গণতন্ত্রের মূল শক্তি কেবল রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নহে। বরং তাহার প্রকৃত পরীক্ষা হয় জনগণের অংশগ্রহণ, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে। বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সমান্তরাল গণভোট সেই অর্থে একটি ব্যতিক্রমী ও বিশাল আয়োজন। ইহা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হইবার ভিতর দিয়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাহার সদিচ্ছা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার একটি দারুণ নিদর্শন তৈরি করিল। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন নির্বাচনকে অতীতের তুলনায় অধিক সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য বলিয়া মন্তব্য করিয়াছেন। তিনি স্বীকার করিয়াছেন যে 'পারফেক্ট' নির্বাচন কোথাও হয় না, কিন্তু যে কোনো মানদণ্ডে ইহা একটি ভালো নির্বাচন। অন্যদিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস নির্বাচনকে দেশের ইতিহাসে অন্যতম শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। তিনি দেশবাসীকে ধন্যবাদ দিয়াছেন। তবে ধন্যবাদ তাহারই প্রাপ্য।

এই নির্বাচনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হইল একই সঙ্গে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আয়োজন। এত বৃহৎ দুটি প্রক্রিয়া একত্রে পরিচালনা করা প্রশাসনিক দক্ষতার একটা জটিল পরীক্ষা ছিল। ভোটকক্ষের সংখ্যা বৃদ্ধি, লজিস্টিক ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা—এই সমস্ত ক্ষেত্রেই যে সমন্বয় প্রয়োজন, তাহা সহজে অর্জনযোগ্য নহে। বিশ্বের বহু উন্নত রাষ্ট্রও বৃহৎ পরিসরের নির্বাচনি আয়োজনকে ধাপে ধাপে সম্পন্ন করিতে বাধ্য হয়, সেই তুলনায় বাংলাদেশের এক দিনের আয়োজন নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন। আমরা বিভিন্ন পরিসংখ্যানের দিকে দৃষ্টি দিলে এই আয়োজনের ব্যাপ্তি অনুধাবন করিতে পারি। প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লক্ষ ভোটার, ৪২ হাজারের অধিক ভোটকেন্দ্র এবং ২ লক্ষ ৪৪ হাজারের অধিক ভোটকক্ষ—এই বিশাল কাঠামোর মাধ্যমে মাত্র এক দিনেই জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট সম্পন্ন করা নিঃসন্দেহে প্রশাসনিকভাবে এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। তুলনামূলকভাবে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে প্রায় ৭ কোটি ৬৬ লক্ষ ভোটারের জন্য ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে আট দফায় ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হইয়াছিল। আট দফার কারণ হইল, সহিংসতা কমানো এবং নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করিবার প্রশাসনিক সক্ষমতা নিশ্চিত করা। সেই বিবেচনায় বাংলাদেশের এক দিনের নির্বাচন আয়োজন কেবল সাংগঠনিক দক্ষতার প্রমাণই নহে, বরং রাষ্ট্রীয় সকল অবকাঠামোর সমন্বয়ের এক উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।

এই নির্বাচনে প্রায় সাড়ে ১৭ লাখ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সদস্য দায়িত্ব পালন করিয়াছেন— যাহা নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে একটি সুসংহত কাঠামো প্রদান করিয়াছে। ফলত বিচ্ছিন্ন কিছু অভিযোগ, ককটেল বিস্ফোরণ কিংবা স্থানীয় পর্যায়ে উত্তেজনাপূর্ণ ঘটনার সংবাদ থাকিলেও সামগ্রিকভাবে বড় ধরনের সহিংসতা বা রাজনৈতিক সংঘর্ষের বিস্তার ঘটিতে দেখা যায় নাই। বিশেষভাবে লক্ষণীয়—এত বৃহৎ নির্বাচনে রাজনৈতিক আক্রমণ-প্রতি-আক্রমণে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটে নাই—যাহা বাংলাদেশের অতীত রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিবার। ভোটার উপস্থিতির হার প্রায় ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ—যাহা একদিকে অংশগ্রহণের একটি উল্লেখযোগ্য মাত্রা নির্দেশ করে, অন্যদিকে ভবিষ্যতের জন্য আরো বিস্তৃত রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার প্রয়োজনীয়তার কথাও স্মরণ করাইয়া দেয়। গণতন্ত্রের মান উন্নত হয় কেবল ভোটগ্রহণের মাধ্যমে নহে। বরং ভোটারদের আস্থা, রাজনৈতিক দলগুলোর দায়বদ্ধতা এবং নির্বাচনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার ধারাবাহিক উন্নতির মাধ্যমে।

সুতরাং, বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একটি বৃহৎ রাষ্ট্রীয় আয়োজন হিসাবে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সম্পন্ন হওয়া নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক বার্তা প্রদান করে। মানুষ নির্ভয়ে, নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারিয়াছে—ইহা গণতন্ত্রের মূল শক্তি। এই কৃতিত্ব প্রধান উপদেষ্টা, নির্বাচন কমিশন, সেনাবাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলের। ইহা একটি চমৎকার দৃষ্টান্ত হইয়া রহিল। সংশ্লিষ্টরা ভবিষ্যতেও এই ধারা অব্যাহত রাখুক, এবং বাংলাদেশকে গণতন্ত্রের পথে ক্রমশ অগ্রগামী করুক। অপার সম্ভাবনার এই দেশটি সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বিকশিত হউক।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews