দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসন অবসানের পর ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্রজনতার গণ অভ্যুত্থানকে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। তিনি বলেছেন, হাজারো শহীদের রক্তের বিনিময়ে তাঁবেদার ও ফ্যাসিবাদমুক্ত নতুন এক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের সূচনা হয়েছে। দেড় দশক এ দেশে ফ্যাসিবাদী শাসন চলেছে। গতকাল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন। তিনি নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত নতুন সরকারকে আন্তরিক অভিনন্দন জানান। রাষ্ট্রপতি বলেন, আওয়ামী লীগ বাংলাদেশকে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন বানিয়ে ২০০১ সালের জুনে ক্ষমতা থেকে বিদায় নেয়। ২০০১ সালের অক্টোবরে পূর্ববর্তী সরকারের রেখে যাওয়া দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশের দায়িত্ব নিয়ে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকার দুর্নীতি দমনে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এ ছাড়া দুর্নীতি প্রতিরোধের লক্ষ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ প্রণয়ন করে। এর ফলে বিশ্বে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কলঙ্ক থেকে মুক্তি পায় বাংলাদেশ। মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলন একপর্যায়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। দেশের ছাত্র-জনতা, কৃষক-শ্রমিক, শিক্ষক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, প্রবাসী তথা সব শ্রেণি-পেশার মানুষ, গণতন্ত্রের পক্ষের রাজনৈতিক দলসহ সবার সম্মিলিত আন্দোলনের ফলে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন ঘটে। হাজারো শহীদের রক্তের ওপর দিয়ে তাঁবেদার ও ফ্যাসিবাদমুক্ত নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের সূচনা হয়। তিনি বলেন, আমি ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের এবং দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক দলের সদস্যদের কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি, যাদের অসামান্য ত্যাগের মাধ্যমে বাংলাদেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়ে গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করেছে। ২০২৪ সালের গণ অভ্যুত্থানে সহস্রাধিক মানুষ শহীদ হয়েছেন। নারী, পুরুষ, শিশুসহ আহত ও পঙ্গু হয়েছেন কমপক্ষে ৩০ হাজার মানুষ। পাঁচ শতাধিক মানুষ চোখ হারিয়ে অন্ধত্ব বরণ করেছেন। তিনি আরও বলেন, ২০০৬ সালের অক্টোবর মাসে বিএনপি যখন রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে বিদায় নেয়, তার অনেক আগেই বিশ্বে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়নের কলঙ্ক থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশ এশিয়ার ইমার্জিং টাইগার হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এবারও দুর্নীতি দমন এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণই হবে বর্তমান সরকারের প্রথম এবং প্রধান অগ্রাধিকার। মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের এই উদ্বোধনী অধিবেশন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। একটি শান্তিপূর্ণ, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে এই মহান জাতীয় সংসদের যাত্রা শুরু হয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব রাজনৈতিক দল ও এই নির্বাচন আয়োজনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আন্তরিক অভিনন্দন। তিনি বলেন, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের জন্য নির্বাচন কমিশন, মাঠ প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের নিরলস পরিশ্রম, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তির আন্তরিক উদ্যোগ এবং সাধারণ জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ভবিষ্যতের জন্য একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। বর্তমান সংসদে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছে। আমি এই সংসদে আপনার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং তাঁর নেতৃত্বে গঠিত নতুন সরকারকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাচ্ছি। আমি এই মহান জাতীয় সংসদে নির্বাচিত সব সংসদ সদস্যকেও অভিনন্দন জানাচ্ছি। রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের লাখো শহীদ এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি, যাঁদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আজকের এই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীরউত্তম, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সব অবিসংবাদিত নেতার অবদানকেও আমি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। আমি তিনবারের নির্বাচিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অবদানকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি, যিনি দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে প্রতিবার সামনের কাতারে থেকে আপসহীন নেতৃত্ব দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি বলেন, একটি শান্তিপূর্ণ, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে এই মহান সংসদের যাত্রা শুরু হলো। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে এই নির্বাচনে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ গণতন্ত্রের ইতিহাসে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

 তিনি বলেন, প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও সুরক্ষায় আপসহীন নেতৃত্ব দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি ব্যাংক খাতের সুশাসন ফিরিয়ে আনা এবং পুঁজিবাজারের অনিয়ম তদন্তে কঠোর পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে বলেন, ব্যাংক খাতে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন গঠন করা হবে। পাশাপাশি পুঁজিবাজার সংস্কারে একটি পৃথক কমিশন গঠন করা হবে; যার মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী শাসনামলে হওয়া সব অনিয়ম তদন্ত হবে। তিনি বলেন, জনগণের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ছাড়া দেশে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। রাষ্ট্র পরিচালনার সব কার্যক্রমে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা ও চর্চার ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। একটি ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে সরকার একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক, স্বনির্ভর ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে চলছে। এ ক্ষেত্রে নবগঠিত সরকারের সামনে দারিদ্র্য বিমোচন, দুর্নীতি দমন ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণই বিরাট চ্যালেঞ্জ। পথ কঠিন হলেও রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে এই বাধা অতিক্রম অসম্ভব নয়। সরকারি এবং বিরোধী দলগুলো ঐকমত্যের ভিত্তিতে কাজ করলে খুব সহজেই দ্রুততার সঙ্গে লক্ষ্যে পৌঁছানো যাবে। তিনি আরও বলেন, জাতীয় অগ্রগতি ও উন্নয়নের জন্য সরকারি ও বিরোধীদলীয় সম্মানিত সংসদ সদস্যরা জাতির কাছে দায়বদ্ধ। ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড় বিশ্বাসে উদ্বুদ্ধ হয়ে সবাই মিলেমিশে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করলে আমরাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গঠন করতে সক্ষম হব।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews