এলডিসি থেকে উত্তরণ এখন সময়ের দাবি। কারণ দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দীর্ঘ ৫৪ বছরের অর্থনৈতিক সফলতা হলো এলডিসি থেকে উত্তরণ। আবার ১৯৭৫ সালে এলডিসিতে দেশ অন্তর্ভুক্ত হয়ে বিভিন্ন দেশ থেকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কিছু সুবিধা গ্রহণ করে আসছিল, যে সুবিধাটি সরাসরি ভোগ করছিল দেশের ব্যবসায়িক সংগঠন তথা বড় বড় ব্যবসায়ীরা। সুতরাং এলডিসি থেকে উত্তরণ হলে দেশ তথা ব্যবসায়ীরা এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন এবং দেশের অর্থনীতির জন্য বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। তাই ব্যবসায়ী মহল দাবি করছেন যে এলডিসি থেকে উত্তরণ তিন থেকে ছয় বছর পিছানো হোক। অপরদিকে সরকার বলছে, এলডিসি থেকে উত্তরণের যথেষ্ঠ তথ্য উপাত্ত রয়েছে এবং পিছানোর জন্য যথেষ্ঠ তথ্য উপাত্ত ঘাটতি রয়েছে। অতএব এলডিসি থেকে উত্তরণ আর পেছানো সম্ভব নয়। তাই সরকার ও ব্যবসায়ী মহলের মধ্যে এবং কিছু রাজনীতিবিদদের মধ্যেও এক ধরণের টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে। এবার প্রশ্ন হলো, এলডিসি থেকে উত্তরণ কতটা যৌক্তিক?

দেশের অর্থনীতি যেমন সরকার নিয়ন্ত্রণ করে, আবার এই অর্থনীতির উন্নয়নে অন্যতম ভূমিকা পালন করে ব্যবসায়ীরা। সুতরাং এই বিষয়টি নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা থেকে বেরিয়ে আসা উচিত। সরকারের উচিত ব্যবসায়ীদের স্বার্থ সংরক্ষণ করা এবং সরকার চেষ্টা করছে, সে বিষয়টি স্পষ্ট করা। অপরদিকে ব্যবসায়ীদেরও বুঝতে হবে, প্রক্রিয়াটি একদিনের নয়, দীর্ঘদিনের। যেখানে বলা হয়েছে, তিনটি শর্তের মধ্যে দুটি শর্ত পূরণ হলে এলডিসি থেকে উত্তরণ হবে। অথবা মাথাপিছু আয় ১২৩০ ডলার-এর দ্বিগুণ হলে এলডিসি থেকে উত্তরণ হবে। বাংলাদেশ তিনটি শর্তই পূরণ করেছে। অনেকে বলতে পারে, বিগত সরকার রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার জন্য এমনটা করেছে। যদি তাই হয়, তাহলে কিভাবে প্রমাণ করবেন, এটি রাজনৈতিক ফায়দা নেয়ার জন্য একটি পরিসংখ্যান মাত্র। তবুও উপাদানগুলোকে বিবেচনায় নেয়া হয়, তাহলে দেখা যাবে, তিনটি শর্ত পূরণ করেছে এবং মাথাপিছু আয় দ্বিগুণেরও অনেক বেশি। অথচ বিগত সরকারের সময় এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য ব্যবসায়ী মহল বাহবা দিয়েছে। এখন সবাই বলছে, আমরা এখনো প্রস্তুত নই। আবার মূল্যস্ফীতিকে যদি হিসেবে নেয়া যায় তাহলে দেখা যাবে, মূল্যস্ফীতির স্থির রয়েছে, অথচ ৫ আগস্ট অভ্যুত্থানের পর মূল্যস্ফীতির হার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার কথা ছিল। কারণ, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানিতে ১৯২৩ সালে বার্ষিক মূল্যস্ফীতির হার ছিল ২৯ হাজার ৫০০ শতাংশ। অর্থাৎ দৈনিক মূল্যস্ফীতির হার ছিল ২০ দশমিক ৯ শতাংশ। এ ধরনের প্রলয়ংকরী মূল্যস্ফীতির ফলেই জার্মানিতে হিটলারের নাৎসি সরকার ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ১৯৯০ সালে পেরুতে বার্ষিক মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৭ হাজার ৪৮৫ শতাংশ। আবার ফরাসি বিপ্লবে বাস্তিল দূর্গ আঘাতের মাধ্যমে যে বিপ্লব সংগঠিত হয়েছিল, তার পিছনেও ছিল ব্যাপক মূল্যস্ফীতি। আমাদের দেশে এমতাবস্থায় মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি না পেয়ে নিয়ন্ত্রণ চলে এসেছে বলা যায়। সুতরাং এলডিসি থেকে উত্তরণ পেছানো আদৌ কতটা সম্ভব হবে?
রাজনীতিবীদসহ অনেকে বলেছেন, বর্তমান সরকার যেহেতু গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার নয়, তাই এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য সিদ্ধান্তটি তাদের গ্রহণ করা সমীচীন হবে না। বিষয়টিও ভাববার, কারণ এলডিসি থেকে উত্তরণের চেষ্টা শুরু হয়েছে ১৯৭৫ সাল থেকে। যখন বাংলাদেশ এলডিসির অন্তর্ভুক্ত হয়। চেষ্টা সফল হতে শুরু করে ২০১৮ সালে, কারণ এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য সর্বপ্রথম নির্বাচিত হয় এই সালে। ওই বছরই বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য তিনটি শর্ত পূরণ করে। তিন বছর পর ২০২১ সালে পুনরায় বাংলাদেশের মানদ- নিয়ে পূর্ণ মূল্যায়ন হয়। শেখানেও বাংলাদেশ তিনটি শর্ত ভালোভাবে পূরণ করে এবং ওই বছরই চূড়ান্ত সুপারিশ পায় যে, ২০২৪ সালে এলডিসি থেকে বেরিয়ে যাবে বাংলাদেশ। কিন্তু করোনা মহামারীর কারণে দু’বছর সময় পিছিয়ে দিয়ে ২০২৬ সাল নির্ধারণ করা হয়। সুতরাং ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণ হবে এটি নির্ধারণ বর্তমান সরকার করেনি। তারা শুধু হাল ধরেছে। তাই বলা যায়, এলডিসি থেকে উত্তরণ এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।

তবে একটি বিষয় বিবেচ্য হতে পারে তা হচ্ছে, ব্যবসায়ীদের স্বার্থ সংরক্ষণ বা দেশের স্বার্থ সংরক্ষণ। করোনা মহামারির জন্য দুই বছর পেছানো সম্ভব হয়েছে। ইউক্রেন রাশিয়ার যুদ্ধ আন্তর্জাতিক বিষয়। সে সময় বিশ্বের অর্থনীতি টালমাটাল ছিল এবং মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়। বাংলাদেশ তা সামলে উঠতে পারেনি। মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কের উপরে চলে যায় এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তলানিতে গিয়ে ঠেকে। ব্যাংক খাত ধ্বংসসহ অর্থনীতি খাদের কিনারায় চলে যায়। ২০২৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাল্টা শুল্ক আরোপ করে যা সারা বিশ্বে প্রভাব পড়ে। এসব যুক্তি তুলে ধরে কমপক্ষে দুই থেকে তিন বছর যদি পিছানো যায়, তাহলে দেশে অর্থনীতি তথা ব্যবসায়ীরা একটু হলেও স্বস্তি পাবে। তাদের এক ধরনের আত্মবিশ্বাস তৈরি হবে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য মঙ্গলজনক। সময় পিছানো সম্ভব হোক আর না হোক, দেশের স্বার্থে চেষ্টা করে দেখা যেতেই পারে।

তবে ব্যবসায়ীদের মনে রাখতে হবে, এবং ধৈর্য্যরে সাথে এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে। সরকার যদি এলডিসি থেকে উত্তরণে সময় পিছাতে না পারে, তবে এটিকে নিয়তি ধরে সামনের দিকে অগ্রসর হতে হবে। কারণ, কিছু দেশ থেকে কিছু পণ্যের সময় পাওয়া যাচ্ছে। যেমন গত ২৩ এপ্রিল অনুষ্ঠিত ‘স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ: প্রস্তুতি ও বাস্তবতা’ শীর্ষক এক বৈঠকে চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের গবেষণাপ্রধান ইশতিয়াক বারী বলেছেন, বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশে থেকে উত্তরণের তিনটি শর্তই পূরণ করেছে। ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর থেকে বাংলাদেশ এ তালিকা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কথা। কিছু দেশ ও অঞ্চলে বাংলাদেশের বাণিজ্যে শুল্কছাড় সুবিধা ২০২৯ সাল পর্যন্ত থাকবে। আর ওষুধ উৎপাদনে মেধাস্বত্বে ছাড় সুবিধা থাকবে ২০৩৩ সাল পর্যন্ত।

এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য কিছু লোক কৃতিত্ব নেওয়ার চেষ্টায় আছে, আবার কিছু লোক কৃতিত্ব নেয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। মনে রাখতে হবে, এলডিসি থেকে উত্তরণ একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার অংশ মাত্র। এখানে বিগত সরকার, বর্তমান সরকার এবং আগামীতে যারা ক্ষমতায় আসবেন তাদের কারোই কৃতিত্ব নেয়া সমীচীন হবে বলে মনে হয় না। যে প্রক্রিয়াটি ২০১৮ সালের শুরু হয়ে শেষ হবে ২০২৬ সালে। এতে জাতিসংঘের সিডিপি বিষয়টা নিয়ে সার্বিকভাবে মূল্যায়ন করছে। প্রতিবেদন তৈরি করছে সরকার। সুতরাং কৃতিত্ব নেয়ার থাকলে তা বাংলাদেশের জনগণের কৃতিত্ব। সরকারকে আরো একটু দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন এ বিষয়টি নিয়ে, সরকারকে নিশ্চিত করা প্রয়োজন বিনিয়োগ পরিবেশ, সমুদ্র বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা, দেশের অভ্যন্তরে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোকে আরো আধুনিকায়ন করা, দক্ষ মানব সম্পদ তৈরি করা, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং রপ্তানিকারক ও ব্যবসায়ীদের শতভাগ নিশ্চয়তা প্রদান করা। সরকারের উচিৎ, ব্যবসায়ীদের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বস্ত সম্পর্ক ও সৌহার্দ্য স্থাপন করা। তবেই সফল হবে দেশ। ব্যবসায়ীরা এলডিসি হতে উত্তরণের ফলে যে সুবিধা বঞ্চিত হবে, তা বহুলাংশে পুষিয়ে যাবে। তারপরেও উত্তরণ পিছানো যাক আর না যাক, অন্ততপক্ষে শতভাগ চেষ্টা সরকারের থাকা উচিত।

লেখক: ব্যাংকার ও কলামিস্ট।
aktarrofikul@gmail.com



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews