলাচল ও প্রজনন নিশ্চিত করতে আধুনিক ফিশ প্যাসেজ নির্মাণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া স্থানীয় জনগণের মতামত ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, এই প্রকল্পের সুফল ও প্রভাব সবচেয়ে বেশি বহন করবে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ। বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও পরিবেশবিদদের সমন্বিত পরিকল্পনার। এ প্রকল্পের সফলতার জন্য অপরিহার্য।
বাংলাদেশ একসময় ভাবা হতো, পদ্মা সেতু হয়তো সম্ভব নয়। কিন্তু আজ সেই সেতুই দেশের উন্নয়নের প্রতীক। পদ্মা ব্যারাজও তেমন একটি দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা হতে পারে, যা আগামী ৫০ বছরের পানি, কৃষি, মৎস্য ও পরিবেশ নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, নদী শুকিয়ে গেলে শুধু পানি হারায় না; হারায় কৃষি, মাছ, সংস্কৃতি, জীবিকা ও ভবিষ্যৎ। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে এখনই বড় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারণ পানি নিয়ে যে বৈশ্বিক সংকট শুরু হয়েছে, তা ভবিষ্যতে আরও তীব্র হবে। পদ্মা ব্যারাজ সেই লড়াইয়ের প্রস্তুতি হতে পারে—যদি এটি হয় বিজ্ঞানসম্মত, পরিবেশবান্ধব এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থনির্ভর।
লেখক: সিনিয়র প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট (ফিশারিজ), সার্ক কৃষি কেন্দ্র, ঢাকা।