পুলিশ ভ্যারিফিকেশন, শিক্ষাগত সনদ বা বিয়ের সনদ সত্যায়নের ক্ষেত্রে সরকারের ই-অ্যাপোস্টিল পদ্ধতি যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। আগে এসব সনদ সত্যায়নের জন্য বিভিন্ন দফতরে দৌড়ঝাঁপ করে প্রায় তিন মাস সময় প্রয়োজন হতো। এখন অনলাইনে ই-অ্যাপোস্টিল পদ্ধতিতে করা আবেদনের অন্তত ৫০ ভাগ পাঁচ দিনের মধ্যে সত্যায়ন করা হচ্ছে। আর এটা থেকে প্রবাসীসহ বিদেশে যেতে ইচ্ছুক বাংলাদেশী নাগরিকরা উপকৃত হচ্ছেন।
আগের পদ্ধতিতে সত্যায়নের জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দিনে ৩০০ থেকে ৪০০ সনদ জমা পড়ত। এখন ই-অ্যাপোস্টিল পদ্ধতিতে অনলাইনে দিনে ১০ থেকে ১২ হাজার আবেদন জমা পড়ছে। এর মূল কারণ হলো প্রবাসীরা বিদেশ থেকে এবং অন্যরা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে অনলাইনে সনদ সত্যায়নের জন্য আবেদন করতে পারছেন। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদফতর ও কার্যালয়ের সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ই-অ্যাপোস্টিল পদ্ধতিতে সনদ সত্যায়ন করছে।
কোনো কোনো দেশ পাসপোর্টের কপি, জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধনের সত্যায়ন চায়। বাংলাদেশে ই-অ্যাপোস্টিল পদ্ধতিতে এখনো ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদফতর, রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন ও বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। সরকার এগুলোকেও ই-অ্যাপোস্টিল পদ্ধতির আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে। এ ছাড়া আবেদনের সাথে যেসব সনদ জমা দেয়া হয়, তা নোটারি করার বাধ্যবাধকতা তুলে দেয়ার চিন্তাভাবনা চলছে।
তবে ই-অ্যাপোস্টিল পদ্ধতিতে অনেক সুবিধার পাশাপাশি সরকার চ্যালেঞ্জেরও সম্মুখীন হচ্ছে। কিছু দালাল চক্র ই-অ্যাপোস্টিলের ভুয়া ওয়েবসাইট তৈরি করে প্রতারণার মাধ্যমে সনদ সত্যায়নের নামে আবেদনকারীদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। এসব নকল সত্যায়নে থাকা কিউআর কোড স্ক্যান করে বিদেশে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলো ভুয়া হিসেবে প্রমাণ পাচ্ছে। এ ছাড়া অনেক প্রবাসী বিয়ে না করেই বাংলাদেশী মহিলাকে স্ত্রী হিসেবে দাবি করে বিদেশে নেয়ার জন্য ই-অ্যাপোস্টিল সনদ নেয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট মহিলা ভিসা নেয়ার জন্য দূতাবাসে আবেদন করলে সাক্ষাৎকারের সময় কনসুলার অফিসারের কৌশলী প্রশ্নের উত্তরে ধরা পড়ছেন। এতে বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমর্যাদা ক্ষুণœ হচ্ছে এবং সরকারের ইস্যু করা ই-অ্যাপোস্টিল সনদের যথার্থতাও প্রশ্নের মুখে পড়ছে। এই আস্থাহীনতার কারণে বাংলাদেশ সরকারের ইস্যু করা ই-অ্যাপোস্টিল সনদ ১৩টি দেশ গ্রহণ করছে না, যার মধ্যে ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস-সহ ইউরোপের ১১টি দেশ রয়েছে।
ই-অ্যাপোস্টিল উদ্যোগ বাংলাদেশ সরকারের একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, যা আন্তর্জাতিক ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন নথিপত্রের প্রমাণীকরণ ও বৈধকরণ প্রক্রিয়াকে সুবিন্যস্ত ও আধুনিক করার লক্ষ্যে চালু করা হয়েছে। ২০২৪ সালের ২৯ জুলাই বাংলাদেশ অ্যাপোস্টিল কনভেনশনে যোগ দেয়। এই ব্যবস্থাটি প্রশাসনিক বোঝা কমাতে এবং নিরাপত্তা বাড়াতে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
বাংলাদেশে অবস্থানরত ও প্রবাসী বাংলাদেশীরা এ প্লাটফর্মের মাধ্যমে ই-অ্যাপোস্টিল পরিষেবা নিতে পারেন। এই পদ্ধতিতে নিরাপদভাবে আবেদন জমা দেয়া ও বহু স্তরে যাচাইকরণের পর একটি কিউআর কোডসহ ই-অ্যাপোস্টিল সনদ দেয়া হয়। বিদেশী রাষ্ট্রগুলো এই কিউআর কোড যাচাই করে সনদের যথার্থতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারে।
অ্যাপোস্টিল বিদেশী সরকারি নথিপত্রের বৈধকরণের প্রয়োজনীয়তা বিলোপসংক্রান্ত ১৯৬১ সালের কনভেনশন, যা ব্যক্তিগত আন্তর্জাতিক আইনবিষয়ক হেগ সম্মেলন দ্বারা প্রণীত একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি। অ্যাপোস্টিল কনভেনশনের উদ্দেশ্য হলো সনদ যাচাইকরণ সরল করা, যার মাধ্যমে চুক্তিভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর কোনো একটিতে ইস্যুকৃত একটি নথিকে কনভেনশনের অন্যান্য চুক্তিভুক্ত রাষ্ট্রগুলোতে আইনি উদ্দেশ্যে প্রত্যয়িত করা যায়। এখন পর্যন্ত ১২৯টি রাষ্ট্র অ্যাপোস্টিল কনভেনশন অনুস্বাক্ষর করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, সুইডেন, চীন, রাশিয়া, ভারত ও পাকিস্তানসহ অ্যাপোস্টিল কনভেনশন অনুস্বাক্ষরী অধিকাংশ দেশের কাছে বাংলাদেশ সরকারের ইস্যু করা ই-অ্যাপোস্টিল সনদের গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। ব্যবস্থাটি কার্যকর ও নিরাপদ হলেও বাংলাদেশ সরকারের ইস্যু করা অ্যাপোস্টিল সনদ সম্পর্কে ১৩টি রাষ্ট্রের আপত্তি রয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিশেষ করে বিয়ের সনদের ক্ষেত্রে ই-অ্যাপোস্টিলের বৃহত্তর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের জন্য কাজ করছে।