আহসান হাবিব বরুন
ইরানের ওপর ইসরাইল ও মার্কিন আগ্রাসনের প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি আবারো প্রমাণ করেছে যে, এই অঞ্চল শুধু ভূরাজনৈতিক সঙ্ঘাতের কেন্দ্র নয়; বরং এটি বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা, খাদ্য সরবরাহ এবং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। এই অস্থিরতার ঢেউ যখন আছড়ে পড়ে, তখন তা কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্র বা অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতি, সমাজ ও জনজীবনেও এর সরাসরি প্রভাব পড়ে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি বড় অংশ নির্ভর করে জ্বালানি আমদানি, প্রবাসী আয় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর—ফলে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা এক বহুমাত্রিক সঙ্কটের জন্ম দেয়। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পেলে পরিবহন ব্যয় বাড়ে, শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হয়, বাজারে পণ্যমূল্য ঊর্ধ্বমুখী হয়। একইসাথে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত লাখো প্রবাসী শ্রমিকের নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা আমাদের রেমিট্যান্স প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সুতরাং যুদ্ধক্ষেত্র হাজার মাইল দূরে হলেও এর প্রতিধ্বনি শোনা যায় বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত। এমনকি রান্নাঘর পর্যন্ত।
এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—আমরা কিভাবে এই বৈশ্বিক সঙ্কটের প্রভাব মোকাবেলা করব? রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ, অর্থনৈতিক কৌশল কিংবা কূটনৈতিক উদ্যোগ নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এর বাইরেও একটি শক্তি রয়েছে, যা সবচেয়ে বেশি কার্যকর এবং দীর্ঘস্থায়ী—সেটি হলো জাতীয় ঐক্য।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, সঙ্কটের সময়ে ঐক্যবদ্ধ জাতি সবসময়ই শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পেরেছে। বাংলাদেশের জন্মই হয়েছে এক অনন্য ঐক্যের মধ্য দিয়ে। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ—প্রতিটি সংগ্রামে জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ একত্রিত হয়েছে একটি বৃহত্তর স্বার্থে। সেই ঐতিহ্যই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। আজকের বৈশ্বিক অস্থিরতার সময়েও সেই ঐক্যের চেতনা নতুন করে জাগ্রত করা জরুরি।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি মোকাবেলায় বাংলাদেশের জন্য প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। এই ক্ষেত্রে সরকার যতই নীতি গ্রহণ করুক না কেন, সাধারণ মানুষের সচেতনতা ও সহযোগিতা ছাড়া তা কার্যকর হবে না। অপ্রয়োজনীয় ভোগ কমানো, জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়া, দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগে অংশগ্রহণ—এসবই নাগরিক পর্যায়ে ঐক্যের বাস্তব রূপ।
একইসাথে ব্যবসায়ী, শিল্পপতি ও উদ্যোক্তাদেরও দায়িত্ব রয়েছে। সঙ্কটের সুযোগ নিয়ে পণ্যমূল্য বাড়ানো বা মজুদদারি করার প্রবণতা সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করে। তাই এই সময়ে তাদের উচিত নৈতিক দায়িত্ববোধ থেকে বাজার স্থিতিশীল রাখতে ভূমিকা রাখা। শ্রমিক, কৃষক, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী—প্রতিটি শ্রেণীর মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও আস্থা গড়ে উঠলে অর্থনৈতিক ধাক্কা অনেকটাই সামাল দেয়া সম্ভব সম্ভব বলে আমি মনে করি।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রবাসী বাংলাদেশীদের নিরাপত্তা। তারা শুধু পরিবারের ভরসা নন; বরং জাতীয় অর্থনীতিরও অন্যতম স্তম্ভ। এই সময়ে তাদের পাশে দাঁড়ানো, তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া এবং প্রয়োজনে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দ্রুত সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। কিন্তু এর পাশাপাশি দেশে অবস্থানরত মানুষের মধ্যেও একটি সংহতি থাকা দরকার—যাতে কোনো প্রবাসী সঙ্কটে পড়লে সে জানে, তার পেছনে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি রয়েছে।
এখানে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিভ্রান্তিকর তথ্য, গুজব কিংবা উসকানিমূলক বক্তব্য সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করতে পারে, যা সঙ্কট মোকাবেলায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা এবং সচেতন নাগরিক আচরণ অত্যন্ত প্রয়োজন। তথ্য যাচাই করে প্রচার করা এবং অযথা আতঙ্ক সৃষ্টি না করা—এই দুটি বিষয় বর্তমান পরিস্থিতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের সমাজ কাঠামো বহুমাত্রিক—ধর্ম, সংস্কৃতি, ভাষা ও পেশাগত বৈচিত্র্যে ভরপুর। এই বৈচিত্র্য কখনো কখনো বিভাজনের কারণ হলেও, সঠিকভাবে পরিচালিত হলে এটি হতে পারে শক্তির উৎস। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি আমাদের সামনে একটি সুযোগ এনে দিয়েছে—এই বৈচিত্র্যকে ঐক্যে রূপান্তর করার।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও ঐক্যের গুরুত্ব অপরিসীম। ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান—সব ধর্মই শান্তি, সহমর্মিতা ও মানবতার শিক্ষা দেয়। এই মূল্যবোধগুলো যদি আমরা বাস্তবে প্রয়োগ করতে পারি, তাহলে সমাজে বিভাজনের কোনো স্থান থাকবে না। বরং একটি মানবিক, সহনশীল ও সহযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি হবে, যা যেকোনো সঙ্কট মোকাবেলায় সহায়ক।
রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও ঐক্য অপরিহার্য। মতভেদ গণতন্ত্রের একটি স্বাভাবিক অংশ, কিন্তু জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে সব রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে একটি ন্যূনতম ঐকমত্য থাকা জরুরি। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির মতো বৈশ্বিক সঙ্কট মোকাবেলায় রাজনৈতিক বিভাজন নয়, বরং সমন্বিত উদ্যোগই কার্যকর হতে পারে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও এই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা ও জাতীয় চেতনা গড়ে তোলা ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা যদি ছোটবেলা থেকেই শেখে যে সঙ্কটের সময়ে ঐক্যই সবচেয়ে বড় শক্তি, তাহলে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ আরো স্থিতিশীল ও শক্তিশালী হবে।
এ ছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে কমিউনিটি ভিত্তিক উদ্যোগগুলোও অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে। গ্রাম বা মহল্লা পর্যায়ে পারস্পরিক সহযোগিতা, সহায়তা তহবিল গঠন, দরিদ্র ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো—এসব উদ্যোগ সমাজে ঐক্যের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।
সবচেয়ে বড় কথা, ঐক্য শুধু একটি স্লোগান নয়; এটি একটি চর্চা, একটি অভ্যাস। এটি গড়ে ওঠে প্রতিদিনের ছোট ছোট কাজের মাধ্যমে—সহযোগিতা, সহানুভূতি, দায়িত্ববোধ এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার মাধ্যমে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি আমাদের জন্য একটি কঠিন বাস্তবতা, কিন্তু এটি একইসাথে একটি সুযোগও বটে—নিজেদের শক্তি ও দুর্বলতা নতুন করে মূল্যায়ন করার। আমরা যদি বিভক্ত থাকি, তাহলে এই সঙ্কট আমাদের আরো দুর্বল করে তুলবে। কিন্তু যদি আমরা ঐক্যবদ্ধ হতে পারি, তাহলে এই সঙ্কটই আমাদের শক্তিশালী করে তুলতে পারে।
বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং সমাজ কাঠামো আমাদের সেই শক্তি দিয়েছে, যা দিয়ে আমরা যে কোনো বৈশ্বিক সঙ্কট মোকাবেলা করতে পারি। প্রয়োজন শুধু সেই শক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো।
অতএব, আজকের এই অস্থির সময়ে আমাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র কোনো প্রযুক্তি, সম্পদ বা কৌশল নয়—বরং আমাদের ঐক্য। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল শ্রেণী-পেশার মানুষের সম্মিলিত শক্তিই পারে এই বৈশ্বিক সঙ্কটের অভিঘাত কমিয়ে আনতে।
পরিশেষে বলা যায়, সঙ্কট যত বড়ই হোক না কেন, ঐক্যবদ্ধ জাতির কাছে তা কখনোই অজেয় নয়। বাংলাদেশের জন্যও এর ব্যতিক্রম নয়। আমাদের ঐক্যই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। সুতরাং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির মতো বৈশ্বিক যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ই-মেইল : [email protected]