জুলাই স্মৃতি জাদুঘর নিয়ে মানুষের ব্যাপক আগ্রহ লক্ষ করা গেছে। প্রতিদিনই হাজারো দর্শনার্থী টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকছেন। উদ্বোধনের পর থেকে প্রতিদিন জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে গড়ে ছয় হাজারের বেশি দর্শনার্থী প্রবেশ করছেন। যেসব দর্শনার্থী ঢুকছেন-দেখছেন, তাদের কাছ থেকে আসছে নানা পরামর্শ-মতামত। বিভিন্ন ধর্মীয় দলের প্রতিনিধি ও বিশিষ্টজনরাও তাদের বক্তৃতা-বিবৃতিতে বিভিন্ন সংযোজন-বিয়োজনের কথা বলেছেন। জাদুঘরে রাখা ভাস্কর্য নিয়ে মতামত দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, হেফাজতে ইসলাম ও খেলাফত মজলিস। খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক শাপলা চত্বরের গণহত্যার স্মৃতি সংরক্ষণে সেখানে থাকা ভাস্কর্যের মুখাবয়ব যাতে বোঝা না যায়, সেভাবে পুনঃস্থাপনের আহ্বান জানিয়েছেন। হেফাজতে ইসলাম ভাস্কর্যগুলো অবিলম্বে সরিয়ে ফেলার আহ্বান জানিয়েছে। জামায়াতও ভাস্কর্য সরিয়ে ফেলার কথা বলেছে। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী নিজেও জুলাই জাদুঘর নিয়ে তার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন।
জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে হেফাজতের নেতাকর্মীদের অবয়বে স্থাপিত ভাস্কর্য অবিলম্বে অপসারণের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। এক বিবৃতিতে হেফাজতের আমির আল্লামা শাহ মুহিববুল্লাহ বাবুনগরী ও মহাসচিব আল্লামা শায়েখ সাজিদুর রহমান বলেন, মানুষের ভাস্কর্য নির্মাণ শরিয়তবিরোধী। আলেমদের স্মৃতি রক্ষার নামে ভাস্কর্য স্থাপন তাদের আত্মত্যাগের সঙ্গেও বৈপরীত্যপূর্ণ। ইতিহাস সংরক্ষণে ভাস্কর্যের পরিবর্তে লিখিত ইতিহাস, প্রামাণ্য দলিল ও নথি সংরক্ষণ এবং পাঠ্যপুস্তকে এসব ইতিহাস অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব দিয়েছে হেফাজত। ভাস্কর্য অপসারণে গড়িমসি করা হলে আলেম সমাজ নীরব থাকবে না বলেও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ যুগান্তরকে বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান ইসলামের বাইরে নয়। দৃশ্যমান মূর্তি ইসলামের দৃষ্টিতে আপত্তিকর, ওগুলোর প্রতি সম্মান প্রদর্শন পূজার শামিল। আমরা এর প্রতিবাদ করি। বিগত সময়ে দেশের বিভিন্ন রাস্তার মোড়ে মূর্তি স্থাপন করা হয়েছিল। জনগণ এর প্রতিবাদ করেছে।’ তিনি বলেন, ‘জুলাই আন্দোলন, শাপলা ও পিলখানা হত্যাকাণ্ড, এগুলো আমাদের আবেগের জায়গা।’ এর আগে যুগান্তররের উদ্যোগে জুলাই আন্দোলন নিয়ে এক সেমিনারে অংশ নিয়ে সাংবাদিক ও সাবেক সামরিক কর্মকর্তা আবু রূশ্দ বলেন, ‘বহু সেনা কর্মকর্তা ও তাদের সন্তান আন্দোলনে ছিল। ফলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে সেনাসদস্যদের অবদান থাকতে পারত। কিন্তু তা যুক্ত করা হয়নি।’
এতসব বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী যুগান্তরকে বলেন, ‘জাদুঘরের কাজ একটি চলমান প্রক্রিয়া। একবারে দাঁড়িয়ে যাওয়ার ব্যাপার না। উদ্বোধনের পর প্রতিনিয়ত নতুন নতুন জিনিস যুক্ত করতে হবে। পরিকল্পনাই ছিল একটা রিসার্চ সেলের মাধ্যমে এই জাদুঘরে প্রতি মাসে নতুন নতুন জিনিস যুক্ত করা হবে।...আমরা যখন দায়িত্ব ছেড়ে আসি, আমার হিসাবে তখনও আরও দুই মাসের কাজ বাকি ছিল। এখানে কাজ বলতে দুই রকম কাজ বোঝাচ্ছি। কিউরেটরিয়াল কাজ এবং প্রশাসনিক কাজ। প্রশাসনিক দিক থেকে বাকি ছিল নিয়োগের কাজ। এই জাদুঘর বানানোর সময় আইডিয়াটা ছিল প্রত্যেক সেকশনে এক্সপ্লেইনার থাকবে। এরাই হবে জাদুঘরের প্রাণ। তাদের মুখে বলা ন্যারেশন এবং প্রদর্শিত হওয়া এগজিবিট-দুটি মিলিয়ে ভিজিটরকে একটা ইমারসিভ এক্সপেরিয়েন্স দেবে। এক্সপ্লেইনার ছাড়াই দেখলাম জাদুঘর চালু হয়েছে। পাঁচ মাস পাওয়া গেলেও আসলে কোনো নিয়োগই দেওয়া হয়নি। এমনকি ঝাড়ুদার, ক্লিনারও না।’
তিনি বলেন, ‘কিউরেটরিয়াল কাজের মধ্যে বাকি ছিলো সব শহীদের স্মারকের সঙ্গে পরিবারের শোক এবং বিচ্ছেদের গল্প যুক্ত করা। জুলাই রেকর্ডস নামে একটা প্ল্যাটফর্ম এ বিষয়ে দারুণ কাজ করছিল। তাদের সঙ্গে আমাদের কোলাবরেশনের মাধ্যমে শহীদদের সেকশনটাকে আরও যুক্ত করার পরিকল্পনা ছিল। যাতে স্রেফ স্মারক না রেখে প্রত্যেক শহীদের এবং তার পরিবারের গল্পটাও বলতে পারি। আমরা থাকাকালীন এই কাজটা মাঝ পর্যায়ে ছিল। আমাদের পরিকল্পনা ছিল ঢাকার বাইরের জেলাগুলোর আন্দোলন নিয়ে একটা আলাদা সেকশন করা। প্রবাসীদের নিয়ে আলাদা একটা সেকশন করার পরিকল্পনা ছিল। ডাক্তারদের ভূমিকাকেও যুক্ত রাখার কথা ছিল।’
সাবেক এই উপদেষ্টা বলেন, “সেনা সদস্যদের ভূমিকার অংশটা বাকি ছিল। কারণ, ওটা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো এখনো আছে, তবে কমপ্লিট সেকশন হিসাবে না। বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তর নিয়ে একটা সেকশন করার কথা ছিল, যাতে ফ্যাসিবাদের জেনেসিস বোঝা যায়। ‘জার্নালিজম আন্ডার ফ্যাসিজম’ নামে একটা সেকশন করার কথা ছিল।”
প্রতিদিন গড়ে ৬ হাজারের বেশি দর্শনার্থী আসছে : ছুটির দিনগুলোয় জাদুঘরে বেশি দর্শনার্থী আসছেন। অন্যান্য দিনও ভিড় চোখে পড়ার মতো। শনিবার প্রায় ৭ হাজার ৮৬০ জন দর্শনার্থী জাদুঘর পরিদর্শন করেছেন। শুক্রবার দর্শনার্থীর সংখ্যা ছিল ১০ হাজারের কিছু বেশি। রোববার কর্মদিবসেও দর্শনার্থী ৬ হাজারের বেশি ছিল। এছাড়া টিকিট ছাড়া প্রবেশের সংখ্যাটা যুক্ত করলে প্রকৃত দর্শনার্থীর সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলেও জানান জাদুঘরসংশ্লিষ্টরা। রোববার বিকাল সাড়ে ৫টায় টিকিট সংগ্রহের শেষ সময়েও কাউন্টারে ছিল ভিড়। পরিবার, বন্ধু ও প্রিয়জনদের সঙ্গে আসা দর্শনার্থীদের পাশাপাশি তরুণ-তরুণীদের জাদুঘরের নানা দৃশ্য দেখার পাশাপাশি আয়নাঘর, গণকবর, জুলাই যুদ্ধের নানা স্মারক, ভাস্কর্যসহ বিভিন্ন স্থাপনার সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে দেখা গেছে।
সাভার কলেজ থেকে আগত শিক্ষার্থী রফিক মোল্লা জানান, তিনি পুরো জাদুঘর ঘুরেছেন। ১৬ বছরের আওয়ামী শাসনামল দারুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। তবে কষ্ট লাগে এই ভেবে যে, এখানে এলে অনেক মানুষ হারানোর গল্প মনে পড়ে যায়।