সাম্প্রতিক সময়ে, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে, আমরা দেখছি কাবুলসহ আফগানিস্তানের বিভিন্ন জায়গায় বোমা হামলা হচ্ছে। আগস্টের ১৫ তারিখে তালেবানরা যখন আফগানিস্তানের শাসনক্ষমতায় আসে, তখন এমন একটা ধারণা জন্মেছিল যে তারা এখন সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে নিতে পেরেছে এবং এতে করে আফগানিস্তানে একটা শান্তিপূর্ণ অবস্থা ফিরে আসবে।

আমরা জানি, গত প্রায় ৪০ বছর ধরে আফগানিস্তানে বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন কারণে বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা ও নিরাপত্তাহীনতার ঘটনা ঘটেছে। এ প্রেক্ষাপটে আফগান জনগণের একটা স্বাভাবিক প্রত্যাশা ছিল-তালেবানরা যেহেতু এবার এককভাবে পুরো আফগানিস্তানের ওপর নিয়ন্ত্রণ নিয়েই শাসনক্ষমতায় এসেছে, কাজেই তারা হয়তো একটা স্থিতিশীল অবস্থা নিশ্চিত করতে পারবে।

তবে একটা বিষয় নিয়ে মার্কিনিরা সন্দেহ পোষণ করছিল, সেটা হলো তালেবানদের সঙ্গে আল কায়দা ও আইএস-কে (ইসলামিক স্টেট খোরাসান)-এর কী ধরনের সখ্য আছে বা তালেবান ফিরে আসায় তারা খুশি হবে কিনা এবং আইএস-কে শক্তিশালী হবে কিনা। যদি তাই হয়, তাহলে তো আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ আবারও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার মতো একটা আশঙ্কা তৈরি হবে।

গত কয়েক দিনের ঘটনাবলি থেকে এ বিষয়ে কয়েকটা ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন ৩১ আগস্টের মধ্যে তাদের নাগরিকদের সরিয়ে নিচ্ছিল, তখনো বিমানবন্দরে বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছিল। এ হামলায় একশর মতো মানুষ নিহত হয়েছেন। এ অবস্থায় একটি বিষয় দৃশ্যপটে এসেছে-আইএস খোরাসান নামে যে সংগঠনের কথা বলা হয়, তাদের সঙ্গে আগেও তালেবানের দ্বন্দ্ব ছিল, এখনো আছে।

আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় এসেছে, তালেবানদের সঙ্গে আইএস-কে’র ক্ষমতা নিয়ে একটা প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে। এখানে দুটো বিষয় রয়েছে। একটা হচ্ছে, আইএস-কে বা আল-কায়দা তালেবানদের চ্যালেঞ্জ করতে চায় এবং সে কারণে তালেবানরাও তাদের ব্যাপারে খুব একটা সহনশীল ছিল না। তালেবানরা চাইত না আইএস-কে তালেবানদের ক্ষমতায় যাওয়ার পথে কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করুক।

দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে, আইএস খোরাসানের সঙ্গে আফগানিস্তানের পূর্ববর্তী ভাইস প্রেসিডেন্ট আমরুল্লাহ সালেহর একটা সংশ্লিষ্টতার কথা আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় এসেছিল। মিডিয়ায় বলা হচ্ছিল, তিনি আইএস খোরাসানকে পেছন দিক থেকে মদদ দিচ্ছিলেন। তারা যাতে পাকিস্তানের দিকে বেশি মনোযোগী থাকে এবং প্রয়োজনে পাকিস্তানে আক্রমণ শানিত করে-এমন ধরনের উসকানি তিনি দিতেন। বস্তুত এ ধরনের একটা অভিযোগ আন্তর্জাতিক মহলে উঠে আসে।

তবে সামগ্রিকভাবে যেটা বলা যায় তা হচ্ছে, আইএস-কে’র সঙ্গে তালেবানের দীর্ঘ সময় একটা প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা প্রতিযোগিতা এবং সময়ে সময়ে সংঘাত হয়। সেটা কিন্তু এখন প্রতিষ্ঠিত। এর ফলে কয়েকটি বিষয় এখন আমার কাছে প্রতীয়মান হচ্ছে। এর একটি হচ্ছে, তালেবানরা নিরাপত্তার ব্যাপারে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছে বলে যে ধারণাটা প্রাথমিকভাবে পাওয়া গিয়েছিল, গত দু-তিন সপ্তাহের ঘটনাবলিতে তাতে একটা সন্দেহের জায়গা তৈরি হয়েছে। সে সন্দেহটি হচ্ছে, তালেবানরা সত্যি সত্যিই এই আইএস-কে ও আল কায়দাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে কিনা।

দ্বিতীয় বিষয়টি হলো, তালেবানরা যদি এই আইএস-কে সংগঠনটিকে সবসময় নিরাপত্তার ব্যাপারে ব্যতিব্যস্ত করে রাখতে পারে, তাহলে তালেবান সরকার দ্বিমুখী চাপে পড়বে। একটি হচ্ছে, তাদের স্বীকৃতির ব্যাপারে একটা আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক দুই ধরনের চাপ রয়েছে। অভ্যন্তরীণভাবে অর্থনৈতিক দুরবস্থা এবং নীতিগত অবস্থানের কারণে তালেবানরা এমনিতেই চাপের মুখে আছে।

এখন যদি সেখানে আইএস-কে আরেকটি মাথাব্যথার কারণ হয়, তাহলে তালেবানদের জন্য তা একটা বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। এর ফলে তালেবানরা একটি স্থিতিশীল আফগানিস্তান উপহার দেবে বলে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এবং আফগানিস্তানের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বা সেখানকার সংকট থেকে বেরিয়ে আসার জন্য তাদের যে স্থিতিশীলতা দরকার, সেটা পাওয়া তাদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। এটা তালেবানদের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ বলে আমি মনে করি।

তবে এই চ্যালেঞ্জটিকে তালেবানদের দুর্বলতা বলে অনেকে মনে করছেন। অর্থাৎ আইএস খোরাসানের অতি সক্রিয় হওয়াটাকে তালেবানদের প্রতি চ্যালেঞ্জ হিসাবে দেখছেন অনেকে। তালেবানরাও হয়তো এ ধারণা পোষণ করা শুরু করেছে। আইএস খোরাসান চ্যালেঞ্জটি তালেবানদের জন্য জটিলতা তৈরি করবে এটা তারা বুঝতে পারছেন। নি

জেদের সক্ষমতা দিয়ে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা কঠিন হবে এই উপলব্ধিটাও তাদের মধ্যে আছে। আর এই উপলব্ধিটাই তাদেরকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার একটা সুযোগ তৈরি করেছে। কারণ গত ৯ অক্টোবর কাতারের দোহায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তালেবান পক্ষ দুই দিনব্যাপী সরাসরি আলোচনায় বসেছে। আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং তালেবানের ক্ষমতা গ্রহণের পর এই প্রথম সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তালেবান আলাপ-আলোচনা শুরু করেছে। ওই বৈঠকে নিজ নিজ স্বার্থকেই গুরুত্ব দিচ্ছেন উভয় পক্ষের প্রতিনিধি দল।

তালেবানের নজর সরকারের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, মানবিক সহায়তা এবং অর্থ ছাড়ের দিকে। অন্যদিকে সন্ত্রাস দমন ও আফগানিস্তানে একটি ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার’ গঠনের নিশ্চয়তা চায় ওয়াশিংটন। আমার ধারণা, তালেবানরা নিজেদের সক্ষমতার ঘাটতিটা উপলব্ধি করে এই আইএস খোরাসানকে ম্যানেজ করার জন্য বা তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজন আছে বলে মনে করছে।

একইসঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও আফগানিস্তানের ঘটনাবলির জন্য কম চিন্তিত-এমনটি মনে করার কোনো কারণ নেই। কারণ ক’দিন আগে কংগ্রেসে সিনেটের হেয়ারিংয়ের সময় জয়েন্ট চিফ অফ স্টাফ মার্ক এ. মিলি বলেছিলেন, আফগানিস্তানে আমাদের যুদ্ধ শেষ হয়েছে, কিন্তু ঝুঁকি শেষ হয়নি। কারণ সেখানে আল কায়দা, আইএস-কে আবারও ঘাঁটি গাড়তে পারে। আল কায়দা ও আইএস-কে যদি সেখানে ঘাঁটি গাড়তে পারে, তাহলে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে। সিনেট হেয়ারিংয়ে এমন আশঙ্কাই প্রকাশ করা হয়েছে।

এ প্রেক্ষাপট থেকে যদি আমরা দেখি, তাহলে এই নিরাপত্তা সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনের জন্য তালেবান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি আসার একটা সুযোগ হয়তো তৈরি হয়েছে। যদি তাই হয়, তাহলে অবশ্যই এটা একটা ইতিবাচক দিক।

আমরা জানি, আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে অর্থনৈতিক সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। এ ক্ষেত্রে যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তালেবানরা সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সহযোগিতা করে এবং এর বিনিময়ে যদি তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা পায়, তাহলে তালেবানদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ অনেকটা সুগম হবে।

কারণ আফগানিস্তানে এখন সাধারণ মানুষ দুরবস্থায় আছে। সেখানে খাদ্য সংকট, অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, নীতিগত অবস্থানের অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। এই পরিবেশ আস্তে আস্তে ইতিবাচক দিকে যেতে পারে, যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তালেবানদের মধ্যে সম্পর্কের উন্নতি হয়। এখন সামনে কী ঘটে সেটাই দেখার বিষয়।

এম হুমায়ুন কবির : সাবেক রাষ্ট্রদূত



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews