ইসলামী ব্যাংক কি সত্যিই দেউলিয়ার পথে? নাকি এটি শুধুই উদ্বেগ, গুঞ্জন ও আস্থার সংকটের প্রতিফলন? প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ব্যাংকিং খাতে অনেক সময় বাস্তব আর্থিক সংকটের চেয়েও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে আস্থার সংকট। আর ইতিহাস বলছে, আস্থা হারালে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী ব্যাংকও টিকে থাকতে পারে না।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিকে ঘিরে বিভিন্ন আলোচনা, সমালোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, গণমাধ্যম এবং জনপরিসরে ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। এসব আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক বিষয়—গ্রাহকের আস্থা।

আস্থা অর্জন করতে বছরের পর বছর লাগে, কিন্তু হারাতে লাগে মাত্র কয়েকটি ভুল সিদ্ধান্ত, দুর্বল সুশাসন বা অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ। তাই একটি ব্যাংকের প্রতি জনগণের বিশ্বাস টিকিয়ে রাখতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং পেশাদার ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য। কারণ ব্যাংকিং খাত মূলত দাঁড়িয়ে থাকে আস্থার ভিত্তির ওপর।

ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ কোনো ভবন, প্রযুক্তি বা মূলধন নয়; বরং গ্রাহকের বিশ্বাস। এই বিশ্বাস যত শক্তিশালী, ব্যাংকের ভিত তত মজবুত। আর বিশ্বাস দুর্বল হলে আর্থিকভাবে সক্ষম প্রতিষ্ঠানও দ্রুত সংকটে পড়ে।

এই বাস্তবতার সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালি ব্যাংক প্রযুক্তি খাতের স্টার্টআপ ও বিনিয়োগ জগতের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত এই ব্যাংক একসময় ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। কিন্তু সুদের হার বৃদ্ধি, বিনিয়োগ ক্ষতি এবং তারল্য নিয়ে উদ্বেগ ধীরে ধীরে গ্রাহকদের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি করে।

ফলাফল ছিল দ্রুত ও নাটকীয়—ব্যাপক আমানত উত্তোলন বা ‘ব্যাংক রান’। মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং ২০২৩ সালের ১০ মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ব্যাংকটি বন্ধ ঘোষণা করে। এই ঘটনা ২০০৮ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বড় ব্যাংক ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচিত হয়।

এসভিবি-এর পতন একটি মৌলিক সত্য সামনে আনে—ব্যাংক প্রথমে ভাঙে আস্থায়, পরে হিসাবের খাতায়।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। শিল্পায়ন, কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা উন্নয়ন, রেমিট্যান্স আহরণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যাংকটির অবদান উল্লেখযোগ্য। কোটি গ্রাহক ও বিনিয়োগকারীর সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

তাই যেকোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সতর্কতা ও দূরদর্শিতা অপরিহার্য। কারণ ব্যাংকিং খাতে আস্থার সামান্য ঘাটতিও বৃহৎ অর্থনৈতিক প্রভাব ফেলতে পারে—শুধু একটি প্রতিষ্ঠানে নয়, পুরো আর্থিক ব্যবস্থায়।

তবে এটাও সত্য, কোনো ব্যাংক সম্পর্কে উদ্বেগ মানেই তা দেউলিয়ার পথে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। একটি ব্যাংকের প্রকৃত অবস্থা নির্ধারিত হয় তার মূলধন, তারল্য, সম্পদের গুণমান, ব্যবস্থাপনা দক্ষতা এবং নিয়ন্ত্রক তদারকির ভিত্তিতে।

কিন্তু একই সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী আস্থার সংকট যে কোনো ব্যাংকের জন্য বড় ঝুঁকি—এ বাস্তবতাও অস্বীকার করা যায় না।

সুতরাং প্রশ্নটি শুধু ইসলামী ব্যাংক দেউলিয়ার পথে কি না—এটা নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, আমরা কি এমন একটি ব্যাংকিং পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারছি যেখানে সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং আস্থা একসঙ্গে টিকে থাকে?

সিলিকন ভ্যালি ব্যাংক-এর পতন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আস্থা হারালে কোনো ব্যাংকই অজেয় নয়। আর আস্থা রক্ষা করতে পারলে সংকটের মধ্যেও প্রতিষ্ঠান টিকে থাকতে পারে।

কারণ শেষ পর্যন্ত ব্যাংকের প্রকৃত শক্তি তার মূলধনে নয়, মানুষের বিশ্বাসে।

লেখক: অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews