বিএনপি জোট সরকার জনগণের অধিকার নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শুক্রবার 'শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদৎবার্ষিকী উপলক্ষে' এক বাণীতে তিনি এ মন্তব্য করেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, জনমনে ভয় আর আতঙ্ক সৃষ্টি করে আওয়ামী ফ্যাসিবাদ দীর্ঘ ১৭ বছর ক্ষমতা আঁকড়ে রেখেছিল। জনগণের ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে বন্দি করেছিলো ফ্যাসিবাদের কারাগারে। গুম, খুন, নির্যাতন ও জুলুম ছিল পতিত ফ্যাসিবাদের ক্ষমতায় টিকে থাকার একমাত্র হাতিয়ার। দেশের সম্পদ বিদেশে পাচার করে এক লুটেরা মাফিয়া অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করেছিল পরাজিত আওয়ামী ফ্যাসিস্ট শাসকগোষ্ঠী। এমতাবস্থায় অপহৃত গণতন্ত্র পুণরুদ্ধারে ছাত্র, শ্রমিক ও জনতাসহ সকল গণতন্ত্রকামী মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে গত ৫ই আগস্ট ২০২৪ তারিখ শেখ হাসিনার পতন ঘটায়।
তিনি বলেন, ছাত্র-জনতার রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বিজয়কে এখন পূর্ণাঙ্গ রুপ দিতে হবে। অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি জোট সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহিতা, প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, পরমতসহিষ্ণুতাসহ সকল নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। গণতন্ত্রকে স্থীতিশীল ও স্থায়ী রুপ দেয়ার জন্য রাষ্ট্রের গণতান্ত্রির প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। জাতীয় জীবনের সকল সংকট, সংগ্রাম ও বিনির্মাণে শহীদ জিয়ার প্রদর্শিত পথ ও আদর্শ বুকে ধারণ করেই আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে এবং জাতীয় স্বার্থ, বহুমাত্রিক গণতন্ত্র এবং জনগণের অধিকার সুরক্ষায় ইস্পাতকঠিন গণঐক্য গড়ে তুলতে হবে।
ফখরুল বলেন, মহান স্বাধীনতার ঘোষক, বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুন:প্রবর্তনকারী, ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ এই কালজয়ী দর্শনের প্রবক্তা, আধুনিক বাংলাদেশের রুপকার, অবিসংবাদিত রাষ্ট্রনায়ক, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদৎবার্ষিকীতে আমি তাঁর অম্লান স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা এবং তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। শহীদ জিয়ার প্রদর্শিত পথ, দর্শন ও কর্মসূচি আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সুসংহতকরণ, বহুদলীয় গণতন্ত্র এবং দেশীয় উন্নয়ন ও অগ্রগতির রক্ষাকবচ।
এপ্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, তার জীবনকালে স্বজাতির চরম ক্রান্তিকালে জিয়াউর রহমান দেশ ও জনগণের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেছেন। চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার ও জেডফোর্সের অধিনায়ক জিয়াউর রহমান ইতেহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়ে জাতির ইতিহাসে এক বীর নায়কের স্থান অর্জন করেছেন। ২৬শে মার্চ তার স্বাধীনতার ঘোষণার অভয়মন্ত্রে দেশের তরুণ ছাত্র, শ্রমিক ও যুবকসহ নানা স্তরের মানুষ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ফলশ্রুতিতে হানাদার বাহিনীর ধ্বংসের শক্তি প্রতিহত করে দেশবাসী বিজয়ের দিকে ধাবিত হয়।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, বিজয়ের পরে তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর অগণতান্ত্রিক দমনমুলক শাসন শোষনের যাঁতাকলে দেশের মানুষ ভয়াবহ অরাজকতার মধ্যে পতিত হয়। মানুষের নাগরিক অধিকারগুলো হরণ করা হয়, গণতন্ত্রকে দেয়া হয় কবর। নির্মম একদলীয় দু:শাসন আইন করে চালু করা হয়। সংবাদপত্রের স্বাধীনতাসহ মানুষের বাক ও চিন্তার স্বাধীনতাকে মুছে দেয়া হয় স্বেচ্ছাচারি আক্রমণে। একদলীয় প্রভুত্ববাদের অধীনতার নাগপাশে বন্দী করা হয় সারা জাতিকে।
তিনি বলেন, চলমান নৈরাজ্যের সেই সময়ে সিপাহী ও জনতা মিলিত হয়ে রাজ পথে গড়ে তুলে প্রবল প্রতিরোধ। সিপাহি জনতার মিলিত শ্রোতে জিয়াউর রহমানকে বন্দিদশা থেকে মুক্তি করা হয়। জিয়াউর রহমান জাতীয় রাজনীতির পাদপ্রদীপের আলোয় অভিসিক্ত হন। জিয়া রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেই ফিরিয়ে দেন বহুদলীয় গণতন্ত্র এবং সংবাদপত্রসহ নাগরিক স্বাধীনতা। গণতন্ত্রের ঐতিহাসিক সার্থকতা নিশ্চিত করেন। শুরু করেন স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে উৎপাদনের রাজনীতির মাধ্যমে দেশকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা। বাংলাদেশকে তলাবিহীন ‘ঝুড়ির’ আখ্যা থেকে খাদ্য রপ্তানীকারক দেশে পরিণত করেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, ব্যক্তিজীবনেও দুর্নীতি, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি ও সুবিধাবাদের কাছে আত্মসমর্পণকে তিনি ঘৃণা করতেন। তার অন্তর্গত স্বচ্ছতা তাকে দিয়েছে এক অনন্য ঈর্ষণীয় উচ্চতা। তার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংস্কারের কারণেই বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথচলা শুরু হয় এবং অর্থনীতি মজবুত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়।
তিনি আরও বলেন, এই মহান জাতীয়তাবাদী নেতার জনপ্রিয়তা দেশী-বিদেশী চক্রান্তকারী শক্তি কখনোই মেনে নিতে পারেনি। ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই দেশবিরোধী চক্র তার বিরুদ্ধে নীলনকশা আঁটতে শুরু করে। এই চক্রান্তকারীরা ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে নির্মমভাবে হত্যা করে। এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে একজন মহান দেশপ্রেমিককে দেশবাসী হারায়।
ফখরুল বলেন, চক্রান্তকারীরা যতই চেষ্টা করুক কোন ক্ষণজন্মা রাষ্ট্রনায়ককে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিলেই তিনি বিস্মৃত হন না বরং নিজ দেশের জনগণের হৃদয়ে চিরজাগরুক হয়ে অবস্থান করেন। তার সহধর্মিণী আপোশহীন দূরতা নিয়ে মরহুমা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া শহীদ জিয়ার প্রদর্শিত পথ ধরেই বহুদলীয় গণতন্ত্র, দেশের উন্নয়নের ধারাকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন গণতন্ত্র ও দেশবিরোধী শক্তিকে মোকাবিলা করে। নিখাদ দেশপ্রেমিক শহীদ জিয়াকে কখনো তার বিশ্বাস থেকে বিন্দুমাত্র টলানো যায়নি। তিনি সারাজীবন আদর্শকে বুকে ধারণ করে নিরবচ্ছিন্নভাবে এগিয়ে গেছেন আধুনিক রাষ্ট্র বিনির্মাণের পথে।
তিনি বলেন, রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা, নির্ভিক নির্মোহ রাষ্ট্রনায়ক শহীদ জিয়ার আদর্শ, দেশপ্রেম, সততা ও কর্মনিষ্ঠা আজ জাতীয়তাবাদী শক্তির প্রেরণার উৎস। এবার ৩০ মে মহান নেতার শাহাদৎবার্ষিকী সর্বস্তরে ব্যাপকভাবে যথাযথ মর্যাদায় উদযাপনের জন্য দল, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী, সমর্থক, শুভানুধ্যায়ী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন সমূহসহ সকল স্তরের জনগণের প্রতি আমি উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি।