ছবির উৎস, Serenity Strull/BBC
ছবির ক্যাপশান,
প্রতীকী চিত্র
Author,
স্যান্ডি ওং
Role,
বিবিসি নিউজ
৩ ঘন্টা আগে
পড়ার সময়: ৯ মিনিট
আপনার ঋতুস্রাবের রক্তই জানিয়ে দেবে আপনি কেমন আছেন, কিংবা কোন কোন রোগ আপনার শরীরে ঘাপটি মেরে রয়েছে।
এন্ডোমেট্রিওসিস বা জরায়ুর বাইরে টিস্যু বৃদ্ধি, জরায়ুর ক্যান্সার থেকে ডায়াবেটিস, ভিটামিন ডি-এর অভাব, এমনকি দূষণের কারণে শারীরিক পরিবর্তন - এই সব কিছুরই হদিশ দিতে পারে প্রতি মাসে মহিলাদের শরীর থেকে বেরিয়ে আসা পিরিয়ডের রক্ত।
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় তেমনই প্রমাণ পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
বাকি সব নারীদের মতো এমা ব্যাকলুন্ডও তার ঋতুস্রাবের বিষয়ে বেশি কিছু ভাবতে চাননি।
কিন্তু ২০২৩ সালে 'নেক্সটজেন জেন' নামে এক বায়োটেক স্টার্টআপ যখন তার থেকে এক মাসের পিরিয়ডের রক্তের নমুনা সংগ্রহ করতে চায়, তিনি আটটি ট্যাম্পন (রক্ত শোষণের জন্য ব্যবহৃত তুলার এক ধরনের পট্টি) ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডে সংস্থাটির গবেষণাগারে পরীক্ষার জন্য পাঠিয়ে দেন।
যদিও এটা খুব স্বাভাবিক অনুরোধ নয়, তবুও তিনি স্বচ্ছন্দেই তার রক্তের নমুনা পাঠান। এর ফলে ভবিষ্যতে অন্য নারীদের সাহায্য হতে পারে, সে কথা ভেবেই তিনি পাঠিয়ে দেন নমুনা।
"আমার যখন ১১ বছর বয়স তখন আমার মনে হয়েছিল আমি মরেই যাব," বলছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটার বাসিন্দা, ২৭ বছর বয়সী গ্রাজুয়েট ছাত্রী এমা, ঋতুস্রাবের সময় ছোটবেলায় প্রতি মাসে একই রকম কষ্ট পেতেন বলেও জানান তিনি।
"আমার মনে আছে আমি আমার মাকে বলতাম আমাকে হাসপাতালে নিয়ে চলো। অতিরিক্ত পেটে ব্যাথার কারণে প্রতি মাসে আমার মনে হত আমি হয়ত আর বাঁচব না। মনে হত আমার পেট কেউ যেন কেটে ফালাফালা করে দিচ্ছে। ওই সময়ে স্কুল যেতে পারতাম না, কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারতাম না"।

ছবির উৎস, Getty Images
এমার ১৩ বছর সময় লেগেছিল জানতে যে তিনি এন্ডোমেট্রিওসিসে আক্রান্ত, যেটি একটি দীর্ঘস্থায়ী ও দুর্বল করে দেওয়া ব্যাধি। এর ফলে জরায়ুর টিস্যুর আস্তরণ বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। এই ব্যাধিতে বিশ্বব্যাপী ১৯ কোটি মানুষ আক্রান্ত, যা প্রজনন বয়সের নারীদের প্রায় দশ শতাংশ।
এন্ডোমেট্রিওসিসে আক্রান্ত নারীরা অধিকাংশই ভারী ও যন্ত্রণাদায়ক মাসিকের সমস্যায় ভোগেন। পেলভিকে অসহ্য যন্ত্রণা, মূত্রাশয় বা অন্ত্রের সমস্যায় ভোগেন অনেকে। এমনকি অনেকের ক্ষেত্রে বন্ধ্যাত্বও দেখা দেয়।
এই রোগ নির্ণয় করতেই প্রায় পাঁচ থেকে ১২ বছর সময় লেগে যায়। যেমন এমার ক্ষেত্রেও হয়েছিল।
এই রোগ নির্ণয় করতে সাধারণত ল্যাপরোস্কোপি করতে হয়। সেক্ষেত্রে পেলভিক গহ্বরে একটি ছোট ক্যামেরা ঢোকানো হয়, জানান 'নেক্সটজেন জেন'-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান নির্বাহী রিধি তারিয়াল।
নারীদের এই যন্ত্রণা থেকে রেহাই দিতেই তিনি ও আরও কয়েকটি স্টার্টআপ সংস্থার জনাকয়েক কর্মকতা অস্ত্রোপচারের চেয়ে দ্রুত, সস্তা এবং কম কষ্টকর একটি পরীক্ষা পদ্ধতি আবিষ্কারের চেষ্টা করছেন। তাদের বিশ্বাস, নারীর শরীরের সব রহস্য ওই পিরিয়ডের রক্তেই লুকিয়ে আছে!
প্রায় ৬,০০০ বছর আগে ব্যাবিলনীয় এবং সুমেরীয় সভ্যতার সময় থেকেই চিকিৎসকরা প্রস্রাবের নমুনা পরীক্ষা করতেন।
দু-এক শতাব্দী আগে থেকে মল এবং শিরার রক্ত পরীক্ষা শুরু হয়। তবে মাসিকের রক্ত পরীক্ষার কথা তেমনভাবে কখনোই ভাবা হয়নি।
মাসিকের রক্তের মধ্যে অর্ধেক থাকে শরীরের নিয়মিত রক্ত, বাকি অংশে থাকে প্রোটিন, হরমোন, ব্যাকটেরিয়া, এন্ডোমেট্রিয়াল টিস্যু এবং যোনি গহ্বর, জরায়ু, ফ্যালোপিয়ান টিউব, ডিম্বাশয় এবং শরীরের আরও একাধিক অঙ্গ থেকে নির্গত কোষ।
পিরিয়ডের রক্ত থেকে বিভিন্ন কোষের ধরন, তাদের আণবিক গঠন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়, যা সাধারণ রক্ত বা লালা পরীক্ষা করে পাওয়া যায় না। এটিকে বলে এক ধরনের প্রাকৃতিক বায়োপসি যা মহিলাদের জননাঙ্গের স্বাস্থ্যের খোঁজ দেয়।
রিধি তারিয়ালের সংস্থা 'নেক্সটজেন জেন' বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী বা ভলান্টিয়ারের কাছে বিশেষভাবে ডিজাইন করা তুলার ট্যাম্পন পাঠিয়ে নমুনা সংগ্রহের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
সংস্থাটি ২০১৪ সাল থেকে ৩৩০ জনেরও বেশি নারীর ২,০০০ টিরও বেশি মাসিক নমুনার উপর পরীক্ষা চালিয়েছে।

ছবির উৎস, Getty Images
ছবির ক্যাপশান,
স্যানিটারি ন্যাপকিন বা প্যাডের পাশাপাশি বহু নারী ট্যাম্পন ব্যবহার করেন
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থওয়েল হেলথের ফেইনস্টাইন ইনস্টিটিউট ফর মেডিকেল রিসার্চের একজন প্রজনন-জীববিজ্ঞানী ক্রিস্টিন মেটজের কথায়, "ঋতুস্রাবের রক্ত দেখেই জরায়ুর অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়"।
মিজ. মেটজ প্রায় এক দশক আগে এন্ডোমেট্রিওসিসের বায়োমার্কারগুলো চিহ্নিত করার জন্য মাসিকের রক্ত নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেছিলেন।
কিন্তু এখন তিনি দেখছেন এই তরলের মাধ্যমে এন্ডোমেট্রিয়াল ক্যান্সার, অ্যাডেনোমায়োসিস জাতীয় রোগ (যার ফলে জরায়ুর দেয়াল বৃদ্ধি পায়) অথবা এন্ডোমেট্রিলাইটিস (যার কারণে এন্ডোমেট্রিয়াল আস্তরণের ক্রমাগত প্রদাহ হয়) - এই সব রোগের কোনো হদিশ পাওয়া যায় কি না।
"মাসিকের রক্ত জরায়ুর স্বাস্থ্য সম্পর্কে ধারণা দেয়। যা জানার অন্য কোনো উপায় আপাতত নেই। এটি একটি অসাধারণ জৈবিক নমুনা", বলছেন তিনি। একটি পরীক্ষা থেকে জানা গেছে যে পিরিয়ডের রক্তে ৩৮৫টি প্রোটিনের নমুনা পাওয়া যায়।
মাসিকের সবচেয়ে বড় সুবিধা- এন্ডোমেট্রিয়াল বায়োপসির থেকেও বেশি স্পষ্ট করে জরায়ু সম্পর্কে ধারণা দেয় এই রক্ত।
"পিরিয়ডের রক্তের সাহায্যে গর্ভের স্বাস্থ্য সম্পর্কে জানা যায়। জরায়ু একটি আঙ্গুরের আকারের, তাই এন্ডোমেট্রিয়াল বায়োপসির মাধ্যমে পুরোটা ধারণা পাওয়া যায় না," দাবি ক্রিস্টিন মেটজের।
তিনি আরো জানান, পরীক্ষায় যে ভলান্টিয়াররা অংশ নেন তাদের একটি মাসিক কাপে নমুনা সংগ্রহ করতে বলা হয়েছিল। "কিন্তু মাসিকের নির্গমন হলো পুরো এন্ডোমেট্রিয়ালের বাইরের অংশ"।
মাসিকের রক্ত দীর্ঘদিন ধরে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় অবহেলিত ছিল, তাই এখনো স্পষ্ট নয় যে এন্ডোমেট্রিওসিসের রোগ নির্ণয়ের জন্য যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য অন্য কোনো বায়োমার্কার আছে কি না।
কিন্তু ক্রিস্টিন মেটজ এবং গবেষণায় তার সহযোগী জিন বিশেষজ্ঞ পিটার গ্রেগারসেন তিন হাজার ৭০০ জনেরও বেশি নারীর উপর গবেষণা করেছেন, যার ফলাফল যথেষ্ট উৎসাহব্যঞ্জক।
ক্রিস্টিন মেটজের বক্তব্য, প্রথমত এন্ডোমেট্রিওসিস ধরা পড়া নারীদের জরায়ুতে 'প্রাকৃতিকভাবে রোগ প্রতিরোধী' কোষের সংখ্যা অনেক কম থাকে যা সাধারণত গর্ভাবস্থার প্রাথমিক পর্যায়ে ভ্রূণ রোপণ, প্লাসেন্টার বিকাশ এবং সংক্রমণের সময়ে সুরক্ষা দিতে সক্ষম।
"পর্যবেক্ষণগুলো থেকে আরও জানা যায় যে মাসিকের রক্ত একদিন হাইপো বা হাইপারথাইরয়েডিজমের মতো রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা চিহ্নিত করতে সাহায্য করতে পারে," বলেন তিনি।

ছবির উৎস, Getty Images
ছবির ক্যাপশান,
গবেষকরা বলছেন, পিরিয়ডের রক্তের সাহায্যে গর্ভের স্বাস্থ্য সম্পর্কে জানা যায় - প্রতীকী ছবি
তার টিম স্ট্রোমাল ফাইব্রোব্লাস্ট কোষের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা লক্ষ্য করেছে, যা প্রতিটি পিরিয়ডের পরে জরায়ুর আস্তরণ মেরামত এবং পুনরুজ্জীবিত করতে সাহায্য করে।
দেখা গেছে যখন এন্ডোমেট্রিওসিস ছিল, তখন কোষগুলোতে আরও প্রদাহজনিত চিহ্ন পাওয়া যেত। এই পরিস্থিতিতে গর্ভাবস্থার জন্য জরায়ু ঠিকমতো প্রস্তুত হতে পারে না। তার বদলে পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম বা পিসিওএস দেখা যায় এবং অনেক ক্ষেত্রে গর্ভপাতও হতে পারে।
ক্রিস্টিন মেটজের ল্যাবরেটরি আরও দেখেছে যে এন্ডোমেট্রিওসিস রোগীদের মধ্যে নির্দিষ্ট জিনের অভিব্যক্তি পরিবর্তিত হয়।
চিকিৎসকরা পিরিয়ডের রক্ত পরীক্ষার ক্ষেত্রে এই বিষয়গুলো বিবেচনা করছেন।
তারা আশা করেন ২০২৭ সালের মধ্যেই শারীরিক পরীক্ষার এই ধরনের ডায়গনস্টিক কিট বাড়িতে রাখার জন্য মার্কিন খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের তরফে অনুমোদন দেওয়া হবে।
অন্যদিকে, 'নেক্সটজেন জে' -এর গবেষকরা মাসিকের রক্ত থেকে আরএনএ (এমআরএনএ) বের করে সিকোয়েন্সিং করছেন এবং নির্দিষ্ট এন্ডোমেট্রিওসিস বায়োমার্কার খুঁজছেন।
এখনো পর্যন্ত, তারা এমন কিছু চিহ্ন শনাক্ত করেছেন যা দেখে তারা বিশ্বাস করছেন বন্ধ্যাত্বের রোগীদের থেকে সুস্থ রোগীদের এন্ডোমেট্রিওসিসকে আলাদা করা যেতে পারে।
রিধি তারিয়াল জানান, এন্ডোমেট্রিওসিসে আক্রান্ত শত শত নারীর উপর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি গবেষণার ফল নিয়ে বিশ্লেষণ চলছে।
'নেক্সটজেন জেন' ২০২৫ সালের মে মাসে বন্ধ্যাত্বের রোগীদের এন্ডোমেট্রিওসিসের ওপর একটি মাসিক পরীক্ষার ক্লিনিকাল বৈধতার জন্য ২২ লাখ আমেরিকান ডলার অনুদান পেয়েছে।

ছবির উৎস, Getty Images
রিধি তারিয়ালের দাবি, "এটি প্রাথমিক তথ্য। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরে ইস্ট্রোজেন কমতে থাকে, তার সঙ্গে পিরিয়ডের স্পষ্ট যোগ রয়েছে"।
তাদের গবেষণায় আরও দেখা গেছে যে পিরিয়ডের রক্ত থেকে হাইপো বা হাইপারথাইরয়েডিজমের মতো সমস্যাগুলোও চিহ্নিত করা যায়। কারণ এই সময়ে শরীরের থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে থাইরক্সিন এবং ট্রাইওডোথাইরোনিনের মতো হরমোন খুব কম বা খুব বেশি পরিমাণে নিঃসৃত হয়।
তারিয়ালের কথায়, "এন্ডোমেট্রিওসিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রায়শই কিছু অটোইমিউন সমস্যা থাকেই"।
যেহেতু মাসিক চলাকালীন শরীর প্রদাহ থেকে ক্ষত নিরাময়ের দিকে এগিয়ে যায়, তাই মাসিকের রক্ত পরীক্ষা করে রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিস, লুপাস এবং মাল্টিপল স্ক্লেরোসিসের মতো রোগের ধারণাও পাওয়া যেতে পারে বলে জানান রিধি তারিয়াল।
গবেষকরা বলছেন, কারো পিরিয়ডের রক্ত দেখে তার ডায়াবেটিস আছে কি না তাও বোঝা সম্ভব।
ক্যালিফোর্নিয়া-ভিত্তিক স্টার্টআপ কিউভিনের গবেষকরা ২০২১ এবং ২০২৪ সালের গবেষণায় দেখেছিলেন যে মাসিকের রক্তে থাকা শর্করার পরিমাণ সারা শরীরের রক্তে শর্করার মাত্রার প্রতিফলন।
তাদের এই গবেষণার পর ২০২৪ সালে প্রথম এবং একমাত্র এফডিএ-অনুমোদিত মাসিকের রক্ত থেকে শর্করার স্বাস্থ্য পরীক্ষা শুরু হয়েছে। কিউ-প্যাড নামে এক ধরনের প্যাড ব্যবহার করে তারা নমুনা সংগ্রহের কাজ করছে।
কিউভিন ২০২২ সালে থাইল্যান্ডে চালানো এক গবেষণায় আরও দেখিয়েছে যে তাদের প্যাড থেকে সংগ্রহ করা নমুনা জরায়ুমুখের ক্যান্সারের জন্য দায়ী হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস বা এইচপিভি শনাক্তকরণে প্যাপ স্মিয়ারের থেকে বেশি ভালো কাজ করেছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এ নিয়ে আরও বড় গবেষণা চলছে।

ছবির ক্যাপশান,
প্যাড বা ট্যাম্পনের বদলে এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে মেনস্ট্রুয়াল কাপ উৎসাহিত করা হচ্ছে
কিউ-প্যাড ব্যবহার করে ক্ল্যামাইডিয়া এবং গনোরিয়ার মতো যৌনরোগের হদিশ পাওয়া যায় কি না, তা নিয়েও এই বছর থেকে কাজ শুরু হয়েছে বলে দাবি কিউভিনের কো-সিইও ম্যাডস লিলেলুন্ডের।
তিনি আশা করছেন, থাইরয়েড, প্রজনন হরমোন, প্রদাহজনক চিহ্ন এবং এমনকি করোনাভাইরাস সংক্রান্ত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নির্দেশ করে এমন অ্যান্টিবডিগুলো সম্পর্কেও হয়তো জানা একই পদ্ধতিতে।
একইভাবে, বার্লিন-ভিত্তিক একটি স্টার্টআপ 'দ্যব্লাড' বর্তমানে এন্ডোমেট্রিওসিস, আগাম মেনোপজ, পিসিওএস প্রভৃতি সমস্যাগুলোর আগাম আভাস পাওয়ার জন্য একটি কিট পরীক্ষা করছে।
তারা আগেও একটি ছোট গবেষণাতেও দেখিয়েছে যে পিরিয়ডের রক্ত থেকে সারা শরীরের ভিটামিন এ এবং ভিটামিন ডি-র মাত্রা সম্পর্কে ধারণা করা যায়।
'দ্যব্লাডে'র সহ-প্রতিষ্ঠাতা ইসাবেল গুয়েনো বলেন, "আমাদের লক্ষ্য হলো নারীদের দ্রুত রোগ নির্ণয়, উন্নত চিকিৎসা এবং উন্নত প্রতিরোধের সুযোগ করে দেওয়া"।
"আমাদের লক্ষ্য হলো নারীদের দ্রুত রোগ নির্ণয়, উন্নত চিকিৎসা এবং উন্নত প্রতিরোধের সুযোগ করে দেওয়া", জানান ইসাবেল গুয়েনো।
ছোটবেলায় ইসাবেল গুয়েনো নিজে এন্ডোমেট্রিওসিসে ভুগেছিলেন, যে রোগ নির্ণয় করতে আট বছর সময় লেগেছিল এবং এর জন্য তাকে বেশ কয়েকটি অস্ত্রোপচার করতে হয়েছিল।
এখানেই শেষ নয়। ক্রিস্টিন মেটজের ২০২২ সালের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, মাসিকের রক্ত থেকে একজন নারী কোনো ধরনের বিষাক্ত পদার্থের সংস্পর্শে এসেছেন কি না তাও টের পাওয়া সম্ভব।
তারা পরীক্ষা করে চারজনের মাসিকের রক্তে ফেনল, প্যারাবেন, থ্যালেট এবং অন্যান্য পরিবেশ দূষণকারী পদার্থ পাওয়ার কথাও জানিয়েছেন।

ছবির উৎস, DAVID TALUKDAR/Middle East Images/AFP via Getty Images
ছবির ক্যাপশান,
ভারতের গুয়াহাটিতে পিরিয়ড নিয়ে সচেতনতামূলক দেওয়াল-চিত্র দেখে লজ্জায় মুখ ঢাকছে এক ছাত্র - ফাইল ছবি
এত গবেষণার পরও ঋতুস্রাবের রক্ত সম্পর্কে অনেক কিছুই এখনো অজানা। একাধিক গবেষকের মতে, এখনো এই রক্তে উপস্থিত সব ধরনের উপাদানের ধরন ও তার পরিবর্তন সম্পর্কে সব তথ্য জানা সম্ভব হয়নি।
ঋতুস্রাব নিয়ে সমাজে এখনো বহু ধরনের কুসংস্কার বা গোঁড়ামি রয়েছে।
আজও, যখন আমরা ঋতুস্রাবের কথা বলি, বিভিন্ন সমাজে তখন অসংখ্য শব্দের ব্যবহার দেখা যায়, যেমন অভিশাপ, শয়তানের জলপ্রপাত, অ্যালার্মস্টুফ রট ("কোড রেড অ্যালার্ম"), লেস রাগনাগনাস (গুঞ্জন) ইত্যাদি।
"আমাদের সকলের মনে এই ধারণা গেঁথে গেছে যে মাসিক এমন একটি বিষয়, যা নিয়ে কথা বলাও নিষিদ্ধ," বলেন ক্রিস্টিন মেটজ।
চিকিৎসা-গবেষণায় পুরুষদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব এবং নারী স্বাস্থ্য গবেষণার জন্য তহবিলের তুলনামূলক অভাব বিষয়টিকে আরও জটিল করে তোলে।
সারা বিশ্বে ২০২০ সালে মোট গবেষণার মাত্র পাঁচ শতাংশ তহবিল বরাদ্দ ছিল ছিল নারী স্বাস্থ্য সম্পর্কিত গবেষণায়। যুক্তরাজ্যে, সরকারিভাবে চিকিৎসা গবেষণার মাত্র দুই দশমিক এক শতাংশ প্রজনন জাতীয় গবেষণার কাজে ব্যয় হয়।
অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে যে নারী স্বাস্থ্য নিয়ে যথেষ্ট অবহেলা রয়েছে। ২০২০ সালে সারা বিশ্বে মোট গবেষণার মাত্র পাঁচ শতাংশ তহবিল বরাদ্দ ছিল ছিল নারী স্বাস্থ্য সম্পর্কিত গবেষণায়।
"যেসব ওষুধ আবিষ্কার করা হয়েছে তার বেশিরভাগই পুরুষদের উপর পরীক্ষা করা হয়েছে, বেশির ভাগই শ্বেতাঙ্গ পুরুষদের উপর। এখানে জাতিগত বা লিঙ্গ বৈচিত্র্য খুব কম," ম্যাডস লিলেলুন্ড বলেন।
"এন্ডোমেট্রিওসিসের তুলনায় পুরুষদের টাকের উপর গবেষণায় বেশি অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে", জানান তিনি।
ফলস্বরূপ, মাসিকের রক্ত নিয়ে কাজের জন্য গবেষকদের নমুনা সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং প্রক্রিয়াকরণের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট প্রোটোকল মেনে পরিমার্জন এবং মানসম্মত করতে হয়েছে। মাসিকের রক্ত প্রবাহ, ও অন্যান্য এক একজন মহিলার ক্ষেত্রে এক এক রকম হয়।
রিধি তারিয়ালের বক্তব্য, এই ব্যাপারে আমরা সকলেই একই রকম অন্ধ। এতে অনেক নতুন গবেষণা ও উন্নতির প্রয়োজন।"

ছবির উৎস, Getty Images
তবে বিষয়টি বিপ্লবের দোরগোড়ায়। রোগী, গবেষক এবং বিনিয়োগকারীদের নতুন আগ্রহের কথা উল্লেখ করে মিজ. তারিয়াল বলেন, "প্রচেষ্টা আরও জোরালো হচ্ছে"।
উদাহরণস্বরূপ তিনি জানিয়েছেন, ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে (এমআইটি) ২০২৫ সালের জুলাই মাসে মাসিক চক্র কীভাবে ইমিউনোলজিকে প্রভাবিত করে সে সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে এগিয়ে নিতে এক কোটি ডলার বিনিয়োগ করে একটি উদ্যোগ চালু করেছে।
বিশ্বব্যাপী মাসিক রক্তের ব্যাংকও তৈরি হচ্ছে।
মূল লক্ষ্য হলো "গবেষকদের জন্য এমন একটি বাস্তুতন্ত্র তৈরি করা যেখানে তারা দ্রুত, কার্যকরভাবে এবং দায়িত্বশীলতার সাথে নমুনা সংগ্রহ করতে পারবেন", এ কথা বলছেন ব্রিটেন-ভিত্তিক উদ্যোক্তা কার্লি বুচলিং, যিনি ইউরোপের প্রথম মাসিক বায়োব্যাংক তৈরিতে সহায়তা করছেন।
তার দল শিগগিরই যুক্তরাজ্যের নারীদের কাছ থেকে মালিকানাধীন হোম কিট ব্যবহার করে মাসিকের নমুনা সংগ্রহ শুরু করবে। তিনি আশাবাদী, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ অল্প খরচে এই বায়োব্যাংক গবেষকদের জন্য উন্মুক্ত করা হবে।
মিজ. ব্যাকলুন্ডসহ অনেক নারী, যারা এন্ডোমেট্রিওসিস এবং জরায়ু সংক্রান্ত অন্যান্য সমস্যার সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করেন, তারা বলছেন যে এই ধরনের গবেষণা অনেক আগেই করা উচিত ছিল।
বেদনাদায়ক পিরিয়ডের সাথে বড় হওয়া তাকে সম্পূর্ণ একা করে দিয়েছিল, জানিয়েছেন মিজ. ব্যাকলুন্ড।
কিন্তু যদি মাসিকের রক্ত দিয়ে গবেষকরা রোগ নির্ণয়ের পথ বের করতে সফল হন, তাহলে আশা করা যায় যে পরবর্তী প্রজন্মের মেয়েরা দ্রুত চিকিৎসা পাবে এবং বড় হওয়ার সময় তারা যে শারীরিক ও মানসিক অস্থিরতা সহ্য করেছিলেন তা সহজে এড়ানো যাবে।