প্রচলিত অর্থে সুগার বলতে চিনিকে বোঝালেও ডায়াবেটিসের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত বস্তুটির নাম হলো গ্লুকোজ। ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে সুগার বলতে গ্লুকোজকেই বোঝানো হয়।

অন্যদিকে, চিনি বা সুক্রোজ হলো গ্লুকোজ এবং ফ্রুকটোজের সমন্বয়ে গঠিত একটি ডাইস্যাকারাইড। খাওয়ার পর কার্বোহাইড্রেট বা শর্করাজাতীয় খাবার অন্ত্রে এনজাইমের উপস্থিতিতে ভেঙে গ্লুকোজে রূপান্তরিত হয় এবং বিশোষিত হয়ে রক্তে প্রবেশ করে।

গ্লুকোজ হলো শরীরের মূল শক্তির উৎস, যাকে দেহের জ্বালানি হিসাবে গণ্য করা যেতে পারে। ইনসুলিন হলো এক ধরনের হরমোন, যা প্যানক্রিয়াস থেকে উৎপন্ন হয় এবং রক্তে গ্লুকোজের স্বাভাবিক মাত্রা নিয়ন্ত্রণে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। শরীরে ইনসুলিনের অভাব হলে রক্তের সুগার নিয়ন্ত্রণে বিঘ্ন ঘটে এবং ডায়াবেটিস রোগ সৃষ্টির কারণ ঘটে।

মানবদেহ নিজ ক্ষমতা বলে রক্তে গ্লুকোজ এবং সেল বা কোষ কর্তৃক গ্লুকোজ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনমতো ইনসুলিন উৎপাদন করতে পারে। ইনসুলিনের কাজ হলো রক্তে নির্দিষ্ট পরিমাণ গ্লুকোজ রেখে বাড়তি সব গ্লুকোজকে গ্লাইকোজেনে রূপান্তরের মাধ্যমে লিভার ও বিভিন্ন মাংসপেশিতে মজুত রাখা। না খাওয়ার কারণে, উপোস করলে বা বেশি পরিশ্রমের জন্য রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ কমে গেলে গ্লাইকোজেন আবার গ্লুকোজে রূপান্তরিত হয়ে রক্তে জমা হয় এবং পরের সেলে প্রবেশ করে।

ইনসুলিন রাসায়নিক রূপান্তরের মাধ্যমে গ্লুকোজকে শরীরের সেল বা কোষে প্রবেশ করতে সাহায্য করে। ইনসুলিনের অভাবে শরীরের কোষ সুষ্ঠুভাবে গ্লুকোজের সদ্ব্যবহার করতে পারে না।

তাই অতিরিক্ত গ্লুকোজ প্রস্রাবের মাধ্যমে শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। এ অবস্থাকে আমরা বলে থাকি ডায়াবেটিস মেলাইটাস। তবে সুগার মেটাবলিজম এবং ইনসুলিনের কার্যপ্রণালি যেভাবে বর্ণনা করা হলো, তা তার চেয়ে অনেক বেশি সূক্ষ্ম ও জটিল।

ডায়াবেটিস মূলত দুই ধরনের। যেসব ক্ষেত্রে প্যানক্রিয়াস থেকে ইনসুলিন উৎপন্ন হয় না এবং ইনজেকশনের মাধ্যমে ইনসুলিন নিয়ে রক্তে সুগারের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয় তাকে টাইপ-১ ডায়াবেটিস বলা হয়।

এ ধরনের ডায়াবেটিসকে আগে বলা হতো জুভেনাইল অনসেট অথবা ইনসুলিননির্ভর ডায়াবেটিস। টাইপ-১ ডায়াবেটিস ছোট বাচ্চা বা কম বয়স্ক মানুষের মধ্যে বেশি দেখা যায়। তবে যে কোনো বয়সের মানুষের ক্ষেত্রে এ ধরনের ডায়াবেটিস হওয়া সম্ভব। টাইপ-২ ডায়াবেটিসকে আগে বলা হতো অ্যাডাল্ট অনসেট অথবা নন-ইনসুলিননির্ভর ডায়াবেটিস।

টাইপ-২ ডায়াবেটিসে প্যানক্রিয়াস পর্যাপ্ত পরিমাণ ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না অথবা শরীর ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের কারণে উৎপন্ন ইনসুলিন ঠিকমতো কাজে লাগাতে পারে না। এ ধরনের ডায়াবেটিস মূলত ৪০ বয়সোর্ধ্ব মানুষের ক্ষেত্রে এবং জেনেটিক কারণে বেশি হয়ে থাকে।

ডায়াবেটিসের প্রধান উপসর্গগুলোর মধ্যে রয়েছে-ঘন ঘন তেষ্টা লাগা, ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া, শরীরের ওজন কমে যাওয়া, বেশি ক্ষুধা লাগা, চোখে ঝাপসা দেখা, রোষ প্রবণতা, উগ্রতা, হাত-পায়ের অসাড়তা, ঘন ঘন চামড়া, মূত্রথলি ও দাঁতের মাড়ির সংক্রমণ, সময়মতো ক্ষত না সারা এবং চরম অবসাদগ্রস্ততা।

অনেক ক্ষেত্রে ডায়াবেটিসের কোনো উপসর্গ দেখা নাও দিতে পারে। কোনো উপসর্গ দেখা না দেওয়া ঘটে থাকে সাধারণত টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে। এক্ষেত্রে কোনো রোগী ডায়াবেটিসের কথা জানতে না পেরে মাস থেকে বছর পর্যন্ত জীবনযাপন করতে পারে। এ প্রকৃতির ডায়াবেটিস ক্রমধারায় এমনভাবে সৃষ্টি হয়, রোগী কোনো উপসর্গ টের পায় না বা উপলব্ধি করে না।

সব বয়সের সব ধরনের মানুষের ডায়াবেটিস হতে পারে। তবে বয়স যত বাড়ে, রোগের প্রকোপও তত বাড়ে। পূর্বপুরুষের ডায়াবেটিস থাকলে উত্তরসূরিদেরও ডায়াবেটিস হতে পারে বলে চিকিৎসাবিজ্ঞানে একটি কথা বলা হয়। তবে এসব ক্ষেত্রে অতিমাত্রায় সতর্ক হলে পরিস্থিতির অনেক উন্নতি সম্ভব।

স্থূলতা ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়। এছাড়া শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, উচ্চমাত্রার কোলেস্টেরল, উচ্চরক্তচাপ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়। ৪০ বয়সোর্ধ্ব মানুষের ক্ষেত্রে ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা বেশি হলেও কিশোরদের মধ্যে ইদানীং টাইপ-২ ডায়াবেটিস হওয়ার প্রবণতা বেড়ে চলেছে। গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হলে পরবর্তী জীবনে এ রোগের আরও অবনতি ঘটে। এ ডায়াবেটিসকে বলা হয় গ্যাস্টেশনাল ডায়াবেটিস।

ডায়াবেটিস হলে মানুষ সতর্ক হয়। সুস্থ থাকার জন্য মানুষ খাওয়াদাওয়া, নিয়মকানুন ও লাইফস্টাইলে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবর্তন নিয়ে আসে। এ কারণে ডায়াবেটিসের রোগীরা বেশ ভালো থাকে এবং সুস্থ জীবনযাপন করে। অন্য রোগীর মতো একজন ডায়াবেটিসের রোগীরও সকাল বা বিকালে হাঁটা একান্ত প্রয়োজন। হাঁটা হলো উত্তম ব্যায়ামগুলোর অন্যতম। তবে রোগী হলেই শুধু হাঁটতে হবে তার কোনো মানে নেই। সুস্থ মানুষকেও হাঁটা উচিত। সুস্থ শরীরের জন্য হাঁটা বা ব্যায়ামের কোনো বিকল্প নেই।

আমাদের মতো দেশে সাধারণত ডায়াবেটিস বা অন্য কোনো রোগ একটা না বাঁধালে কেউ পারতপক্ষে হাঁটতে যায় না। পার্ক বা ময়দানে নিয়মিত যারা হাঁটতে যায়, তাদের অধিকাংশই ইতোমধ্যে ডায়াবেটিস বা অন্য কোনো না কোনো রোগে আক্রান্ত হয়ে গেছেন বা রোগের পূর্বাভাস পেয়ে হাঁটা শুরু করেছেন। ওষুধ বা খাদ্য নিয়ন্ত্রণ ছাড়া শরীরের সুগার লেভেল নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য ব্যায়াম বা হাঁটার কোনো বিকল্প নেই।

আমি সবসময় জোর দিয়ে বলে থাকি-রোগের প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ অনেক শ্রেয়। রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ার আগ থেকেই যদি নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন এবং নিয়মিত ব্যায়াম করা হয়, তাহলে বহু রোগ থেকেই মানুষ পরিত্রাণ পেতে পারে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অজ্ঞতা, শরীরের প্রতি অনিয়ম ও অত্যাচারের কারণে সবার অজান্তে রোগ দেহে বাসা বাঁধে। রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ার পরও অনেকে রোগের কথা টের পায় না। আর যখন বুঝতে পারে, তখন আর সময় থাকে না।

ক্ষতি যা হওয়ার তা হয়ে যায়। এ অবস্থায় রোগ নিয়ন্ত্রণ জটিল হয়ে পড়ে। ডায়াবেটিস এমনি একটি জটিল ও মারাত্মক রোগ। পর্যাপ্ত হাঁটলে বা ব্যায়াম করলে শরীর ইনসুলিনের মাধ্যমে অব্যবহৃত গ্লুকোজকে অতি সহজে শক্তিতে পরিণত করতে পারে। ইনসুলিননির্ভর রোগীদের (টাইপ-১ ডায়াবেটিস) এবং কোনো কোনো টাইপ-২ ডায়াবেটিসের রোগীকে নিয়মিত ইনসুলিন নিতে হয়। বেশির ভাগ টাইপ-২ ডায়াবেটিসের রোগী ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের জন্য মুখে খাওয়ার ওষুধ গ্রহণ করেন। এসব ওষুধ শরীরে ইনসুলিন উৎপাদন বাড়িয়ে দেয় এবং ইনসুলিনকে যথাযথভাবে কাজ করতে সাহায্য করে। কোনো কোনো টাইপ-২ ডায়াবেটিসের রোগী কোনো ওষুধ গ্রহণ না করেই খাওয়া নিয়ন্ত্রণ, নিয়মকানুন মেনে চলা ও ব্যায়ামের মাধ্যমে পুরোপুরি সুস্থ জীবনযাপন করতে পারেন।

ডায়াবেটিসের রোগীদের জন্য খাবার নিয়ন্ত্রণ অতি জরুরি। যেহেতু ডায়াবেটিস মূলত সুগার সম্পর্কিত একটি রোগ, সেহেতু শরীরে সুগার নিয়ন্ত্রণ অত্যাবশ্যক। ডায়াবেটিসের রোগীদের বেশি কার্বোহাইড্রেট বা শর্করাজাতীয় খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। একজন পুষ্টিবিদ বা চিকিৎসক নির্ধারণ করে দেবেন, রোগী কোন খাবার কী পরিমাণে খাবেন। তবে সাধারণ কথা হলো-পরিশোধিত চিনি ও চিনিজাতীয় খাবার বেশি খাওয়া ঠিক নয়। চিনিসমৃদ্ধ কোমল পানীয়, আইসক্রিম, ক্যান্ডি, চকলেট বা যে কোনো খাবার, যা শরীরে সুগারের মাত্রা বিপজ্জনকভাবে বাড়িয়ে দেয়, তা খাওয়া ঠিক হবে না।

আমাদের খাবার কম করে হলেও অর্ধেক হতে হবে জৈব শাকসবজি ও পরিমিত ফলমূল। বাকি খাদ্যের মধ্যে থাকতে হবে অর্গানিক ভুসিসমৃদ্ধ শস্য, বাদাম, বিভিন্ন ধরনের শস্যের বিচি ও তেল। সালাদ হতে হবে খাবারের একটি অপরিহার্য অংশ। খাসি ও গরুর গোশত কম খেতে হবে। পারলে একদম বাদ দেওয়া যেতে পারে। প্রোটিনের উৎস হিসাবে মাছ ও মুরগির গোশত উৎকৃষ্ট, তাও পরিমিত।

ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড শরীরের জন্য বিশেষ উপকারী। কাঁচা লবণ খাওয়া ছেড়ে দেওয়া দরকার। অর্গানিক ডিম, দুধ ও দই স্বাস্থ্যকর খাবার। ভিটামিন সি, বিটা কেরোটিন, ভিটামিন ই, সেলেনিয়াম এবং পলিফেনোল শরীরের জন্য বিশেষ উপকারী অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট। এসব অ্যান্টি-অক্সিডেন্টের উৎকৃষ্ট উৎস ফলমূল, শাকসবজি ও সবুজ চা। আপনার খাবারের তালিকা থেকে জাঙ্কফুডের আধিক্য কমিয়ে আনুন। এসব খাবারে রয়েছে প্রচুর লবণ, চিনি, মনোসোডিয়াম গ্লুটামেটও টাট্টাজিনজাতীয় বিতর্কিত খাদ্যোপকরণ। অন্য দরকারি খাবারের মতো জাঙ্কফুডে প্রোটিন, ভিটামিন, খনিজ পদার্থ ও আঁশ কম থাকে। ম্যাকডোনাল্ড, হ্যামবার্গার, ফ্রাইড চিকেন, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই জাঙ্কফুডের কিছু উদাহরণ। জাঙ্কফুডে প্রচুর চিনি ও চর্বি থাকে বলে এসব খাবার খেলে ওজন বেড়ে যাওয়াসহ ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, হৃদরোগ, স্ট্রোক, আর্থ্রাইটিস ও ক্যানসারের মতো বহু জটিল মারণঘাতী রোগের উৎপত্তি হতে পারে।

শরীরের ওজন ঠিক রাখুন। শরীরের মাত্রাতিরিক্ত ওজনের সঙ্গে ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আপনি যদি স্থূলকায় হয়ে থাকেন, কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে শরীরের ওজন কমিয়ে আনুন। বাড়তি ওজন কমিয়ে আনার সঙ্গে সঙ্গে ডায়াবেটিস ও উচ্চরক্তচাপ স্বাভাবিক মাত্রায় নিয়ে আসা বাঞ্ছনীয়। শরীরের ওজন কমানোর জন্য নিয়মিত ব্যায়াম করুন।

নিয়মিত ব্যায়ামের মাধ্যমে ডায়াবেটিস, বিভিন্ন হৃদরোগ এবং স্ট্রোকের মতো জটিল ও মারাত্মক রোগের প্রতিরোধ সহজ হয়। আগেভাগে নিয়মিতভাবে পর্যাপ্ত ব্যায়াম করলে ডায়াবেটিসের সম্ভাবনা অনেক হ্রাস পায়। তাই বলেছিলাম, রোগী হিসাবে নয়, একজন সুস্থ মানুষ হিসাবে নিয়মিত ব্যায়ামের অভ্যাস গড়ে তুলুন।

এবার হাঁটার মজা বা আনন্দ সম্পর্কে একটু বলি। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, রমনা পার্ক, সংসদভবন চত্বর বা অন্য খোলামেলা জায়গায় গেলে দেখা যায়, বহু মানুষ সকাল-বিকাল হাঁটছেন। কেউ জোরে, কেউ বা ধীরে, কেউ একা আবার কেউ দলবেঁধে। জোয়ান, মাঝ বয়সি, বৃদ্ধ-সবাই হাঁটছেন। মা-বোনরাও পিছে পড়ে নেই। হাঁটার জন্য খুব বেশি কিছুর দরকার হয় না।

এক জোড়া ভালো জুতা, আরামদায়ক পোশাক আর একটি উল্লসিত মন। উল্লসিত ও বৈচিত্র্যপূর্ণ মন না থাকলে হাঁটা গতানুগতিক ও মনোটোনাস হয়ে পড়বে। আনন্দঘন হবে না। খুব ভোরে উঠে, অফিস-আদালত সেরে বা ঘরকন্না শেষ করে হাঁটতে বেরোবার জন্য প্রবল ইচ্ছাশক্তি থাকতে হয়। তবে হাঁটতে শুরু করলে অল্পদিনের মধ্যে হাঁটা অভ্যাসে পরিণত হয়।

পার্ক বা ময়দানে হাঁটার অভিজ্ঞতা বৈচিত্র্যপূর্ণ। এসব স্থানে হাঁটতে গেলে বিচিত্র রকমের লোকজনের সান্নিধ্যে আসা যায়, বিচিত্র রকম কথাবার্তা শোনা যায়, হাসি-ঠাট্টা-রং-তামাশায় অংশ নেওয়া যায়। কথাবার্তায় রয়েছে নতুনত্ব। নিয়মনীতির বালাই নেই। যে কোনো বিষয়ই আলোচনার বিষয়বস্তু হতে পারে। রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, ফুটবল, ক্রিকেট, লেখাপড়া, শিল্পসংস্কৃতি, পারিবারিক জীবন-কোনো কিছুই আলোচনা থেকে বাদ পড়ে না। অসুস্থতায় ভুগছেন যারা, তারা প্রত্যেকে নিজ নিজ রোগের ওপর এক একজন সুপণ্ডিত। তাদের সঙ্গে হাঁটলে প্রচুর শেখার অবকাশ রয়েছে। যারা হাঁটেন, তাদের কেউ সরকারি চাকুরে, কেউবা শিক্ষক, কেউ ব্যবসায়ী, কেউ উকিল-ব্যারিস্টার আর কেউ বা চিকিৎসক। মজার ব্যাপার চিকিৎসকরাও রোগে ভোগেন, তারাও হাঁটেন। পেশা ও শ্রেণিগত দিক থেকে কোনো ইউনিফর্মিটি না থাকলেও মনমানসিকতার দিক থেকে এখানে সবাই সমান, কোনো বৈষম্য নেই।

এখানে সবাই একই পথের পথিক, সবাই বন্ধু। একদিনের নয়, প্রতিদিনের বন্ধু। একদিন কেউ হাঁটতে না এলে সবাই উৎসুক থাকেন তার না আসার কারণ জানার জন্য। সম্ভাব্য অসুখ-বিসুখ বা কোনো ধরনের অমঙ্গলের ভয়ে সবাই উদ্বিগ্ন থাকে। হাঁটায় শুধু শারীরিক নয়, মানসিক ব্যায়াম ও হয়। উন্মুক্ত প্রকৃতিতে হাঁটার বড় উপকার মানসিক প্রশান্তি বা মানসিক চাপ থেকে অবমুক্তি। সারা দিন অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য বা কঠোর পরিশ্রমের পর প্রচণ্ড মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তার কারণে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। এ মানসিক চাপ এবং বিষণ্নতা থেকে অব্যাহতি লাভের উদ্দেশ্যে অনেকেই ট্রাংকুলাইজার বা সিডেটিভ জাতীয় ওষুধ সেবন করে থাকে। এটি নিঃসন্দেহে একটি বিপজ্জনক ও ক্ষতিকর প্র্যাকটিস। প্রকৃত অর্থে ওষুধ দিয়ে বিষণ্নতা বা মানসিক অশান্তি থেকে অবমুক্তি সম্ভব নয়। হাসি-ঠাট্টা, আনন্দঘন খোলামেলা কথাবার্তা আদান-প্রদানের মাধ্যমে উন্মুক্ত ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে কিছুক্ষণ হাঁটলে মানসিক চাপ বা দুশ্চিন্তা থেকে অনেকটা অবমুক্তি সম্ভব। খোলামন নিয়ে ব্যায়াম বা হাঁটার মাধ্যমে মানসিক চাপ থেকে অব্যাহতি পাওয়ার ব্যাপারটি যে কেউ পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। হাঁটার বহুবিধ উপকার রয়েছে। নিয়মিত হাঁটলে দেহ-মন সচল থাকে, দেহের সেলুলার কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পায়, রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধির ফলে সেলে অক্সিজেন সরবরাহ বৃদ্ধি পায়, রক্তে লিপিডের পরিমাণ হ্রাস পায়, রক্তচাপ স্বাভাবিক থাকে, খাওয়ার রুচি বাড়ে, রাতে ভালো ঘুম হয়, পরিপাক ও শ্বাস-প্রশ্বাস প্রক্রিয়া উজ্জীবিত হয়। ব্যায়ামের ফলে শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। ব্যায়াম না করলে শরীরের সেলগুলো নির্জীব হয়ে পড়ে বলে কর্মক্ষমতা ও দক্ষতা হ্রাস পায়। তাই আর দেরি নয়, আসুন আজই হাঁটতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে নিই।

তবে হাঁটার আগে ঠিক করা দরকার, হাঁটার গতি ও পরিমাণ কেমন হবে। শরীরের অবস্থা বুঝে গতি ও পরিমাণ ঠিক করা উচিত। হৃদরোগে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে বেশি জোরে বা অতি বেশি মাত্রায় হাঁটার ব্যাপারে বিধিনিষেধ রয়েছে। ডায়াবেটিক রোগীদের ইনসুলিন গ্রহণ করে বেশিক্ষণ ধরে দ্রুতগতিতে হাঁটালে বিপদ হতে পারে। এক্ষেত্রে সুগার লেভেল মারাত্মক হ্রাস পাওয়ার কারণে হাইপোগ্লাইসেমিক শক হওয়ার মতো বিপদ ঘটতে পারে।

পরিশেষে একটি কথা বলি। মানুষ ইচ্ছা করলে ডায়াবেটিসসহ অনেক মারণঘাতী রোগ প্রতিরোধ করতে পারে। এজন্য দরকার সুস্থ অবস্থা থেকেই সতর্ক জীবনযাপন করা অর্থাৎ পরিমিত সুষম খাবার খাওয়া, নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপন করা এবং নিয়মিত পর্যাপ্ত ব্যায়াম করাসহ দুশ্চিন্তামুক্ত জীবনযাপন করা। শরীরের ওজন ঠিক রেখে প্রতিদিন ৩০ মিনিট হাঁটলে আপনার শরীর অনেক ভালো থাকবে।

মুনীরউদ্দিন আহমদ : অধ্যাপক, ফার্মেসি বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

drmuniruddin@gmail.com



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews