চারদিকেই নদী। মাঝখানে ছোট্ট এক লোকালয়। গুয়াগাছিয়া। মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার দুর্গম এক জনপদ। কিন্তু এর কয়েক হাজার বাসিন্দা স্থানীয় নৌ-ডাকাত এবং সন্ত্রাসীদের হাতে রীতিমতো জিম্মি। ডাকাত দলের সদস্যরা প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া দেয়। প্রচার করা হয় ফেসবুক লাইভে। স্থানীয়দের ধরে এনে নির্যাতনের পর ভিডিও আপলোড করা হয় ডাকাতদের ফেসবুক আইডি ও ইউটিউব চ্যানেলে। চিহ্নিত এসব সন্ত্রাসী ও ডাকাতদের কেউ মাঝেমধ্যে ধরা পড়লেও রহস্যজনক কারণে দ্রুত ছাড়াও পেয়ে যায়। শুধু তাই নয়, জামিনে মুক্তি পেলে তাদের রীতিমতো ব্যান্ড বাজিয়ে এলাকায় সংবর্ধনা দেওয়া হয়। এমনকি স্থানীয় গজারিয়া থানার কয়েকজন পুলিশ সদস্য উপস্থিত থেকে তাদের অভ্যর্থনা জানান।

বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি যুগান্তরের পক্ষ থেকে সরেজমিন অনুসন্ধান করা হয়। এক সপ্তাহ ধরে অনুসন্ধান চলাকালে ভুক্তভোগীদের অনেকের সঙ্গে প্রতিবেদকের কথা হয়। এ সময় সন্ত্রাসীদের কাছে জিম্মি এলাকাবাসী জানান, ‘ভাই আমরা চট্টগ্রামের আরেক জঙ্গল সলিমপুরে বসবাস করছি। কিন্তু আমাদের দেখার কেউ নেই।’ তারা চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও ডাকাতদের হাত থেকে বাঁচতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

স্থানীয় ভুক্তভোগীরা জানান, ডাকাতদের এমন অপতৎপরতা পুলিশের অজানা নয়। এ নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে একাধিকবার লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। মামলা করা হয়েছে থানায়। কিন্তু তেমন কোনো লাভ হয়নি। খোদ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও যেন ডাকাত দলের দৌরাত্ম্যের কাছে অসহায়। খুনের মতো বড় ধরনের অপরাধ ঘটলে সাময়িক তোড়জোড় শুরু হয়। ধরা পড়ে দু-একজন। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যে ফিরে আসে সেই আতঙ্ক। কারণ আসামিদের জেলখানায় আটকে রাখা সম্ভব হয় না।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী-গুয়াগাছিয়া ঘিরে বর্তমানে দুটি ডাকাত দল সক্রিয়। এর একটি নয়ন, পিয়াস ও রিপন বাহিনী এবং অপরটির নেতৃত্ব দেয় লালু, সৈকত ও জয় বাহিনী। উভয় দলেরই সদস্য সংখ্যা শতাধিক। বাহিনীপ্রধান ছাড়াও শীর্ষ ক্যাডারদের একেকজনের বিরুদ্ধে মামলা আছে গড়ে দুই ডজনেরও বেশি। শীর্ষ ডাকাতদের কয়েকজন একাধিকবার পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে কারাভোগও করেছে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে তারা দ্রুত ছাড়া পেয়ে যায়।

স্থানীয় গজারিয়া থানার রেকর্ড ঘেঁটে দেখা যায়, গুয়াগাছিয়ায় গত দেড় বছরে একাধিক নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে চাঞ্চল্যকর রহমান দেওয়ান, রাজনৈতিক কর্মী বাবলা, মান্নান, প্রবাসী শ্রমিক হৃদয় এবং জয় হত্যাকাণ্ড অন্যতম। সর্বশেষ ১৯ এপ্রিল রাকিব নামের স্থানীয় এক যুবককে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়।

নিহত রাকিবের বোন আঁখি আকতার সোমবার যুগান্তরকে বলেন-ঘটনার দিন পিয়াস ডাকাতের সহযোগীরা রাকিবকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যায়। পরে বিভিন্ন জায়গায় দেনদরবার করে পিয়াসের আস্তানা থেকে গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাকিবকে বাঁচানো যায়নি।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে আঁখি বলেন, গুরুতর অবস্থায় রাকিবকে ট্রলারে তোলার পরপরই পিয়াস বাহিনীর লোকজন নৌকা আটকে দেয়। ট্রলার থেকে তেল ফেলে দেয় তারা। এ সময় তাদের হাত-পা ধরে কান্নাকাটি করি। একপর্যায়ে ডাকাতরা চলে গেলে হাসপাতালে নেওয়ার পথে রাকিবের মৃত্যু হয়। ঘটনার পর থানায় মামলা হলেও সেখানে আসামিদের নাম উল্লেখ করা সম্ভব হয়নি।

পুলিশ বলছে, স্থানীয় ডাকাত হিসাবে নয়ন, পিয়াস ও রিপন বাহিনীর শতাধিক সদস্যের নাম গজারিয়া থানার তালিকাভুক্ত। এদের মধ্যে শাহদাত, আকতার, আবুল কালাম, আকাশ, আহাদ, গুলজার খান, আকাশ খান, মাহমুদ আলী, রিয়াজ, নিরব, কাবিল, সাব্বির (কাবিল), ইমন, সিরাজ, ইউনুস, শ্রাবণ, কসাই সুমন, ভাগিনা রাকিব, নাদিম, সাজ্জাদ, জিসান, মনির, রাসেল ওরফে ফিশা রাসেল, ইব্রাহিম, নুরু ওরফে বাহাদুরপুর নুরু, মুন্না, মিটুল, হৃদয় ওরফে ব্যাগ হৃদয়, তৌহিদ ওরফে রাজ্জাক, সজিব, জসিম মেম্বার (স্পিডবোট জসিম) এবং রতনের নামে একাধিক মামলা রয়েছে।

এদের মধ্যে নয়ন বাহিনীর প্রধান নয়নের বিরুদ্ধে চাঁদপুর, কুমিল্লা, শরীয়তপুর ও মুন্সীগঞ্জ থানায় দায়েরকৃত মামলার সংখ্যা ৩৮টি। এছাড়া নয়নের সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসাবে পরিচিত পিয়াসের বিরুদ্ধে ৩৪টি এবং রিপনের বিরুদ্ধে ২৬টি মামলা রয়েছে। অপরদিকে লালু-সৈকত-জয় বাহিনীর সদস্য হিসাবে হিমেল, শিশির, লালুর স্ত্রী জেমি, সৌরভ, আশরাফ উদ্দিন, আলামিন, হাসান ওরফে ভেকু হাসান, জহিরুল, সাহিদ, গুলি খাওয়া আলামিন, জাকির ও জাহিদের নাম আছে পুলিশের খাতায়।

স্থানীয়রা বলছেন, মুন্সীগঞ্জ, চাঁদপুর ও দাউদকান্দি এলাকায় মেঘনার কয়েকটি শাখা নদীতে চলাচলকারী নৌযানে ডাকাতি নিয়মিত ঘটনা। এছাড়া স্থানীয় নদীতে অবৈধ ড্রেজিং, বালু ও মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে ডাকাত দলের সদস্যরা। বিশেষ করে মাদকের পাইকারি মোকাম হিসাবে পরিচিত দাউদকান্দির মোল্লাকান্দি এলাকায় রিপন বাহিনীর একক রাজত্ব।

এলাকাবাসী জানান, ডাকাত দলের সদস্যরা অনেকটা প্রকাশ্যে তাদের অপরাধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। নানা ধরনের অগ্নেয়াস্ত্র ও লাঠিসোঁটা নিয়ে সন্ত্রাসী মহড়ার ছবি এবং ভিডিও ডাকাতদের ইউটিউব চ্যানেলেও নিয়মিত ছাড়া হয়। ইঞ্জিনচালিত ট্রলার ও স্পিডবোটে সশস্ত্র মহড়া দেওয়ার সময় একাধিক ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে লাইভ প্রচার করা হয়।

‘পিয়াস ভাই’ নামের এক ফেসবুক আইডিতে ঢুকলে দেখা যায়, ডজনখানেক মামলার আসামি এবং স্থানীয় ডাকাত দলের সর্দার পিয়াস সদলবলে একটি ইঞ্জিনচালিত ট্রলারের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। পেছনে আরও কয়েকটি ট্রলারে শতাধিক সন্ত্রাসী তাকে ঘিরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছে। এ সময় সন্ত্রাসীদের হাতে দেশীয় ধারালো অস্ত্র ছাড়াও নানা ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র দেখা যায়।

স্থানীয়রা জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গুয়াগাছিয়ায় স্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। সাবেক স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জে. (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী ২২ আগস্ট ক্যাম্প উদ্বোধন করেন। এ সময় তিনি চিহ্নিত নৌ ডাকাত এবং তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারের নির্দেশ দেন। এর পরপরই পিয়াস বাহিনীর অন্যতম শীর্ষ ডাকাত রিপন, আবুল কালাম, আক্তার, ফিশা রাসেল ও নুরুসহ আরও বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়। তবে আসামিরা কিছুদিন পরই জামিনে মুক্তি পেয়ে রীতিমতো ব্যান্ড বাজিয়ে এলাকায় ফেরে। এ সময় খোদ স্থানীয় গজারিয়া থানার কয়েকজন পুলিশ সদস্য উপস্থিত থেকে তাদের অভ্যর্থনা জানান।

এলাকাবাসী বলছেন, গুয়াগাছিয়ায় পুলিশ ক্যাম্প স্থাপনের কারণে ডাকাত দলের সদস্যরা ক্ষুব্ধ হয়। ক্যাম্প ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য দায়িত্বপালনরত পুলিশ সদস্যদেরও হুমকি দেওয়া হয়। একপর্যায়ে ক্যাম্পের জন্য বাড়ি ভাড়া দেওয়া স্থানীয় ব্যবসায়ী হাজি আব্দুল কাইয়ুম দেওয়ানের ওপর হামলা করা হয়। ৬ ফেব্রুয়ারি তাকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে এবং গুলি করে গুরুতর আহত অবস্থায় ফেলে যায় দুর্বৃত্তরা।

ঘটনা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ভুক্তভোগী কাইয়ুম দেওয়ান সোমবার যুগান্তরকে বলেন, এলাকায় পুলিশের নিজস্ব কোনো ভবন বা স্থাপনা নেই।

ক্যাম্প হিসাবে ব্যবহারের জন্য আমার সদ্য নির্মিত একটি চারতলা বাড়ি ছেড়ে দিই। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ডাকাত দলের সর্দার সফিকের নেতৃত্বে একদল সন্ত্রাসী আমাকে কুপিয়ে জখম করে। ঘটনার পর মামলা হলেও আসামিদের কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি।

এলাকাবাসী বলছেন, স্থানীয় সন্ত্রাসী এবং ডাকাত দলের সদস্যদের প্রায় সবাই আগে নিজেদের আওয়ামী ক্যাডার বলে পরিচয় দিত। এমনকি এদের কয়েকজন পদধারী নেতা ছিল। তবে ২৪-এর আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অপরাধীদের অনেকেই ভোল পালটে নিজেদের বিএনপির নেতাকর্মী বলে পরিচয় দিচ্ছে।

গুয়াগাছিয়ায় নৌ ডাকাতদের দৌরাত্ম্য প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মুন্সীগঞ্জের পুলিশ সুপার (এসপি) মেনহাজুল আলম মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, সম্প্রতি রাকিব হত্যা মামলার একজন আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অন্যদেরও গ্রেফতারে অভিযান চলছে। তবে এলাকাটি ভৌগোলিকভাবে নদীবেষ্ঠিত হওয়ায় থানা পুলিশের পাশাপাশি নৌ-পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে হয়।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, থানা পুলিশের তৎপরতা ছাড়াও এলাকায় কোস্ট গার্ড এবং নৌ পুলিশের নিয়মিত টহল রয়েছে। ফলে পরিস্থিতি এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত। পুলিশের তালিকাভুক্ত ডাকাত রিপনকে কিছুদিন আগেও গ্রেফতার করা হয়েছিল। তবে সম্প্রতি সে জামিনে মুক্তি পেয়েছে বলে জানা গেছে।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews