স্বাধীনতার ৫১ বৎসরে দেশের নার্সিং সেক্টরে বিস্ময়কর সাফল্য অর্জিত হইয়াছে। বিগত ১৪ বছরের চিত্র সেই কথাই বলিতেছে। এই সময়কালে সমগ্র দেশে নিয়োগ লাভ করিয়াছেন ৪০ হাজার নার্স। দেশে বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি মিলাইয়া নার্সের সংখ্যা অন্তত ৭৭ হাজার। জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ এবং সুস্থ ও নীরোগ জাতি গঠনের লক্ষ্যে প্রক্রিয়াধীন রহিয়াছে আরো ৫ হাজার নার্সের নিয়োগ। জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছাইয়া দেওয়ার মানসে স্বাস্থ্য খাতের আগাইয়া যাইবার এই দৃশ্য আমাদেরকে আশাবাদী করিয়া তুলে।

চিকিৎসাকে বলা হয় মহান পেশা। ইহা সর্বজনস্বীকৃত। আবহমানকাল হইতে এই চিকিৎসা পেশার ‘মেরুদণ্ড’ হিসাবে বিবেচিত হইয়া আসিতেছে নার্সিং পেশা। সকল যুগের সকল কালেই মানবসেবার ব্রত লইয়া আবিভূ‌র্ত হইয়াছে নার্স। পীড়িতের শঘ্যাপাশে দাঁড়াইয়া প্রসারিত করিয়াছে মমতার হাত, সেবা-শুশ্রূষায় রোগীকে সুস্থ করিয়া তুলিতে রাখিয়াছে অনন্য ভূমিকা। শুধু করোনা মহামারির সময়ই নহে, প্রতিটি সংকটকালীন মুহূর্তে নার্সকে অবতীর্ণ হইতে দেখা গিয়াছে অগ্রসেনার ভূমিকায়। সংকটে-দুর্যোগে মানবতার বার্তাবাহী নার্সিং পেশা বাংলাদেশে আজ আপন আলোয় সমুজ্জ্বল। বহু পথ পাড়ি দিয়া এই পেশা আজ সম্প্রসারিত হইয়াছে, সম্মান অর্জন করিয়াছে।

উপরিউক্ত দৃশ্যপটের উলটা চিত্রও রহিয়াছে। দেড় লক্ষের কম আয়তনের ক্ষুদ্র এই বঙ্গে জনসংখ্যা বাড়িয়াছে জ্যামিতিক হারে। তাহার বিপরীতে চিকিৎসক, নার্স বাড়ানো যায় নাই। জনসংখ্যানুপাতে বৃদ্ধি করা যায় নাই নার্সের সংখ্যা। উপরন্তু এই খাতে অনিয়ম, অবহেলা, দুর্নীতির অভিযোগ উঠিয়াছে নিয়মিত বিরতিতে। সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য এই খাতে সকল সময়— এই অভিযোগ নূতন নহে। এই সমস্ত কারণে ঘটিয়াছে আন্দোলন-বিক্ষোভের ঘটনাও। এই সকল প্রেক্ষাপটের মধ্যেই নার্স সংকটের পরিসংখ্যান আলোচনা-সমালোচনার উদ্রেক ঘটাইয়া তোলে।

স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, এক জন চিকিৎসকের জন্য তিন জন নার্স এবং হাসপাতালের পাঁচ রোগী ও নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) প্রত্যেক শঘ্যা বা রোগীর জন্য এক জন করিয়া নার্স থাকিবার কথা; কিন্তু বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের সহিত এই মানদণ্ড মিলিতেছে না। বর্তমানে দেশে এক জন চিকিৎসকের জন্য তিন জনের জায়গায় নার্স রহিয়াছেন এক জনেরও কম, অর্থাৎ চিকিৎসক ও নার্সের অনুপাত ১:০.৭৪। সরকারি চিকিৎসক ও নার্সের ক্ষেত্রে অবশ্য এই ঘাটতি কিছুটা কম। চিকিৎসক ও নার্সের অনুপাত ১:১.৪২।

একইভাবে যেইখানে হাসপাতালের প্রতি পাঁচ রোগীর জন্য এক জন নার্স থাকিবার কথা, সেইখানে ১০০ রোগীর জন্য নার্স রহিয়াছেন সাকুল্যে ৫ থেকে ১০ জন। সেই অনুপাতে একইভাবে প্রত্যেক আইসিইউ বেডের জন্য যেইখানে থাকিবার কথা এক জন করিয়া নার্স, সেইখানে ২০ শঘ্যার একটি আইসিইউ ইউনিটের জন্য নার্স রহিয়াছে দুই থেকে তিন জন। মোটা দাগে উল্লেখ করিবার মতো আরেকটি বিষয়, নার্সের এইরূপ ব্যাপক ঘাটতি সত্ত্বেও দেশের বিভিন্ন জেলায় চিকিৎসক অনুপাতে নার্স বণ্টনে বিশৃঙ্খলা রহিয়াছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বিবেচনায় জেলাভিত্তিক কর্মরত নার্সের সংখ্যায় রহিয়াছে তারতম্য। এই অবস্থা নার্সিং পেশার সংকটকে প্রসারিত করিতেছে।

দেশের নার্সিং পেশা অগ্রসরমাণ, সন্দেহ নাই। তবে নার্স ঘাটতির শীর্ষে রহিয়াছি আমরা। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির মধ্যে নার্সের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান সবচাইতে নিচে। সংশ্লিষ্টদের এই বিষয়টি লইয়া গুরুত্ব সহকারে ভাবিতে হইবে। এই শতাব্দীর রোগব্যাধির প্রকোপ বিবেচনায় অবস্থার উত্তরণ ঘটাইতে কাজ করিতে হইবে। নার্সিং খাতে সঠিক ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি নার্সদের উচ্চশিক্ষা, ঝুঁকিভাতা, পদোন্নতি, কর্মস্থলে হয়রানির মতো বিষয়গুলি সমাধানে সময়ক্ষেপণ করা যাইবে না। যাহাদের লইয়া এত কথা বলা হইতেছে—সফেদ পোশাকে সেবাই যাহাদের পরম ধর্ম, অভিযোগের তির উঠিতে দেখা যায় তাহাদের বিরুদ্ধেও।

এই ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা নিশ্চিতের উপর জোর দিতে হইবে। ডাক্তার-নার্স পেশার সীমাবদ্ধতার কথা স্মরণে রাখিয়া সেবাগ্রহীতা হিসাবে নার্সদের প্রতি আমাদের সহানভূতিশীল হইতে হইবে। নার্সদেরও মাথায় রাখিতে হইবে—নার্সিং পেশা ত্যাগের, মহিমার। ইহার পাশাপাশি রোগী বা যাহাদেরকে তাহারা সেবা প্রদান করিয়া থাকেন তাহাদেরও নার্সদের প্রতি সহানুভূতির সহিত আচরণ করিতে হইবে।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews