কলকাতার নিউটাউনের বাসিন্দা পিউ দাস বলেন, ‘ছেলের বন্ধুদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে শেয়ার করা অ্যাডাল্ট মিম দেখে আমি হতভম্ব হয়ে পড়েছিলাম।’ তার ১২ বছরের ছেলে কলকাতার এক ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়ে।

একইভাবে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন দক্ষিণ কলকাতার আরেক নারী। তিনি বলেন, ‘ছেলের বন্ধুদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে একজন নায়িকার মর্ফড ছবি শেয়ার করেছিল। ছবির নিচে কমেন্ট পড়ে আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না ১২-১৩ বছরের শিশুরা একথা বলতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি চাকরি করি। যোগাযোগের সুবিধার জন্য হোয়াটসঅ্যাপ ডাউনলোড করে দিয়েছি ছেলের ফোনে। কোনোদিন ভাবিনি এমনটা হবে।’

এরপর ছেলের ফোন থেকে হোয়াটসঅ্যাপসহ অন্যান্য সব ধরনের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ডিলিট করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বহুল ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে তার নেতিবাচক প্রভাবও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। বিশেষত নাবালক ও অল্পবয়সিদের সুরক্ষা ও তাদের মনে এর নেতিবাচক প্রভাবের বিষয়টা চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই সমস্ত বিষয়ের কথা মাথায় রেখে সম্প্রতি ‘প্যারেন্ট ম্যানেজড’ অ্যাকাউন্ট এনেছে হোয়াটসঅ্যাপ। প্রি-টিন বা ১৩ বছরের কম বয়সি শিশুদের ক্ষেত্রে তাদের হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট ‘ম্যানেজ’ বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন অভিভাবকেরা। ওই বয়সের বাচ্চাদের মেসেজ এবং কলিং-এর মতো বিভিন্ন ফিচার নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। শিশুদের অ্যাকাউন্টের প্রাইভেসি সেটিংও নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন অভিভাবকরা।

হোয়াটসঅ্যাপ জানিয়েছে, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসকারী গ্রাহকদের পরিবার ও বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের উপর ভিত্তি করেই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

নিয়ন্ত্রণ অভিভাবকের হাতে

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বহুল ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে বয়সোপযোগী নয়, এমন কন্টেন্ট হাতে এসে পড়া, অনলাইন বুলিং এবং যৌন-হেনস্থার মতো বিষয়গুলো উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

গত বছর অস্ট্রেলিয়ায় ১৬ বছরের কম বয়সিদের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা জারি করার পর একই ধরনের পদক্ষেপ অন্যান্য দেশেও নেওয়া যায় কি না বা নাবালকদের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের নজরদারি থাকা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

সাম্প্রতিক এক ব্লগে হোয়াটসঅ্যাপ জানিয়েছে, ১৩ বছরের কম বয়সিদের অ্যাকাউন্ট তাদের অভিভাবকেরা তৈরি করতে পারবেন। তারাই নিয়ন্ত্রণ করবেন ওই প্ল্যাটফর্মে তাদের সন্তানরা কী কী ফিচার ব্যবহার করতে পারবে, কার সঙ্গে কথা বলবে, কোন গ্রুপে যোগ দেবে।

বাড়ির প্রাপ্তবয়স্কদের তত্ত্বাবধানে হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহারের সুবিধা থাকার পাশাপাশি, শিশু নিরাপত্তার কথা ভেবে বেশ কিছু ‘রেস্ট্রিকশন’ও থাকছে। যেমন মেটা এআই ফিচার, চ্যানেল, স্ট্যাটাস আপডেট, চ্যাট লক, অ্যাপ লক, ভিউ ওয়ান্স (একবারই দেখা যায় এমন মেসেজ), লিঙ্কড ডিভাইস-এর মতো ফিচার ১৩ বছরের কম বয়সিদের অ্যাকাউন্টে থাকবে না। চ্যাট ডিলিটের অপশনও নেই। 

হোয়াটসঅ্যাপ জানিয়েছে, সাম্প্রতিকতম ভার্সনেই এই সুবিধা পাওয়া যাবে।

কী থাকছে শিশুদের জন্য 'নিয়ন্ত্রিত' হোয়াটসঅ্যাপে?

হোয়াটসঅ্যাপ ইনস্টল করে ‘প্যারেন্ট ম্যানেজড্ অ্যাকাউন্ট’ তৈরি করতে হবে। এরপর বাচ্চার বয়স সংক্রান্ত তথ্য দিয়ে তার ফোন নম্বর রেজিস্টার করতে হবে। ওই ফোনে জেনারেট হওয়া কিউআর কোড স্ক্যান করে বাচ্চার হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্টের সঙ্গে নিজেদের হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট লিঙ্ক করতে পারবেন অভিভাবকেরা।

এরপর নিজেদের পছন্দ মতো ছয় ডিজিটের পিন বেছে নিয়ে সেই পিন ১৩ বছরের নিচে থাকা বাড়ির সদস্যের অ্যাকাউন্টে ভেরিফাই করলেই সমস্ত নিয়ন্ত্রণ অভিভাবকের হাতে থাকবে। এই পিন ব্যবহার করেই প্রাইভেসি সংক্রান্ত সেটিংসসহ একাধিক বিষয় নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।

অভিভাবক নিয়ন্ত্রিত অ্যাকাউন্টের ক্ষেত্রে ফোনের কন্ট্যাক্ট লিস্টে সেভ করা নম্বরের সঙ্গেই যোগাযোগ করা যাবে। নতুন নম্বর থেকে কেউ যোগাযোগ করতে হলে অভিভাবকের অনুমতি লাগবে। ফোনে সেভ করা নেই এমন ব্যক্তি যোগাযোগ করতে চাইলে সেই রিকোয়েস্ট অভিভাবকের কাছে যাবে।

শুধু তাই নয়, অপরিচিত কোন নম্বর অভিভাবক নিয়ন্ত্রিত আকাউন্টের প্রোফাইল ছবি, ‘লাস্ট সিন’-এর মতো বিষয় দেখতে পাবেন না।

আবার ১৩-র নিচে কেউ কোনো নতুন নম্বরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইলে, আগে সেই নম্বর অ্যাড করতে হবে। সেক্ষত্রেও অভিভাবকের কাছে নোটিফিকেশন যাবে। কোনো গ্রুপে যোগ দিতে চাইলেও অভিভাভকের অনুমোদন প্রয়োজন।

নজরে শিশু সুরক্ষা

তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সৌম্যক সেনগুপ্ত বলেছেন, ‘অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, অ্যাকাউন্ট তৈরির সময় শুধু জন্ম তারিখ জিজ্ঞাসা করাই বাচ্চাদের সুরক্ষিত রাখার জন্য জোরালো উপায় নয়—কারণ ভুল তারিখ দেওয়া খুব সহজ।’

তিনি আরও বলেন, ‘সেদিক থেকে এই ধরনের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের সময় সেফ্টি টুলস (সুরক্ষার জন্য বিশেষ ফিচার) এবং প্যারেন্টাল কন্ট্রোল সাহায্য করে।’

তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, নিয়ন্ত্রণের জন্য পিন ব্যবহার করা, নতুন কেউ যোগাযোগ করতে চাইলে অভিভাবকদের অনুমোদনের প্রয়োজন, প্রাইভেসি সেটিংস-এর মতো ফিচারগুলো শিশু সুরক্ষার দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল, মেটা এআই-এর ফিচার রেস্ট্রিকশনও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

সাইবার সিকিউরিটি নিয়েও কাজ করেন তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ পুলকিত গর্গ বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে এই চ্যানেলগুলোর কন্টেন্ট শিশুদের উপযোগী নয়। আবার মেটা এআই কে প্রশ্ন করে তার উত্তরের উপর ভিত্তি করে বাচ্চারা ওষুধ খেয়েছে বা কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে সেই উদাহরণও রয়েছে।’ 

তবে আরেকটি বিষয়ও উল্লেখ করেছেন তিনি। তার কথায়, ‘বিপদের ক্ষেত্রে লোকেশন শেয়ার করার মতো ফিচার গুরুত্বপূর্ণ। জরুরি অবস্থায় বাবা মা ছাড়া বাড়ির অন্য কারো কাছে বা শিক্ষক শিক্ষিকাদের সাহায্য চাইতে এই লোকেশন শেয়ারিং কাজে লাগে। এক্ষেত্রে সেটা থাকছে না।’

সৌম্যক সেনগুপ্ত মনে করেন অনলাইনে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে শুধুমাত্র এ ধরনের অ্যাকাউন্ট বা কোনো বিশেষ ফিচারই যথেষ্ট নয়। তার কথায়, ‘এইভাবে সব কিছু নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। বাচ্চাদের সঙ্গে খোলামেলাভাবে কথা বলা দরকার। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে ঝুঁকি থাকতে পারে তা বুঝতে সাহায্য করা এবং দায়িত্বের সঙ্গে ব্যবহার করতে শেখানোটা দরকার।’

আরও পড়ুন

আরও পড়ুন

গুগল ডুডলে শোভা পাচ্ছে বাংলাদেশের পতাকা

গুগল ডুডলে শোভা পাচ্ছে বাংলাদেশের পতাকা

‘জানতামই না আমার মেয়েকে বুলি করা হচ্ছে’

হোয়াটসঅ্যাপের এই পদক্ষেপকে ইতিবাচক বলে মনে করছেন অভিভাবকরাও।

হাওড়ার বাসিন্দা রিনা দাস বলেন, ‘যোগাযোগের সুবিধার জন্য আমার দুই ছেলেকে ফোন দিতে বাধ্য হয়েছি। কিন্তু ডিজিটাইজেশনের যুগে লাগাম টানাটা খুব কঠিন। আমি ইনস্টাগ্রাম বা ফেসবুক ব্যবহার করতে দিই না। হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করে ওরা, কিন্তু কাকে কী মেসেজ করছে সেটা নজরে রাখতে পারি না। অভিভাবকরা বাচ্চাদের হোয়াটসঅ্যাপ নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে সত্যিই ভাল হবে।’

দক্ষিণ কলকাতার এক বাসিন্দা জানিয়েছেন, গত বছর মেয়ের হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট ঘেঁটে জানতে পারেন সে বুলিং-এর শিকার। তিনি বলেন, ‘আমি জানতাম না আমার মেয়েকে বুলি করা হচ্ছে। গতবছর ওর বন্ধুদের গ্রুপ চ্যাট পড়ে জানতে পারি। বহুবার জিজ্ঞাসা করার পর জানতে পারি যে সঙ্কোচের কারণে সে শুধু বাড়িতে বলতে পারেনি তাই নয়, যাতে চোখে না পড়ে তাই চ্যাট ডিলিটও করে দিত।’

বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?

অনলাইনে শিশু সুরক্ষার উপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞ সত্যগোপাল দে। শিশু অধিকার ও শিশু সুরক্ষা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেছেন তিনি।

তার কথায়, ‘ডিজিটাইজেশনের যুগে আমরা বাচ্চাদের কোনোমতেই ইন্টারনেট থেকে দূরে রাখতে পারব না। বাচ্চারা যোগাযোগ বা নলেজ শেয়ারিং-এর জন্য হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করলে বাধাও দিতে পারব না। কিন্তু প্যারেন্টাল কন্ট্রোল থাকলে বিষয়টা অনেকটা সহজ হয়ে যায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘পাশাপাশি বাচ্চাদের যদি এটা শেখানো যায় যে নিরাপত্তা এবং বয়সের কথা মাথায় রেখে কোন অ্যাপ ব্যবহার করা ঠিক, কোনটা নয় এবং নির্দিষ্ট অ্যাপে সেফটি টুল কীভাবে ব্যবহার করবে। আমি মনে করি শিশুদের উপযোগী ফোন থাকলে আরো ভাল হয়।’

হোয়াটসঅ্যাপ-এর এই সাম্প্রতিক পদক্ষেপকে ইতিবাচক বলেই মনে করেন পেরেন্টিং কনসালট্যান্ট পায়েল ঘোষ। চাইল্ড সাইকোলজি ও পেরেন্টিং নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করছেন তিনি।

এই বিশেষজ্ঞের কথায়, ‘পাঁচজনকে কাউন্সিলিং করলে তিনজন এমন অভিভাবক পেয়েছি যারা তার সন্তানের চ্যাট পড়ে বিশ্বাসই করতে পারছেন না, তার সন্তান এমন কথা বলতে বা আলোচনা করতে পারে। তাই আমার মনে হয় নজরদারিটা দরকার।’

‘বাচ্চাদের হাতে বিভিন্ন ধরণের কনটেন্ট এসে পড়ার সম্ভাবনা থাকে যা স্বাভাবিকভাবেই কৌতূহল বাড়িয়ে তোলে। এর প্রভাবও তাদের মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। তাই একটা বয়স পর্যন্ত তাদের চিন্তা ভাবনাকে দিশা দেওয়াটা খুব প্রয়োজন বলে আমি মনে করি।’

এই প্রসঙ্গে নানান ঝুঁকির কথা উল্লেখ করেছেন তিনি। তার কথায়, ‘গ্রুপে এমন অনেক বিষয়ে আলোচনা হয় যা তাদের পক্ষে ভাল না, বুলিং-ও হয়। বাবা-মায়েরা যদি এই বিষয়গুলোতে নজরদারি করতে পারেন তাহলে তা বাচ্চাদের পক্ষে ভালই হবে।’

তবে তার মতে এক্ষেত্রে অভিভেবকদের বেশ কয়েকটা বিষয় লক্ষ্য রাখা দরকার।

পায়েল ঘোষ বলেন, ‘অভিভাবকদের নিজেদের শৈশবের সঙ্গে এখনকার শিশুদের কথা মেলালে হবে না। সবকিছুতে নিষেধাজ্ঞা জারি করলে হবে না। একটা ব্যালেন্স বজায় রাখতে হবে। নাহলে বাচ্চারা বাবা-মায়ের সঙ্গে কমিউনিকেশন বন্ধ করে দেবে, কথা গোপন করবে।’

তিনি বলেন, ‘পাশাপাশি উদাহরণ দিয়ে বাচ্চাদের বুঝিয়ে বলতে হবে কেন এই নজরদারি দরকার। এই নজরদারি না থাকায় বাচ্চারা কীভাবে অসুবিধায় পড়েছে তা-ও বুঝিয়ে বলতে হবে।’

সূত্র: বিবিসি বাংলা



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews