বরগুনা জেলা পরিষদের ডাকবাংলোর তৃতীয় তলায় এক মা ও তার দুই শিশুকন্যার রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে রহস্য। ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ। 

তবে ঘটনার পরপরই পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রাথমিকভাবে আত্মহত্যা বলে মন্তব্য করায় প্রশ্ন তুলেছেন নিহত ইতি রানীর স্বজনরা। তাদের দাবি- এটি আত্মহত্যা নয়, বরং একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।

বুধবার (৩ জুন) বিকেলে বরগুনা শহরের থানাপাড়া এলাকায় জেলা পরিষদের ডাকবাংলোর তৃতীয় তলার দুটি কক্ষ থেকে ইতি রানী (৩৪), তার বড় মেয়ে আরাধ্য বিশ্বাস (১১) এবং ছোট মেয়ে অনুরাধা বিশ্বাসের (৩) মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একই পরিবারের তিন সদস্যের মরদেহ দুটি পৃথক কক্ষ থেকে উদ্ধারের ঘটনায় শুরু থেকেই নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

ঘটনার পর বুধবার সন্ধ্যায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে বরগুনার পুলিশ সুপার কুদরত-ই-খুদা সাংবাদিকদের জানান, সিসিটিভি ফুটেজ ও কক্ষের পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রাথমিকভাবে এটিকে আত্মহত্যা বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, আলামত বিশ্লেষণ কিংবা ফরেনসিক পরীক্ষার ফলাফল হাতে পাওয়ার আগেই এমন মন্তব্য করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্বজনরা।

নিহত ইতি রানীর জা মনি রানী বলেন, তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই পুলিশ আত্মহত্যার কথা বলছে। এতে আমাদের সন্দেহ আরও বেড়েছে। আমরা মনে করি এটি নিশ্চিতভাবে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।

স্বজনদের অন্যতম প্রশ্ন সিসিটিভি ফুটেজ নিয়ে। ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে শুধু ইতি রানী ও তাঁর সন্তানদের ডাকবাংলোয় প্রবেশের দৃশ্য দেখা গেছে। তবে এর আগের কিংবা পরের কোনো ফুটেজ প্রকাশ করা হয়নি।

নিহতের ভাই মিত্র সরকার বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাত্র কয়েক মিনিটের ফুটেজ দেখানো হয়েছে। কিন্তু সকাল ১১টা থেকে বিকেল পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ের ভিডিও কোথায়? কারা সেখানে প্রবেশ করেছে বা বের হয়েছে, সেসব তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে না।

তিনি আরও জানান, ইতি রানীর সেদিন ডাকবাংলোয় কাজ করার কথা ছিল না। এছাড়া তাঁর মেয়েরাও আগে কখনো সেখানে যেত না। ফলে ওই দিন তাদের সেখানে উপস্থিত হওয়াটাই রহস্যজনক।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ডাকবাংলোর ৪ নম্বর কক্ষ থেকে ইতি রানী ও ছোট মেয়ে অনুরাধার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। অন্যদিকে ৩ নম্বর কক্ষ থেকে পাওয়া যায় বড় মেয়ে আরাধ্যের মরদেহ। একই পরিবারের সদস্যরা কেন আলাদা কক্ষে ছিলেন, মৃত্যুর আগে তাদের অবস্থান কী ছিল এবং কক্ষগুলোর দরজা কীভাবে বন্ধ হলো—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও অজানা।

বৃহস্পতিবার (৪ জুন) ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, ডাকবাংলোর তৃতীয় তলার বারান্দায় কোনো গ্রিল নেই। ডাকবাংলোর তত্ত্বাবধায়ক নুরুল ইসলাম বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, গ্রিল না থাকায় অতিথিরা নিরাপত্তাহীনতায় থাকেন। তবে বারান্দার থাই গ্লাসের লকগুলো নষ্ট কি না, সে বিষয়ে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।

বৃহস্পতিবার বিকেলে ইতি রানী ও তাঁর দুই কন্যার ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। পরে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হলে স্বজন ও এলাকাবাসী বিক্ষোভ ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন। তারা শহরের বিভিন্ন সড়কে মরদেহ নিয়ে মিছিল করে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেন।

নিহত ইতি রানীর স্বামী দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, আমার স্ত্রী ও দুই মেয়েকে হত্যা করা হয়েছে। এর পেছনে বড় ধরনের ষড়যন্ত্র রয়েছে। আমি সুষ্ঠু তদন্ত চাই। পাশাপাশি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন এবং সম্পূর্ণ সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশের দাবি জানাচ্ছি।

বরগুনার সিভিল সার্জন ডা. আবুল ফাত্তাহ জানান, ময়নাতদন্তে তাৎক্ষণিকভাবে মৃত্যুর কারণ নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। মরদেহের বিভিন্ন নমুনা উন্নত রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। পরীক্ষার ফলাফল পাওয়ার পর বিষক্রিয়া, শ্বাসরোধ অথবা অন্য কোনো কারণে মৃত্যু হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যাবে।

এদিকে বরগুনার পুলিশ সুপার কুদরত-ই-খুদা বলেন, এ ঘটনায় একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করা হয়েছে। নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়নি। অভিযোগ পেলে তা গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিডি-প্রতিদিন/আব্দুল্লাহ



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews