বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত দীর্ঘদিন ধরেই বহুমুখী সংকটের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। অবকাঠামো ও জনবল ঘাটতি, চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ, সেবার মান নিয়ে জন-অসন্তোষ-সব মিলিয়ে স্বাস্থ্য আজ কেবল একটি খাত নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। এই প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব বিশেষ গুরুত্ব বহন করে, কারণ এটি সমস্যাগুলো চিহ্নিত করার পাশাপাশি একটি কাঠামোগত ও নীতিগত দিকনির্দেশনা দিয়েছে।
সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব মূলত তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে-স্বাস্থ্যকে মৌলিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা, শক্ত ও স্বচ্ছ প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা এবং সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। এই কাঠামোর আলোকে রাজনৈতিক দলগুলোর জনস্বাস্থ্য বিষয়ক নির্বাচনি ইশতেহার বিশ্লেষণ করলে মিল ও সীমাবদ্ধতা-দুটোই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর স্বাস্থ্যবিষয়ক নির্বাচনি ইশতেহারে সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবের সঙ্গে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মিল দেখা যায়। স্বাস্থ্যকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি, ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ ও জাতীয় স্বাস্থ্য বিমার কথা বলা, প্রাথমিক থেকে তৃতীয় স্তরের হাসপাতাল ব্যবস্থার উন্নয়ন, প্রয়োজনীয় ওষুধের প্রাপ্যতা, ডিজিটাল হেলথ কার্ড ও রেফারেল সিস্টেম-এসবই কমিশনের কাঠামোগত চিন্তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এতে বোঝা যায়, বিএনপি স্বাস্থ্য খাতকে একটি সংগঠিত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে উন্নত করার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেছে।
তবে সংস্কার কমিশন যেখানে আরো এক ধাপ এগিয়ে স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা, হাসপাতালের স্বায়ত্তশাসন এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসনের ওপর জোর দিয়েছে, সেখানে বিএনপির ইশতেহারে এসব বিষয় তুলনামূলকভাবে কম স্পষ্ট। এটি চূড়ান্ত অঙ্গীকার নয়, বরং ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণে আরো পরিষ্কার অবস্থান নেওয়ার একটি সুযোগ হিসেবে দেখা যেতে পারে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর স্বাস্থ্য ভাবনা তুলনামূলকভাবে নৈতিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতার ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা অধিকার, মানবিকতা, চিকিৎসা পেশার নৈতিকতা। সংস্কার কমিশনও ন্যায় ও সমতার প্রশ্নটিকে গুরুত্ব দিয়েছে; এই জায়গায় নীতিগতভাবে একটি মিল লক্ষ করা যায়। তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাঠামো, যেমন-স্বাস্থ্য বিমা, বাজেট কাঠামো, রেগুলেটরি অথরিটি বা হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা-এসব বিষয়ে জামায়াতের অবস্থান আরো সুস্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। এই আলোচনার সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রশ্ন যুক্ত হয়-নির্বাচনি ইশতেহার কি আদৌ ভোটের আচরণ বদলাতে পারে? স্বাস্থ্য খাতের প্রতিশ্রুতি কি ভোট বাড়াতে বা কমাতে ভূমিকা রাখে?
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা বলছে, নির্বাচনি ইশতেহার
এককভাবে ভোটের ফল নির্ধারণ করে না। ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে রাজনৈতিক বিশ্বাস, নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা, অতীত অভিজ্ঞতা এবং নির্বাচন-পরিবেশ। তবে এটাও সত্য যে, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মতো মৌলিক বিষয়গুলো নীরব ও অনিশ্চিত ভোটারদের মনোভাব গঠনে ভূমিকা রাখে-বিশেষ করে, নগর ও আধানগর মধ্যবিত্ত এবং তরুণ ভোটারদের মধ্যে।
এই প্রেক্ষাপটে তুলনামূলকভাবে বলা যায়-দুই দলের মধ্যে বিএনপির জনস্বাস্থ্যবিষয়ক নির্বাচনি ইশতেহার ভোটার আকর্ষণের সম্ভাবনা কিছুটা বেশি। কারণ এটি নাগরিকদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার সঙ্গে বেশি সরাসরি যুক্ত-চিকিৎসা ব্যয়, হাসপাতালের সক্ষমতা, ওষুধের প্রাপ্যতা ও বিমা সুরক্ষার মতো প্রশ্নগুলো সাধারণ মানুষের কাছে বাস্তব ও স্পর্শকাতর। তবে এই সম্ভাবনার সঙ্গেই কয়েকটি বাস্তব সীমাবদ্ধতা রয়েছে। প্রথমত, ভোটাররা আদৌ কি নির্বাচনি ইশতেহার পড়েন? বাংলাদেশের বাস্তবতায় অধিকাংশ ভোটার সরাসরি ইশতেহার পাঠের সুযোগ পান না। নির্বাচনি ইশতেহার সাধারণত সহজলভ্য নয় এবং গণমাধ্যমেও এর পূর্ণাঙ্গ ও বিশ্লেষণধর্মী উপস্থাপন সীমিত। ফলে ইশতেহারের বিষয়বস্তু ভোটারের কাছে পৌঁছায় মূলত রাজনৈতিক বক্তৃতা, স্লোগান ও সামাজিক আলোচনার মাধ্যমে লিখিত নথির মাধ্যমে নয়।
দ্বিতীয়ত, প্রশ্ন থাকে-ভোটার সমাজ কি এতটাই শিক্ষিত ও সচেতন যে, তারা ইশতেহারের কাঠামোগত পার্থক্য বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেবে?
এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। বাংলাদেশের ভোটার সমাজ বৈচিত্রময়; ফলে ইশতেহার কারো সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেললেও, সবার ক্ষেত্রে সমান ভূমিকা রাখে না। এই বাস্তবতায় বলা যায়, নির্বাচনি ইশতেহার হঠাৎ ভোটের নাটকীয় পরিবর্তন ঘটায়-এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। তবে একটি তুলনামূলকভাবে বাস্তবায়নযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য স্বাস্থ্য ইশতেহার ভোটের ক্ষয় রোধ করতে পারে, অনিশ্চিত ভোটারকে ধরে রাখতে পারে এবং রাজনৈতিক দলের প্রতি ন্যূনতম আস্থার ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব এই অর্থে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটি সুযোগ। যারা এই প্রস্তাবের সঙ্গে নিজেদের ইশতেহারকে যুক্ত করতে পারবে এবং বাস্তবায়নের বিশ্বাসযোগ্য বার্তা দিতে পারবে, তারা শুধু নীতিগত উচ্চতা নয়, নাগরিক আস্থাও অর্জন করতে পারবে। স্বাস্থ্য খাত সংস্কার শেষ পর্যন্ত কোনো দলের ইশতেহারের শব্দচয়ন নয়; এটি নাগরিকের জীবন, মর্যাদা ও ন্যায্যতার প্রশ্ন। নির্বাচনি রাজনীতিতে স্বাস্থ্য যদি সত্যিই গুরুত্ব পায়, তাহলে সেটি ভোটের অঙ্কের বাইরেও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে।
লেখক: সদস্য, স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন ও অধ্যাপক, ক্লিনিক্যাল অনকোলজি, বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়