কয়েক মাস ধরে শ্রীলঙ্কায় সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীরা আকাশছোঁয়া মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছে। অর্থনৈতিক সংকট দেশটির বৈদেশিক রিজার্ভ প্রায় নিঃশেষ করে দিয়েছে। বিক্ষোভকারীরা প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসে এবং তাঁর ভাই মাহিন্দার পদত্যাগ চান। দাবি মেনে সোমবার প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন মাহিন্দা। এতদিন দেশটিতে গণবিক্ষোভ অনেকাংশে শান্তিপূর্ণ ছিল। গত সপ্তাহে তা সহিংস হয়ে ওঠে। এটা উদ্বেগজনক।

শ্রীলঙ্কা সরকার করোনাভাইরাস মহামারিজনিত ধাক্কাকে অর্থনৈতিক সংকটের জন্য দায়ী করে থাকে। তবে এর উৎপত্তি হয়েছে ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে। বাজে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত এই বিপর্যয় ডেকে এনেছে, যেমন অনেক বেশি ঋণ নেওয়া কিংবা কর কমানো। রাজাপাকসে ভ্রাতৃদ্বয়ের নেতৃত্বে নেওয়া সেই প্রাথমিক ভুলগুলোর সঙ্গে যোগ হয়েছে মহামারি এবং সাম্প্রতিক তেলের দাম বৃদ্ধি। এতে অর্থনীতি আরও দুর্বল হয়েছে। এরপর রাজনৈতিক সংকটের কারণে অর্থনৈতিক চাপ আরও বেড়েছে। প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করলেও এই সংকট শিগগির শেষ হবে না।

২০০৯ সালে শ্রীলঙ্কায় ২৬ বছরের গৃহযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটলে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা সংঘাত-পরবর্তী পুনর্গঠন প্রচেষ্টা জোরেশোরে শুরু করেন। তিনি অবকাঠামোতে বিপুল বিনিয়োগ করতে থাকেন। তবে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের দিকে তার নজর ছিল না। এই উন্নয়নের জন্য ঋণের প্রয়োজন ছিল। এর আগে গৃহযুদ্ধের কারণে বহু বছর ধরে ভঙ্গুর অর্থনীতি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। সরকার ঋণ পরিশোধের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহার করেছে। দেশটির বাণিজ্যিক ঋণ ২০০৬ সালে ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০১৯ সালে ৫৫ শতাংশে পৌঁছায়।

২০১৯ সালে নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসে কর কমিয়ে দেন। এরপর মহামারি শুরু হলে সরকারের রাজস্ব আয় ছিল অপর্যাপ্ত। পর্যটনের ওপর আঘাত আরও বেশি ক্ষতি করেছে দেশটির। ২০১৮ সালে জিডিপিতে পর্যটন শিল্পের অবদান ছিল ৫.৬ শতাংশ। ২০২০ সালে তা মাত্র ০.৮ শতাংশে নেমে এসেছে। কিন্তু সরকার তারপরও প্রচুর ব্যয় করেছে। ফলে মুদ্রার অবমূল্যায়ন হয়েছে। এরপর ২০২১ সালে রাসায়নিক সারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে কৃষি ফলন হ্রাস এবং খাদ্য কিনতে খরচ বাড়তে থাকে।

সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীরা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের অত্যধিক দামে লাগাম টানতে ব্যর্থতার জন্য রাজনৈতিক নেতাদের ওপর ক্ষুব্ধ। তবে তাদের এই বিক্ষোভকে দেখতে হবে বছরের পর বছর ধরে চলা অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার পটভূমিতে।

মাহিন্দা পদত্যাগ করলেও বিক্ষোভকারীরা তাতে সন্তুষ্ট নয়। তারা বলছেন, গোটাবায়াকেও যেতে হবে। প্রেসিডেন্ট পদত্যাগের দাবি উপেক্ষা করে এর পরিবর্তে একটি ঐক্য সরকারের প্রস্তাব দিয়েছেন। এরপর বৃহস্পতিবার রনিল বিক্রমাসিংহে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তিনি এর আগে পাঁচবার এই দায়িত্ব পালন করলেও বিরোধী দল বা জনসাধারণের মধ্যে তাঁর ব্যাপকভিত্তিক সমর্থন নেই। তিনি রাজাপাকসেদের ঘনিষ্ঠ বলে মনে করা হয়। তাই তাঁর এই নিয়োগ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা কমাতে খুব সামান্যই অবদান রাখবে।

সরকার অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে জোর দিলেও তাকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ প্যাকেজের ওপর নির্ভর করতে হবে। এ জন্য কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। ব্যয় সংকোচন করতে হবে। এর মানে কষ্ট আরও বাড়বে। এ ধরনের পদক্ষেপ জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। তাই এর অর্থ হবে একটি নতুন অন্তর্বর্তী সরকার, গোটাবায়ার পদত্যাগ এবং আগাম নির্বাচন। প্রেসিডেন্ট পদত্যাগে অস্বীকৃতি জানানোর কারণে এর কোনোটিই সম্ভব হবে বলে মনে হচ্ছে না।

মহামারি কমে গেলে দেশটির পর্যটন খাত আবার চাঙ্গা হয়ে উঠতে পারে। বিশ্বব্যাপী তেলের মূল্য বৃদ্ধি পেলে শ্রীলঙ্কা প্রবাসীদের কাছ থেকে বেশি রেমিট্যান্স পেতে পারে। কারণ প্রবাসীদের মধ্যে অনেকেই তেল উৎপাদনকারী পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোতে কাজ করে। তবে এরপর যাই আসুক না কেন, এটি অনেকটাই সত্য যে, শেষ পর্যন্ত সরকারের পতন ঘটতে পারে। তাতে রাজাপাকসে পরিবারের কর্তৃত্ব নাটকীয়ভাবে দুর্বল হয়ে গেলেও তা খুব দ্রুত শেষ হওয়ার কথা নয়। রাজাপাকসেরা দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ সিংহলি জনগোষ্ঠীর মধ্যে খুব জনপ্রিয় এবং শ্রীলঙ্কার বিরোধীরা বিভক্ত। ফলে দেশটি তার অর্থনীতি উদ্ধার করতে পারলেও রাজনৈতিক পরিবেশ অস্থিতিশীলই থাকবে।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews