প্রতি বছর ১৫ জুন বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব প্রবীণ নির্যাতন সচেতনতা দিবস। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য হলো- ‘সচেতনতার গণ্ডি পেরিয়ে প্রবীণ নির্যাতন প্রতিরোধকে বাস্তবে কার্যকর করতে হবে।’  এই প্রতিপাদ্য আজকের বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কারণ প্রবীণ নির্যাতন এখন আর কেবল শারীরিক নির্যাতনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; অবহেলা, একাকিত্ব, অর্থনৈতিক অনিরাপত্তা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং মানসিক যন্ত্রণা এর নতুন ও নীরব রূপ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। প্রতিপাদ্যটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আর তা হলো প্রবীণ নির্যাতন সম্পর্কে সচেতনতাই যথেষ্ট নয় বরং এর বিরুদ্ধে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে প্রায়োগিক ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে- তাহলেই কেবল প্রবীণ নির্যাতন সচেতনতা দিবস পালন যথার্থ হবে।

পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে ২০২৫-২৬ সালে ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর হার প্রায় ৭%-৮%-এ পৌঁছেছে। কোনো দেশের মোট জনসংখ্যার ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সি মানুষের হার ৭% বা তার বেশি হলে সে দেশকে বার্ধক্যমুখী সমাজ বলে। তাই বর্তমানে বাংলাদেশ বার্ধক্যমুখী সমাজে পরিণত হয়েছে। স্বাধীনতার পর আমাদের গড় আয়ু যেখানে ছিল ৫০ বছরেরও কম, সেখানে বর্তমানে তা ৭৩ বছরের বেশি। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রবীণ ষাটোর্ধ্ব (60+) মানুষের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৬৫ লাখ। যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ। চিকিৎসাসেবার উন্নয়ন, শিশুমৃত্যু হ্রাস এবং জীবনমানের উন্নতির ফলে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। জাতিসংঘের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েক দশকের মধ্যে বাংলাদেশের প্রতি পাঁচজন নাগরিকের একজন হবে প্রবীণ। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রবীণ জনগোষ্ঠীর এই দ্রুত বৃদ্ধির তুলনায় তাদের সুরক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং মর্যাদা নিশ্চিত করার প্রস্তুতি এখনো অপর্যাপ্ত। প্রবীণ নির্যাতনের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো- সমাজে ইহা অনেকাংশেই অদৃশ্য। শারীরিকভাবে দৃশ্যমান নির্যাতন গ্রামে একটু বেশি হলেও শহরে তুলনামূলকভাবে কম। তবে শহরে অদৃশ্য নির্যাতন যেমন- অবহেলা ও উপেক্ষা, মানসিক নির্যাতন, একাকিত্বে ফেলে রাখা, অর্থনেতিক নির্যাতন, স্বাস্থ্যসেবায় অবহেলা, ডিজিটাল ও তথ্যগত বঞ্চনা এবং মর্যাদাহানি উল্লেখযোগ্য। এসব অদৃশ্য নির্যাতন প্রবীণদের আত্মসম্মান, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য তথা জীবনমানকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে, যদিও এ ধরনের নির্যাতন সহজে চোখে পড়ে না।

বাংলাদেশে এ দিবসটি এমন একসময়ে এসেছে, যখন রাজধানীর মিরপুরে ৭৫ বছর বয়সি নূরজাহান বেগমের মৃত্যুর ঘটনা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদমাধ্যম ও সবার মনে নূরজাহান বেগমের মৃত্যু ঘুরপাক খাচ্ছে একজন মা কতটা নিঃসঙ্গ হলে তাঁর মৃত্যুর দীর্ঘ সময় পরও নিকটাত্মীয়দের অগোচরে পচাগলা অবস্থায় পড়ে থাকতে পারে। ঘটনাটির তদন্ত ও আইনি দিক সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়; কিন্তু এটি বর্তমান সামাজিক বাস্তবতার এক নির্মম আয়না- এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। এরকম আজকাল অসংখ্য নূরজাহান বেগমদের মৃত্যু এভাবে ঘটলেও ভাইরাল হওয়া উপরন্তু রাজধানীতে হওয়ায় আমরা সবাই তা জানতে পেরেছি; কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই এগুলো অধরা থেকে যায়। বাংলাদেশে হাজারো অবহেলিত প্রবীণের নির্যাতনের নীরব রূপ এটি। এসব ঘটনার সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো- এটি আমাদের উন্নয়ন ও শিক্ষার প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

আমরা শিক্ষার হার বৃদ্ধির কথা বলি, উচ্চশিক্ষিত ছেলেমেয়ের সাফল্য উদযাপন করি। প্রযুক্তিগত অগ্রগতিকে আমাদের উন্নয়নের সূচক হিসেবে দেখি, কিন্তু একজন প্রবীণ মা যদি জীবনের শেষ বেলায় এসে নিঃসঙ্গতা ও অবহেলার প্রতীকে পরিণত হন তাহলে আমাদের শিক্ষা কতটা মানবিক মানুষ তৈরি করছে- সে প্রশ্ন এখন সবার। নূরজাহান বেগমের মৃত্যুও হয়তো এক দিন সংবাদপত্রের শিরোনাম থেকে হারিয়ে যাবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনাও থেমে যাবে, কিন্তু এসব ঘটনা আমাদের সামাজিক সম্পর্কের ভঙ্গুরতা, মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং উন্নয়নের আড়ালে জমে ওঠা এক নীরব সংকটের ইঙ্গিত দেয়। এসব ঘটনা নিছক পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা নয়; এগুলো আমাদের সামাজিক মূল্যবোধের সংকটের নির্মম প্রতিফলন।  একজন প্রবীণ মানুষের জীবনের শেষ সময়ে প্রয়োজন হয় প্রিয়জনের সান্নিধ্য, যত্ন ও সম্মান। যখন পরিবার, সমাজ কিংবা রাষ্ট্র সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তখন সেখানে এক ধরনের নীরব নির্যাতন ঘটছে প্রতীয়মান হয়।

লেখক : যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জেরোন্টোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews