বিশ্বব্যাপী সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ও নিহতের সংখ্যা ২০২০ সালের মধ্যে অর্ধেকে কমিয়ে নিয়ে আসাটা ছিল টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) অন্যতম লক্ষ্য।





পাশাপাশি এসডিজিতে প্রতিটি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রিত যানবাহন সম্প্রসারণ করে সড়ক নিরাপত্তাব্যবস্থার উন্নতির মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও সুলভ পরিবহণব্যবস্থায় সব নাগরিকের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে; কিন্তু গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে বোঝা যাবে, আমরা কি আদৌ ওই বিষয়গুলোর বাস্তবায়ন কিংবা লক্ষ্যে পৌঁছানোর ব্যাপারে অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছি? ২০২০ সাল পর্যন্ত নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রাই আমরা এখন পর্যন্ত পুরোপুরি অর্জন করতে পারিনি; অন্তত তথ্য-উপাত্ত কিংবা পরিসংখ্যান তাই বলে।

পাশাপাশি আমরা দুর্ঘটনাগুলো সফলতার সঙ্গে কমাতে পারিনি; বরং অনেকাংশেই বেড়েছে, যেটি আমাদের জন্য বেশ ভয়ংকর। বাকি থাকল ২০৩০ সাল পর্যন্ত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অন্যতম লক্ষ্য কিংবা উদ্দেশ্য অর্জন। সে লক্ষ্য অর্জনে সবাইকে অতিদ্রুত সফলভাবে এবং একযোগে কাজ করতে হবে। যদি আমরা চাই, তাহলে নির্দিষ্ট সময়ের এ অর্জনের দাবিদার আমরা হবোই।

সবচেয়ে ভয়ংকর; কিন্তু বাস্তব সত্যিটা হলো, বাংলাদেশে এবার কুরবানির ঈদের ছুটিতে শহর থেকে গ্রামে যাতায়াতের সময় গত সাত বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতি বলছে, ঈদের আগে ও পরের ১৫ দিনের মধ্যে দেশের সড়ক-মহাসড়কে ৩১৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৯৮ জন নিহত এবং ৭৭৪ জন আহত হয়েছে।

এবারের কুরবানির ঈদে কেবল রাজধানী ঢাকা থেকেই ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ নিজ আবাসস্থলে যাতায়াত করেছে। তাদের অনুমান, এক জেলা থেকে অপর জেলায় আরও প্রায় ৪ কোটি মানুষের যাতায়াত হয়েছে।

গত ৩ থেকে ১৭ জুলাই পর্যন্ত মোট ১৫ দিনের তথ্য সংগ্রহ করে দেখা গেছে, ঈদ উপলক্ষ্যে যাতায়াতে এ সময়ের মধ্যে ৩১৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৯৮ জন নিহত ও ৭৭৪ জন আহত হয়েছে। একই সময়ে রেলপথে ২৫টি দুর্ঘটনায় ২৫ জন নিহত ও দুজন আহত হয়েছে।

নৌপথে ১০টি দুর্ঘটনায় ১৭ জন নিহত ও ১৫ জন আহত এবং তিনজন নিখোঁজ হয়েছে। সব মিলিয়ে সড়ক, রেল ও নৌপথে ৩৫৪টি দুর্ঘটনায় ৪৪০ জন নিহত ও ৭৯১ জন আহত হয়েছে। বিগত ৭ বছরের ঈদের যাতায়াতের সঙ্গে তুলনা করলে এবারের ঈদে সড়কে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি দুটোই সর্বোচ্চ।

বিভিন্ন গবেষণা ও পূর্বের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এবারে দুর্ঘটনার শীর্ষে রয়েছে মোটরসাইকেল বা বাইক দুর্ঘটনা। কুরবানির ঈদে ১১৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৩১ জন নিহত ও ৬৮ জন আহত হয়েছে, যেখানে প্রায় আড়াই মাস আগে ঈদুল ফিতরের আগে-পরে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৪৫ জন নিহত, ১১০ জন আহত হয়েছে; যা ছিল মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৪৪.০৮ শতাংশ; নিহতের ৩৪.৮৫ শতাংশ এবং আহতের ১৩.০৩ শতাংশ প্রায়।

দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশে ট্রাফিক আইনটি যেন একেবারেই উপেক্ষিত। রাস্তায় জেব্রা ক্রসিং থাকা এখানে একেবারেই অর্থহীন, পুরোপুরি অর্থহীন যেন সড়কের লাল-নীল বাতিও। অন্যদিকে পথচারীদের কথা চিন্তা করলে অনেকাংশেই মনে হবে, তারা যেন চারপাশে ভালোভাবে না দেখে বেপরোয়াভাবে রাস্তা পার হচ্ছেন, নাকি আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন! কারণ, অধিকাংশ এলাকায় দেখা যায় ফুটওভার ব্রিজগুলো খাঁ খাঁ করছে।

আর এর নিচ দিয়েই ১০০ মিটার স্প্রিন্টারের গতিতে দৌড়ে কিংবা সুউচ্চ রোড ডিভাইডার নানারকম কসরত করে পার হওয়ার চেষ্টা করছেন পথচারীরা। তবে শুধু তাদের দোষারোপ করলেই হবে না; কারণ, অনেক ক্ষেত্রেই নেই পর্যাপ্ত দূরত্বে ফুটওভার ব্রিজ।

সংগত কারণেই প্রশ্ন জাগে, এর সবই কি শুধুই দুর্ঘটনা? শুধু পত্রিকার খবর অনুযায়ী, যতগুলো বড় দুর্ঘটনার খবর আলোচনায় আসে, তার অধিকাংশের ক্ষেত্রেই দেখা যায়-চালক নয়, হেলপার গাড়ি চালাচ্ছিলেন, লাইসেন্সহীন অপরিণত চালক, মোবাইল ফোনে কথা বলা, অনিয়ন্ত্রিত গতি, পাল্লা দিয়ে ওভারটেক ইত্যাদি তো রয়েছেই। সড়ক আইন অনুযায়ী, এর প্রতিটিই শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

এ ধরনের কোনো কারণে কারও মৃত্যু হলে চালককে প্রায় খুনের মতো শাস্তির মুখোমুখি হওয়ার কথা। উন্নত দেশে তাই হয়। কোনোভাবেই তুচ্ছ জ্ঞানে এগুলোকে পাশ কাটিয়ে না গিয়ে বরং বিচারের আওতায় আনার কথা সর্বোচ্চ গুরুত্ব সহকারে।

সড়ক দুর্ঘটনা থেকে উত্তরণে কিংবা ব্যাপকভাবে কমাতে দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ বৃদ্ধি, পরিবহণ চালকের বেতন ও কর্মঘণ্টা নির্দিষ্টকরণ, বিআরটিএ’র সব লেভেলে সক্ষমতা বৃদ্ধি, পরিবহণের মালিক-শ্রমিক, যাত্রী ও পথচারীদের প্রতি ট্রাফিক আইনের কঠোর ও বাধাহীন প্রয়োগ নিশ্চিতকরণ, মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল পুরোপুরি বন্ধ ও পাশাপাশি এগুলোর জন্য আলাদা সার্ভিস রোড তৈরি, পর্যায়ক্রমে সব মহাসড়কে রোড ডিভাইডার নির্মাণ, গণপরিবহণে সব ধরনের চাঁদাবাজি বন্ধ, রেল ও নৌপথ সংস্কার ও সম্প্রসারণ করে সড়কপথের ওপর চাপ কমানো, টেকসই পরিবহণ কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এবং সড়ক পরিবহণ আইন-২০১৮ বাধাহীনভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে সড়কে মৃত্যুর মিছিল অনেকটাই কমানো যেত।

সর্বস্তরের জনগণের, বিশেষত নগরবাসীর জোরালো দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ২২ অক্টোবর ২০১৯ সালে ‘সড়ক পরিবহণ আইন-২০১৮’ কার্যকরের তারিখ ঘোষণা করেছে, যেখানে সব ধরনের সাজা বাড়িয়ে নতুন আইনে কঠোর শাস্তির বিধান রাখার কথা বলা হয়েছে। নতুন আইনে বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে কাউকে আহত করলে তিন লাখ টাকা জরিমানা ও তিন বছরের জেল হবে।

অন্যদিকে চালকদের লাইসেন্স পেতে অষ্টম শ্রেণি ও সহকারীকে পঞ্চম শ্রেণি পাশসহ ড্রাইভিং লাইসেন্সের বিপরীতে ১২ পয়েন্ট রাখা হয়েছে। আইনভঙ্গে জেল-জরিমানা ছাড়াও লাইসেন্সের পয়েন্ট কাটা এবং ১২ পয়েন্ট কাটা গেলে লাইসেন্স বাতিল হয়ে যাবে। রেজিস্ট্রেশন ছাড়া গাড়ি চালনাসংক্রান্ত ধারা ১৬-এর বিধান লঙ্ঘনে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে, এমন কথা উল্লেখ করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ শ্রমিক ফেডারেশনের পক্ষ থেকে নতুন সড়ক পরিবহণ আইন সংশোধনের দাবি উত্থাপিত হলেও এর কোনো সুরাহা এখনো হয়নি।

দাবি উত্থাপন কতটুকু যৌক্তিক বা গ্রহণযোগ্য, এ সম্পর্কে নিবিড় বিশ্লেষণ প্রয়োজন। দুর্ঘটনার কারণগুলো কমবেশি চিহ্নিত হলেও এ থেকে পরিত্রাণের জন্য আশু-স্বল্প-দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং তার যথাযথ আইনি-সচেতনতামূলক গণপ্রয়োগ অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়েছে।

এবারের কুরবানির ঈদে সড়ক দুর্ঘটনা বিগত সাত বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ, তাই এখন এটি শুধু নিছক কোনো দুর্ঘটনা নয়; বরং অনেকাংশেই এটি দুর্যোগের পর্যায়ে চলে গেছে। সড়কে এমন বিশৃঙ্খলা চলতে থাকলে ২০২২ সালে সড়ক দুর্ঘটনা-পূর্ববর্তী সময়ের চেয়ে আরও অনেক গুণে বেড়ে যেতে পারে। তাই সড়ক দুর্ঘটনারোধে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অতিদ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছে। সড়ক দুর্ঘটনা যেন সড়ক দুর্যোগে রূপ না নিতে পারে, সেদিকে এখনই কঠোর নজর দেওয়ার সময় এসেছে।

মো. শাহ জালাল মিশুক : সহকারী অধ্যাপক, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews