সকালে বাজারে গিয়ে এক কেজি আলু কেনা, ফিলিং স্টেশন থেকে গাড়িতে কয়েক লিটার জ্বালানি নেওয়া, প্রেশার মাপার যন্ত্রে শরীরের রক্তচাপ দেখা কিংবা বড় কোনো রাষ্ট্রীয় মেগা প্রকল্পের জন্য টন মেপে রড-সিমেন্ট কেনা- আমাদের প্রতিদিনের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত বাঁধা সুনির্দিষ্ট পরিমাপের সুতোয়। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছি, এই যে এক কেজি কিংবা এক লিটার, এর পেছনের নিখুঁত সত্যতা নিশ্চিত করে কে? উত্তরটা লুকিয়ে আছে ‘মেট্রোলজি’ বা পরিমাপবিজ্ঞানের গভীরে।  মেট্রোলজি হলো পরিমাপবিজ্ঞান ও এর ব্যবহারিক প্রয়োগ এটি কেবল পরিমাপের কৌশল নয়, বরং পরিমাপের যথার্থতা, বিশ্বাসযোগ্যতা ও আন্তর্জাতিক তুলনীয়তা নিশ্চিত করার সামগ্রিক বিজ্ঞানভিত্তিক শৃঙ্খলা। পরিমাপবিজ্ঞানের মূল লক্ষ্য হলো পরিমাপের এককের সঠিকতা নিশ্চিত করা এবং বৈশ্বিক ‘ট্রেসেবিলিটি চেইন’ বা পরিমাপের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা।

প্রতি বছর ২০ মে বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব মেট্রোলজি দিবস। চলতি ২০২৬ সালে দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে অত্যন্ত সময়োপযোগী ও তাৎপর্যপূর্ণ ‘নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় আস্থা নির্মাণে মেট্রোলজি’ (Metrology : Building Trust in Policy Making)। বাংলাদেশেও জাতীয় মান সংস্থা বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)-এর উদ্যোগে নানামুখী আয়োজনে দিবসটি পালিত হচ্ছে।

আজ থেকে দেড় শ বছর আগেও পৃথিবীতে কোনো অভিন্ন পরিমাপ ব্যবস্থা ছিল না। ১৭৯৫ সালের দিকে কেবল ফ্রান্সেই ৭০০-এর বেশি ভিন্ন ভিন্ন পরিমাপের একক প্রচলিত ছিল! এক অঞ্চলের এক কেজি অন্য অঞ্চলে গিয়ে বদলে যেত। যা আজকের দিনে কল্পনা করা কঠিন।

পরিমাপের এই বৈষম্যের কারণে তখন তিনটি বড় সংকট তৈরি হয়েছিল (ক) বাণিজ্যে কারচুপি ও অবিশ্বাস : একই পণ্যের ওজন এক বাজারে এক রকম তো অন্য বাজারে অন্য রকম হতো। এতে ক্রেতাবিক্রেতার মধ্যে অবিশ্বাস, কারচুপি এবং বাণিজ্যিক বিরোধ নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছিল। (খ) বৈজ্ঞানিক গবেষণায় বাধা : বিজ্ঞানীরা যখন তাদের গবেষণার ফল একে অপরের সঙ্গে বিনিময় করতে যেতেন, তখন ভিন্ন ভিন্ন এককের কারণে তথ্যের তুলনা করা বা পুনরায় পরীক্ষা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ত। এটি বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনের গতিকে মন্থর করে দিয়েছিল। (গ) শিল্পায়নে জটিলতা : ক্রমবর্ধমান শিল্পবিপ্লবের যুগে যন্ত্রপাতির সূক্ষ্ম পার্টস তৈরির জন্য অভিন্ন মাপজোক অপরিহার্য হয়ে পড়ে। ভিন্ন ভিন্ন এককের কারণে প্রকৌশলবিদ্যায় ত্রুটি ও অসংগতি দেখা দিত। এই বিশৃঙ্খলা থেকে মুক্তি পেতে ১৮৭৫ সালের ২০ মে ফ্রান্সের প্যারিসে ১৭টি দেশের প্রতিনিধিরা স্বাক্ষর করেন ঐতিহাসিক ‘মিটার কনভেনশন’-এ। জন্ম নেয় ওজন ও পরিমাপবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা International Bureau of Weights and Measures (BIPM). আজ বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১০০টি দেশ এই আন্তর্জাতিক পরিমাপ পরিবারের অংশ। ২০২৩ সালে ইউনেস্কো ২০ মে-কে আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ব মেট্রোলজি দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

মেট্রোলজি সাধারণত তিনটি শাখায় বিভক্ত

(১) বৈজ্ঞানিক মেট্রোলজি (Scientific Metrology) এটি পরিমাপবিজ্ঞানের সর্বোচ্চ স্তর। এর কাজ হলো পরিমাপের মৌলিক এককগুলো (যেমন মিটার, কেজি, সেকেন্ড) প্রতিষ্ঠা করা এবং সেগুলোকে প্রাকৃতিক ধ্রুবকের ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা। সায়েন্টিফিক মেট্রোলজি নতুন নতুন পরিমাপ পদ্ধতির উদ্ভাবন এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত জাতীয় পরিমাপ মানসমূহ ((National Measurement Standards) সংরক্ষণ করে। বাংলাদেশে বিএসটিআই-এর ন্যাশনাল মেট্রোলজি ল্যাবরেটরি (NML-BSTI) এই দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে।

(২) শিল্প মেট্রোলজি (Industrial Metrology) : শিল্পকলকারখানায় উৎপাদিত পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করার জন্য উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির সঠিকতা বজায় রাখাই এর মূল কাজ। এটি মূলত ‘ক্যালিব্রেশন’ এবং ‘ভেরিফিকেশন’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। সঠিক ইন্ডাস্ট্রিয়াল মেট্রোলজি ছাড়া কোনো পণ্যই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে না, কারণ সামান্যতম পরিমাপের বিচ্যুতি পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়াকে ত্রুটিপূর্ণ করতে পারে।

(৩) লিগ্যাল মেট্রোলজি (Legal Metrology) : এটি সরাসরি জনসাধারণের স্বার্থ এবং আইনি প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত। বাণিজ্যিক লেনদেন, জনস্বাস্থ্য রক্ষা এবং পরিবেশের সুরক্ষায় পরিমাপের সঠিকতা নিশ্চিত করার জন্য যে আইনগত কাঠামো কাজ করে, তাই লিগ্যাল মেট্রোলজি। যেমন বাজারে ব্যবহৃত ওজন মাপার ডিজিটাল স্কেল, ফিলিং স্টেশনের ফুয়েল ডিসপেনসার বা বাসার বিদ্যুৎ ও পানির মিটারের সঠিকতা যাচাই করা লিগ্যাল মেট্রোলজির আওতাভুক্ত। এই তিনটি শাখা একত্রে কাজ করে একটি বিশ্বস্ত ও সামঞ্জস্যপূর্ণ পরিমাপব্যবস্থা গড়ে তোলে।

এবারের বিশ্ব মেট্রোলজি দিবস ২০১৬-এর প্রতিপাদ্য অত্যন্ত সময়োপযোগী।  BIPM মহাপরিচালক ড. অ্যানেট কু’র ভাষায়, বিশ্বস্ত পরিমাপ হলো সঠিক সিদ্ধান্তের নীরব ভিত্তি, যা গড়ে ওঠে সহযোগিতা, প্রমাণ ও সতর্কতার মাধ্যমে। একটি আধুনিক রাষ্ট্রের তথ্যভিত্তিক নীতি (Evidence-based Policy) প্রণয়নের জন্য নির্ভরযোগ্য পরিমাপ-তথ্য অপরিহার্য। সরকারি নীতিনির্ধারণের বিভিন্ন স্তরে মেট্রোলজির ভূমিকা নিম্নরূপ রয়েছে। এর মাধ্যমে কিছু বিষয় অবতারণা করা যেতে পারে।

জনস্বাস্থ্য নীতি : রোগ নির্ণয়, ওষুধের নিখুঁত মাত্রা, খাওয়ার পানির মান ও বায়ুর মানদণ্ড নির্ধারণে সঠিক পরিমাপ না থাকলে সরকারের স্বাস্থ্যনীতি কাজ করবে না।

পরিবেশ ও জলবায়ু নীতি : বায়ু ও পানিদূষণের মাত্রা পরিমাপ করে সরকার পরিবেশ আইন প্রণয়ন করে। জাতীয় নির্ধারিত অবদান (Nationally Determined Contributions-NDC) এবং জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (National Adaptation Plan-NAP) তৈরিতে মেট্রোলজির তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।

ভোক্তা সুরক্ষা নীতি : প্যাকেটজাত পণ্যের নিট ওজন ও পরিমাণ, জ্বালানি, বিদ্যুৎ ইত্যাদি পরিমাপে সঠিক লিগ্যাল মেট্রোলজি কার্যক্রম ভোক্তাদের সুরক্ষা দেয় এবং বাজারে ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করে।

শিল্প ও বাণিজ্য নীতি : রপ্তানিযোগ্য পণ্যের মান নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পরিমাপপদ্ধতি প্রয়োজন। পারস্পরিক স্বীকৃতি চুক্তি (MRA) বাংলাদেশের রপ্তানি বাধা অতিক্রমে সহায়তা করে।

কৃষি ও খাদ্যনীতি : সার, বালাইনাশক, সেচের পানি ও ফসলের পুষ্টিমান নির্ধারণে মেট্রোলজি কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে এবং কৃষিজ পণ্যের রপ্তানিমান নিশ্চিত করতে সহায়তা করে।

একটি দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে টিকে থাকার মূল চাবিকাঠি হলো একটি শক্তিশালীNational Quality Infrastructure (NQI)। সরকারি ‘জাতীয় গুণগতমান (পণ্য) ও সেবা নীতি’র আলোকেও বাংলাদেশের এই অবকাঠামো মূলত চারটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, মানকরণ (Standardization), মেট্রোলজি (Metrolog), কনফরমিটি অ্যাসেসমেন্ট (Testing) এবং অ্যাক্রেডিটেশন (Accreditation)।

এই সমন্বিত ব্যবস্থাটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে Technical Barriers to Trade (TBT) হ্রাস করে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের পথ সুগম করে। বাংলাদেশের NQI আরও শক্তিশালী করার মাধ্যমে বিশেষত মেট্রোলজি অবকাঠামোর উন্নয়নের মাধ্যমে রপ্তানি আয় বৃদ্ধি, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব।

জাতীয় মান প্রণয়ন প্রতিষ্ঠান হিসেবে পণ্যের মান প্রণয়নের পাশাপাশি পরিমাপের নির্ভুলতা বজায় রাখা এবং দেশে মেট্রিক সিস্টেম এবং এসআই (SI) ইউনিট বাস্তবায়ন করা বিএসটিআইর দায়িত্ব। এটি ওজনে কারচুপি রোধে লিগ্যাল মেট্রোলজি কার্যক্রম (মাঠপর্যায়ে পরিদর্শন ও যাচাই) পরিচালনা করে। এর অধীনেই ২০১০ সালে ৭টি অত্যাধুনিক ও অ্যাক্রেডিটেড ল্যাবরেটরির সমন্বয়ে ‘ন্যাশনাল মেট্রোলজি ল্যাবরেটরি’ (NML-BSTI) প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে যা পরিমাপের জাতীয় মানদণ্ড স্থাপন ও সংরক্ষণ এবং পরিমাপের আন্তর্জাতিক ট্রেসেবিলিটি সংরক্ষণ করে। এ ছাড়া বিভিন্ন ওজন ও পরিমাপ যন্ত্রের ক্যালিব্রেশন ও ভেরিফিকেশন সেবা প্রদান করা হয়।  সম্প্রতি পরিমাপবিষয়ক শীর্ষ সংস্থা বিআইপিএম-এর ডেটাবেসে (Key Comparison Database KCDB) প্রথমবারের মতো বিএসটিআইর মাস ল্যাবরেটরির Calibration and Measurement Capabilities (CMC) প্রকাশিত হয়েছে। এটি বৈশ্বিক মানদণ্ডে বিএসটিআইর মেট্রোলজি ল্যাবরেটরির ক্যালিব্রেশন সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার এক অনন্য স্বীকৃতি। এর ফলে বাংলাদেশে বিএসটিআই থেকে ইস্যুকৃত ক্যালিব্রেশন সার্টিফিকেট বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে সরাসরি গ্রহণযোগ্য হবে।  বিএসটিআই বাংলাদেশে একটি আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের জাতীয় মেট্রোলজি ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে দেশের শিল্প বিকাশ, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি, ভোক্তা সুরক্ষা এবং সুষ্ঠু নীতি নির্ধারণে অবদান রেখে চলেছে। আমরা সবাই মিলে পরিমাপের গুরুত্বকে স্বীকার করি এবং একটি পরিমাপযোগ্য, বিশ্বস্ত ও টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার অঙ্গীকার গ্রহণ করি।

♦ লেখক : মহাপরিচালক (সচিব) বিএসটিআই



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews