অর্থনীতির এক কঠিন সময়ে দায়িত্ব নেয়ার মাত্র চার মাসের মাথায় একটি বিশাল আকারের বাজেট পেশ করতে যাচ্ছে বর্তমান সরকার। আকার ও ঘাটতি- উভয় দিক থেকেই এটিকে দেশের ইতিহাসের একটি ‘রেকর্ড বাজেট’ বলা চলে। আগামী ১১ জুন বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য মোট ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত এই বাজেটে সামগ্রিক ঘাটতি ধরা হয়েছে দুই লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৪ শতাংশ। এই বিশাল ঘাটতি মেটাতে ব্যাংকিং খাত থেকে মোটা দাগে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার।

বাজেট বক্তৃতার শিরোনাম ও দর্শন

অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতার শিরোনাম কী হবে, তা নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সামষ্টিক অর্থনৈতিক বিভাগ থেকে মোট ছয়টি নামের প্রস্তাব করা হয়েছিল। প্রস্তাবিত নামগুলো হলো : অর্থনীতির বিনিয়ন্ত্রণকরণ : সবার জন্য উন্নয়ন; অর্থনৈতিক গণতান্বিতকরণ ও বিনিয়ন্ত্রণকরণ : সবার জন্য উন্নয়ন; অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ন ও বিনিয়ন্ত্রণকরণ : ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির অভিযাত্রায় বাংলাদেশ; মানবিক, কল্যাণমূলক ও উৎপাদনমুখী দেশ, কর্মসংস্থান, সুশাসন, সমতায় সমৃদ্ধ বাংলাদেশ; বৈষম্যহীন, টেকসই ও ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি গড়ার প্রত্যয়; অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, ক্রিয়েটিভ অর্থনীতির নতুন বাংলাদেশ।

চূড়ান্ত তালিকায় শীর্ষ বিবেচনায় রয়েছে, অর্থনৈতিক গণতান্বিতকরণ ও বিনিয়ন্ত্রণকরণ : সবার জন্য উন্নয়ন অথবা অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, ক্রিয়েটিভ অর্থনীতির নতুন বাংলাদেশ।

সূত্র জানায়, এবারের বাজেটে সরকারের মূল দর্শন থাকবে বিনিয়ন্ত্রণকরণ এবং সৃজনশীল অর্থনীতির মাধ্যমে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির স্বপ্ন বাস্তবায়নের রূপরেখা। পাশাপাশি দারিদ্র্য নিরসন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। বাজেটে বিশেষ নজর থাকছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে, যেখানে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হচ্ছে। বিশেষ করে সরকারের ফ্ল্যাগশিপ কর্মসূচি- ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’কে বাজেটে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হবে।

বিগত অর্থনৈতিক শাসনের চিত্র

বাজেট বক্তৃতায় বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার একটি সংক্ষিপ্ত চিত্রও তুলে ধরবেন অর্থমন্ত্রী। বক্তৃতার খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে : ‘২০০৬ সালে তৎকালীন সরকার বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ রেখে গিয়েছিল এক লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। অথচ ২০২৪ সালের ৩০ জুন তা ৬ গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় আট লাখ ১২ হাজার কোটি টাকায়, যা সত্যিই উদ্বেগজনক। একই সময়ে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নেয়া ঋণ ৬৫ হাজার কোটি টাকা থেকে প্রায় ১৬ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকায়। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো সরকারের সুদ ব্যয়। ২০০৫-০৬ সালে যেখানে সুদ পরিশোধ বাবদ ব্যয় হতো মাত্র আট হাজার ৫০০ কোটি টাকা, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা ১৩ গুণেরও বেশি বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক লাখ ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকায়।’

রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৭ লাখ কোটি টাকা

আগামী অর্থবছরে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে সাত লাখ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে এই লক্ষ্য ছিল পাঁচ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা, যা পরে সংশোধন করে পাঁচ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা করা হয়। আগামী অর্থবছরে এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) প্রায় ছয় লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য দেয়া হতে পারে। এ ছাড়া কর-বহির্ভূত রাজস্ব (এনটিআর) খাত থেকে বাকি অর্থ সংগ্রহের লক্ষ্য ধরা হয়েছে।

৩ লাখ কোটি টাকার এডিপি

সূত্র জানায়, আগামী অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার নির্ধারণ করা হয়েছে তিন লাখ কোটি টাকা। এটি চলতি অর্থবছরের প্রস্তাবিত এডিপির থেকে ৭০ হাজার কোটি টাকা এবং সংশোধিত এডিপির থেকে এক লাখ কোটি টাকা বেশি। চলতি অর্থবছরের মূল এডিপি ছিল দুই লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা, যা পরে সংশোধন করে দুই লাখ কোটি টাকায় নামানো হয়েছিল।

প্রস্তাবিত এই উন্নয়ন বাজেটের মধ্যে এক লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা দেশীয় উৎস এবং এক লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক উৎস থেকে সংস্থান করা হবে। এ ছাড়া অনুদান হিসেবে পাঁচ হাজার কোটি টাকা পাওয়ার আশা করছে সরকার।

সামষ্টিক অর্থনীতি : জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি

সামষ্টিক অর্থনীতির সূচক অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় সহনীয় রাখতে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে ধরে রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের মে মাসে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ।

আগামী বাজেটে জিডিপির মোট আকার নির্ধারণ করা হতে পারে ৬৮ লাখ ৩১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। যেখানে চলতি অর্থবছরে জিডিপির আকার ছিল ৬২ লাখ ৪৪ হাজার ৫৭৮ কোটি টাকা (সংশোধিত ৬১ লাখ ২১ হাজার ৯১০ কোটি টাকা)।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews