ভুল উন্নয়ন দর্শন, পরিকল্পনায় ধারাবাহিক আপস, উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ব্যর্থতা এবং স্বার্থ গোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দেয়ায় বিপুল বিনিয়োগের পরও ঢাকার বাসযোগ্যতা নিচের দিকে নামছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানারের সাবেক সভাপতি ও ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান। গতকাল রোববার নয়া দিগন্তকে তিনি বলেন, বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ ঢাকা মহানগরকে টেকসই ও বাসযোগ্য করে তুলতে অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি সুশাসন, কার্যকর পরিকল্পনা ও কঠোর উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা জরুরি। দেশের অর্থনীতি, প্রশাসন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র হলেও দীর্ঘদিনের পরিকল্পনাগত দুর্বলতা এবং সমন্বয়হীনতার কারণে রাজধানীবাসীর জীবনযাত্রার মান ক্রমাগত অবনতি হচ্ছে।
ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, গত এক দশকে ফ্লাইওভার, এক্সপ্রেসওয়ে, মেট্রোরেলসহ বিভিন্ন মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও এসব উদ্যোগের অধিকাংশই অবকাঠামোকেন্দ্রিক। নগরবাসীর দৈনন্দিন চলাচল, পরিবেশগত ভারসাম্য কিংবা নগরের সামগ্রিক উন্নয়নে প্রত্যাশিত সুফল আসেনি। পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনা ছাড়া শুধু অবকাঠামো নির্মাণ ঢাকার বাসযোগ্যতা বাড়াতে সক্ষম নয়। তিনি বলেন, ঢাকার জন্য প্রণীত বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) বারবার পরিবর্তন ও সংশোধনের ফলে এই পরিকল্পনার কার্যকারিতা ক্ষুণœ হয়েছে। আবাসন ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলের চাপে পরিকল্পনার মৌলিক বিষয়গুলোতে আপস করা হয়েছে বলে জলাভূমি সংরক্ষণ, সবুজ এলাকা রক্ষা এবং জনঘনত্ব নিয়ন্ত্রণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণে রাজউক, সিটি করপোরেশন এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যকর ভূমিকার অভাব পরিস্থিতিকে আরো জটিল করেছে। ইমারত নির্মাণ বিধিমালা লঙ্ঘন, জলাভূমি ভরাট, উন্মুক্ত স্থান দখল এবং নকশাবহির্ভূত ভবন নির্মাণের বিরুদ্ধে আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে না। একই সাথে বিভিন্ন সেবা সংস্থার সমন্বয়হীন কর্মকাণ্ডের কারণে সড়ক খোঁড়াখুঁড়ি, যানজট, জনদুর্ভোগ এবং সরকারি অর্থের অপচয় অব্যাহত রয়েছে। ঢাকার প্রতিটি ওয়ার্ডের সমস্যা ও চাহিদা ভিন্ন হলেও এখনো কার্যকর ওয়ার্ডভিত্তিক পরিকল্পনা গড়ে ওঠেনি। স্থানীয় পর্যায়ে ড্রেনেজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান এবং নাগরিক সুবিধা নিয়ে বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। একই সাথে রাজধানীতে অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ কমাতে শিল্প, শিক্ষা ও সরকারি সেবার বিকেন্দ্রীকরণেও দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। আবাসন খাত নিয়ে ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, বর্তমান আবাসন ব্যবস্থা মূলত উচ্চ ও উচ্চ-মধ্যবিত্তের চাহিদাকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হচ্ছে। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসনের সুযোগ তৈরি হয়নি। বাধ্য হয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বস্তি বা অনিরাপদ আবাসনে বসবাস করছেন।
পরিস্থিতি উত্তরণে পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে হলে এখনই ড্যাপ ও ইমারত আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, পরিকল্পনায় রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক হস্তক্ষেপ বন্ধ, রাজউক ও সিটি করপোরেশনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, জলাভূমি ও খাল সংরক্ষণ, পার্ক ও খেলার মাঠ রক্ষা, পথচারীবান্ধব ফুটপাত গড়ে তোলা, গণপরিবহনভিত্তিক নগর যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সাশ্রয়ী আবাসন প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। এ ছাড়া ঢাকামুখী জনসংখ্যার চাপ কমাতে শিল্পকারখানা ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিকেন্দ্রীকরণ, প্রতিটি ওয়ার্ডে প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়ন তদারকি, ড্রোন ও জিআইএস প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বড় অবকাঠামো বা আবাসন প্রকল্প অনুমোদনের আগে পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করতে হবে বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, রাজধানীকে বাসযোগ্য করতে কেবল নতুন মেগা প্রকল্প গ্রহণই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ, সমন্বিত নগর পরিকল্পনা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং নাগরিক স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া। অন্যথায় বিপুল বিনিয়োগের পরও ঢাকার বাসযোগ্যতা আরো নিচের দিকে নেমে যাবে।