২৯ মার্চ ১৯৭১ সাল। পশ্চিমবঙ্গের প্রভাবশালী দৈনিক আনন্দবাজারে একটি খবর প্রকাশিত হয়। খবরটির শিরোনাম ছিল ‘বাংলাদেশে অস্থায়ী সরকারকে স্বীকৃতিদানের দাবি’; খবরটির সূচনা ছিল : দুই বাংলার বেড়া ভেঙে দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারকে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টির নেতা জ্যোতি বসু আজ শহীদ মিনার ময়দানে এক বিশাল জনসভায় কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন (বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র : দ্বাদশ খণ্ড, পৃষ্ঠা-৩০২)। এ প্রসঙ্গে জ্যোতি বসু সম্পর্কে একটু বলে নেয়া দরকার। লন্ডন থেকে বার এট-ল ডিগ্রি অর্জনকারী জ্যোতি বসু সে সময় ছিলেন পচিমবঙ্গের বিরোধীদলীয় নেতা। পরে ১৯৭৭ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত পচিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন।
১৯৭২ সাল থেকে আওয়ামী সরকারি বয়ানে মুজিবনগর সরকারকে বাংলাদেশের সরকার হিসাবে বলা হলেও জ্যোতি বসুর বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, মুজিবনগর সরকারের আগেও বাংলাদেশের আরেকটি সরকার ছিল। কারণ মুজিবনগর সরকার গঠিত হয় ’৭১ সালের ১০ এপ্রিল। আর জ্যোতি বসু স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি দেয়ার দাবি জানাচ্ছেন ২৯ মার্চ।
মুজিবনগর সরকার গঠিত হওয়ার আগে যে আরেকটি সরকার ছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায় ১৩ এপ্রিল ’৭১ কলকাতার দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত একটি খবরে। ওই খবরের শিরোনাম ছিল স্বাধীন সার্বভৌম মুজিবের নেতৃত্বে নতুন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় : তাজউদ্দীন প্রধানমন্ত্রী। প্রকাশিত খবরটি ছিল এ রকম :
আগরতলা ১২ এপ্রিল (পিটিআই) : আজ সার্বভৌম গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ সাধারণতন্ত্র গঠিত হয়েছে। মুক্ত বাংলাদেশে কোনো এক স্থান থেকে এই রাষ্ট্র গঠনের কথা ঘোষণা করা হয়। এই সাথে বাংলাদেশ সরকারের নবগঠিত মন্ত্রিসভার সদস্যদের নামও ঘোষিত হয়েছে। বর্তমানে এই মন্ত্রিসভাই সমরকালীন মন্ত্রিসভারূপে কাজ করবে।
বাংলাদেশের কোনো এক স্থান থেকে একজন বিশিষ্ট আওয়ামী লীগ নেতা এই খবর ঘোষণা করেন। এই নবগঠিত রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান। জানা গেছে, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী ও খন্দকার মোশতাক আহমদ পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিযুক্ত হয়েছেন।
সীমান্তের ওপার থেকে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য সূত্রে এই স্মরণীয় সংবাদটি আজ এখানে পাওয়া গেছে।
মন্ত্রিসভার পূর্ণ তালিকা নিম্নরূপ : ১. শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতি, ২. সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপরাষ্ট্রপতি, ৩. তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী, ৪. খন্দকার মোশতাক আহমদ পররাষ্ট্রমন্ত্রী, ৫. ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, ৬. এ এইচ কামরুজ্জামান।
এর দ্বারা বর্তমানে অস্থায়ী সরকার বাতিল বলে গণ্য হবে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্রের চতুর্দশ খণ্ডের ৪৬৬ পৃষ্ঠায় ছাপানো ওই খবরটির শেষ লাইনটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। যদি ওই ধরনের কোনো সরকারের অস্তিত্বই না থাকে সেটি আবার বাতিল হয় কিভাবে?
এখন প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক, ওই অস্থায়ী সরকারের নেতৃত্বে ছিলেন কে? অর্থাৎ কার নেতৃত্বে ওই সরকার গঠিত হয়েছিল? এই প্রশ্নের জবাব পাওয়া যায় বাংলাদেশ স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্রের চতুর্দশ খণ্ডের ৪৬৬ পৃষ্ঠায় ছাপানো বিবিসির একটি খবরে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র : চতুর্দশ খণ্ডের ৪৬৬ পৃষ্ঠায় বিবিসিতে প্রচারিত একটি খবর উদ্ধৃত করা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে,
A clandestine radio broadcast monitored in Calcutta said that provisional Bangladesh- Bangali Nation-Government had been set up in East Pakistan”.
ওই একই খণ্ডের ১৭৮ নম্বর পৃষ্ঠাতে ভারতীয় সংবাদপত্র ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় ২৬ মার্চ ১৯৭১ সালে প্রকাশিত খবরের উদ্ধৃৃতি দিয়ে এবং তৃতীয় খণ্ডের ৩ নম্বর পৃষ্ঠায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে প্রচারিত এবং ভারতের দ্য স্ট্যাটসম্যান পত্রিকায় প্রকাশিত খবরের বরাত দিয়ে মুদ্রিত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র নিম্নরূপ :
Declaration of Independence
I, Major Zia, Provisional Commander in Chief of Bangladesh Liberation Army, hereby proclaim, on behalf of Sheikh Mujibur Rahman, the Independence of Bangladesh.
I also declare we have already framed a sovereign, legal Government under Sheikh Mujibur Rahman which pledges to function as per law and the constitution.
The new democratic Government is committed to a policy of non-alignment in international relations. It will seek friendship with all nations and strive for international peace.
I appeal to all Government to mobilize public opinion in their respective countries against the brutal genocide in Bangladesh.
The Government under Sheikh Mujibur Rahman is sovereign legal Government of Bangladesh and is entitled to recognition from all democratic nation of the world.
এখন প্রশ্ন হলো স্বাধীনতার ওই ঘোষণাপত্রে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠনের কথা ঘোষণা করা হলেও যেহেতু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানিদের হাতে বন্দী ছিলেন, তাহলে ওই সরকারের কার্যকর প্রধান কে ছিলেন? এর উত্তর হচ্ছে- মুক্তিবাহিনীর তৎকালীন সর্বাধিনায়ক হিসেবে জিয়াউর রহমানই ওই দায়িত্ব পালন করেন।
অস্থায়ী সরকারের প্রধান হিসেবে মেজর জিয়া যে দায়িত্ব পালন করেন তার প্রমাণ পাওয়া যায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র : নবম খণ্ডের ৩৯০ পৃষ্ঠায়। ৩০ মার্চ আগরতলা থেকে ভারতীয় সরকারি বার্তা সংস্থা পিটিআই ও ইউএনআই জানায়, ‘পূর্ব পাকিস্তানের কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট থেকে শ্রীহট্ট পর্যন্ত পুরো এলাকাটি বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা কর্তৃক অধিকৃত হয়েছে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে এই সংবাদটি আজ সকালে শোনা যায়। এখানে শ্রুত এই বেতার ঘোষণায় বলা হয়, পুরো এলাকায় এখন বাংলাদেশের পতাকা উড়ছে।’
‘বাংলার রাজধানী ঢাকা শহরসহ বাংলাদেশের প্রায় পুরো অঞ্চল শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তিফৌজের নিয়ন্ত্রণে আসায় পাকবাহিনী সর্বত্র পশ্চাৎপসরণ করছে বলে স্বাধীন বাংলা বেতার দাবি জানিয়েছে। ঢাকার আশপাশে অসংখ্য মৃতদেহ পড়ে আছে। অস্থায়ী সরকারের প্রধান মেজর জিয়া আজ বেতারে বিশ্বের সব রাষ্ট্রের কাছে এক আবেদন জানিয়ে তাদের সাফল্য প্রত্যক্ষ করার আহ্বান জানিয়েছেন।’
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র সূত্রে প্রাপ্ত এসব তথ্য থেকে বোঝা যায়, জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন অস্থায়ী সরকার ছিল বাংলাদেশের প্রথম সরকার; মুজিবনগর সরকার নয়।