মানুষের আত্মাকে ধ্বংস করে দেওয়ার অন্যতম ভয়াবহ ব্যাধি হলো হিংসা। এটি এমন একটি মানসিক রোগ, যা মানুষের অন্তরকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে দেয় এবং তার চিন্তা, চরিত্র ও আচরণকে বিকৃত করে ফেলে। হিংসুক ব্যক্তি কখনো প্রকৃত সুখ ও শান্তি লাভ করতে পারে না। অন্যের সুখে সে কষ্ট পায়, অন্যের সফলতায় তার অন্তর জ্বলে ওঠে। ফলে তার হৃদয়ে জন্ম নেয় বিদ্বেষ, শত্রুতা, অহংকার ও প্রতিহিংসা। এ কারণেই ইসলামে হিংসাকে অত্যন্ত নিন্দনীয় ও ধ্বংসাত্মক গুনাহ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। হজরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন ‘তোমরা পরস্পরে বিদ্বেষ পোষণ কর না, হিংসা কর না, ষড়যন্ত্র কর না এবং সম্পর্ক ছিন্ন কর না। তোমরা আল্লাহর বান্দা হিসেবে ভাই ভাই হয়ে যাও। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬০৭৬; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৫৯)।’ এই হাদিস মানবসমাজে শান্তি, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠার এক অনন্য দিকনির্দেশনা। কারণ হিংসা শুধু একজন ব্যক্তির অন্তরকেই কলুষিত করে না, বরং পরিবার, সমাজ ও জাতির মধ্যেও বিভেদ সৃষ্টি করে। হিংসা থেকেই জন্ম নেয় অপবাদ, কুৎসা, ষড়যন্ত্র ও পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ। একজন হিংসুক ব্যক্তি সর্বদা অন্যকে নিচে নামানোর চিন্তায় ব্যস্ত থাকে। সে চায় অন্যের সম্মান, সাফল্য ও সুখ ধ্বংস হয়ে যাক। অথচ এ আগুনে সবচেয়ে বেশি পুড়ে সে নিজেই। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা হিংসুকের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করতেও শিখিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, ‘হিংসুকের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় প্রার্থনা কর, যখন সে হিংসা করে (সুরা ফালাক : ৫)।’ ইসলামের দৃষ্টিতে প্রকৃত মুমিন সে-ই, যার অন্তর পরিচ্ছন্ন, উদার ও বিদ্বেষমুক্ত। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য তা-ই ভালোবাসবে, যা সে নিজের জন্য ভালোবাসে (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৪৫)।’ অন্যের কল্যাণ কামনা করা, মানুষের সুখে আনন্দিত হওয়া এবং পারস্পরিক ভালোবাসা বৃদ্ধি করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। পক্ষান্তরে হিংসা মানুষের নেক আমলকে ধ্বংস করে দেয়। এ প্রসঙ্গে রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘হিংসা থেকে বেঁচে থাক। কেননা হিংসা নেক আমলকে এমনভাবে খেয়ে ফেলে, যেমন আগুন কাঠকে পুড়িয়ে দেয় (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯০৩)।’ হিংসুক ব্যক্তি বাইরে হাসিমুখে চলাফেরা করলেও তার অন্তরে থাকে এক গভীর অশান্তি। সে সর্বদা দুশ্চিন্তা, সন্দেহ ও মানসিক যন্ত্রণায় ভোগে। তার চেহারায় ফুটে ওঠে বিষণ্নতা ও বিরক্তির ছাপ। পক্ষান্তরে যার অন্তর হিংসামুক্ত, সে থাকে প্রশান্ত ও সুখী। মানুষের প্রতি তার আচরণ হয় কোমল, সুন্দর ও আন্তরিক। কারণ অন্তরের পবিত্রতাই মানুষের প্রকৃত সৌন্দর্য। ইতিহাস সাক্ষী, হিংসা মানুষকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে গেছে। ইবলিস আদম (আ.)-এর মর্যাদা সহ্য করতে না পেরে হিংসায় জ্বলেছিল। সেই হিংসাই তাকে আল্লাহর রহমত থেকে বিতাড়িত করেছে। একইভাবে কাবিল হিংসার বশবর্তী হয়ে তার ভাই হাবিলকে হত্যা করেছিল। অর্থাৎ মানব ইতিহাসের প্রথম পাপ ও প্রথম হত্যার পেছনেও ছিল হিংসা। এ ঘটনাগুলো আমাদের জন্য বড় শিক্ষা ও সতর্কবার্তা। বর্তমান সমাজেও হিংসা মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক নষ্ট করছে। সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও পারিবারিক জীবনে বিভেদ ও অশান্তির অন্যতম কারণ হলো হিংসা ও বিদ্বেষ। তাই আমাদের উচিত অন্তরকে হিংসা, অহংকার ও বিদ্বেষ থেকে পবিত্র রাখা। অন্যের সুখে আনন্দিত হওয়া, মানুষের কল্যাণ কামনা করা এবং আল্লাহর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্ট থাকাই একজন প্রকৃত মুমিনের পরিচয়। আল্লাহতায়ালা মুমিনদের অন্তরের পবিত্রতা ও বিদ্বেষমুক্ত জীবনের শিক্ষা দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, ‘হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদের এবং আমাদের সেইসব ভাইকে ক্ষমা করুন, যারা আমাদের আগে ইমান এনেছে। আর মুমিনদের প্রতি আমাদের অন্তরে কোনো বিদ্বেষ রাখবেন না (সুরা হাশর : ১০)।’ তাই একজন সচেতন মুসলমানের দায়িত্ব হলো নিজের অন্তরকে হিংসা, বিদ্বেষ ও অহংকার থেকে পরিশুদ্ধ রাখা। মানুষের প্রতি ভালোবাসা, সহমর্মিতা, ক্ষমাশীলতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে তোলাই ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা। কারণ ইসলাম বিভেদ নয়, বরং মানবতার বন্ধনকে সুদৃঢ় করতে এসেছে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে হিংসা ও বিদ্বেষ থেকে হেফাজত করুন এবং পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ দান করুন। আমিন।
♦ লেখক : পরিচালক, চরপাথালিয়া সালমান ফারসি (রা.) মাদ্রাসা, মুন্সিগঞ্জ