নারীপাচার আমাদের সমাজে একটি বড় সমস্যা। নানা কারণে নারীপাচারের যে ঘটনা ঘটছে তা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি। সামাজিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নারীপাচার রোধ করা যেমন সম্ভব, তেমনি সমাজের পুরনো সংগঠন হিসেবে পরিবারের ভূমিকা অগ্রগণ্য। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া আমরা পরিবারেই বড় হয়েছি। পরিবারে অনেক সময় অনেক সমস্যা সৃষ্টি হয়। আবার তা মোকাবেলায় পরিবারই মুখ্য ভূমিকা পালন করতে পারে। আমাদের ঘুরেফিরে পরিবারেই ফিরে আসতে হয়। কাজেই পরিবারকে ভিন্নভাবে দেখে পরিবারের বিকল্প পরিবর্তিত সমাজব্যবস্থার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের হয়তো খুঁজতে হচ্ছে। কিন্তু পরিবারের বিকল্প পরিবারই। শিশু সদন, ছোটমণি নিবাস কিংবা বয়স্কনিবাস আমাদের সামাজিক পরিবর্তনের ফল। ধারণা করি, এর বিস্তৃতি ও চাহিদা কমবে না। তবে পরিবারের প্রতি এর দায়িত্বশীলতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে পারলে আমরা সহনশীল সমাজ তৈরিতে অবদান রাখতে পারব। আমাদের সমাজে নারীপাচারের মতো সমস্যার মূলে পরিবারের দায়িত্বশীলতার অভাবকে বড় মনে করা হয়। নারীপাচারের প্রক্রিয়া ও ধরনের মধ্যে অধুনা পরিবর্তন সূচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে গতানুগতিক কারণগুলোর বাইরে ভিন্নভাবে নারীপাচার দেখার সুযোগ রয়েছে। নারী কিংবা কিশোরীদের প্রলোভন ও প্রলুব্ধ করাকে বড় কারণ হিসেবে দেখলে এর মধ্যেও পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। শুধু দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়েই নয়, আকৃষ্ট ও চাকচিক্যের মোহে নিজের মধ্যে লুকিয়ে থাকা সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করার প্রত্যয়ে এবং বিলাসী জীবনের আকাঙ্ক্ষায় অনেক কিশোরী ও নারী পাচারের শিকার হচ্ছে। এক শ্রেণির দালাল ওত পেতে থাকে কাকে কখন কিভাবে ঘায়েল করা যায়। বয়সের সঙ্গে যৌক্তিক জ্ঞানের সম্পর্ক রয়েছে। কিশোরীকে খুব সহজে বোঝানো যায়। কেননা তার মধ্যে যুক্তির চেয়ে মোহ বেশি কাজ করে। আর পরিবার থেকে পর্যাপ্ত সহায়তা না পাওয়া কিংবা অবহেলায় থাকা কিশোরী ও নারীকে বশে আনা আরো অনেক সহজ।

লিঙ্গবৈষম্য সমাজে একেবারে ছোটকাল থেকেই শুরু হয়। এককথায় মেয়েসন্তানের প্রতি অবহেলা জন্মের পর থেকেই। নিম্নবিত্ত, এমনকি উচ্চবিত্ত পরিবারেও কখনো কখনো মেয়েসন্তান বৈষম্যের শিকার। মেয়েসন্তান জন্ম যেন কোনোভাবেই আমাদের কাছে আশীর্বাদ নয়। লৈঙ্গিক ভিন্নতার জন্য সামাজিক বৈষম্য প্রাধান্য পায়। মনে করা হয় লৈঙ্গিকতার জন্য সব কিছু আলাদা। এমনকি ছেলেসন্তানের খাওয়াদাওয়া ও লেখাপড়ার প্রতি যেভাবে জোর দেওয়া হয়, মেয়েসন্তানের প্রতি তেমন নয়। ফলে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বড় হচ্ছে আমাদের মেয়েসন্তানরা। মেয়েশিশু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারে লৈঙ্গিক ভিন্নতার কারণে সে বৈষম্যের শিকার। পরিবার ও সমাজ থেকে বুঝতে পারে বৈষম্য। ফলে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। নিজেকে পরিবার থেকে বিচ্যুত করা কিংবা স্বাভাবিকতার মধ্যে না থেকে নিজের মধ্যে এক ভিন্ন জগৎ তৈরি করতেও অনেককে দেখা যায়। পরিবারের পরিবর্তে বাইরের জগেক ভালো মনে হয়। সেখানেও দুষ্ট লোকের অভাব হয় না। তারা সব সময় সুযোগ খোঁজে, সময়ের অপেক্ষায় থাকে। ভুলিয়ে কিংবা প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে যায় এমন এক জগতে, যেখান থেকে তারা আর ফিরে আসতে পারে না।

মানুষের চাহিদা জীবনব্যাপী। সামাজিকীকরণের প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে সমানভাবে চাহিদা ও প্রয়োজন পূরণে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। তবে শিশু থেকে বয়ঃসন্ধিকাল এবং তার পরবর্তী কিছু সময় ছেলেমেয়েদের চাহিদা ও প্রয়োজনের প্রতি যথাযথ গুরুত্ব না দিলে বিপথগামিতা বেশি দেখা দেয়। জীবনের প্রতিটি স্তরের চাহিদা ও প্রয়োজন এক নয়। আমাদের প্রাত্যহিক খাদ্য-বস্ত্রের প্রয়োজন কাছাকাছি হতে পারে; কিন্তু বয়ঃসন্ধিকালে একজন কিশোরীর চাহিদা এবং তার মন বোঝার প্রতি আমাদের মনোযোগ থাকা উচিত। এ সময় মা-বাবার সঙ্গে সন্তানদের খোলামেলা আলোচনা এবং সুন্দর পরিবেশ তাদের চলার পথ করতে পারে মসৃণ। বিপরীতে অবজ্ঞা, অবহেলা ও গুরুত্ব না দেওয়া তাদের মধ্যে ভিন্ন মাত্রা তৈরি করে। যদি পরিবার থেকে পর্যাপ্ত সহযোগিতা এ বয়সের কিশোর-কিশোরীরা না পায়, তাহলে তাদের মধ্যে বিপথগামিতা দেখা দিতে পারে। কিশোরীদের মধ্যে পরিবার ও সমাজের প্রতি বিরূপ মনোভাব তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

আমরা যে পরিবার নিয়ে কথা বলছি, সেই পরিবারেই অবহেলা ও অযত্নে বেড়ে ওঠে অনেক মেয়েশিশু। এমন পরিবার আছে, যেখানে সন্তানদের কোনো কিছুরই অভাব নেই। আবার দারিদ্র্য, পারিবারিক কলহ, ঝগড়াবিবাদবেষ্টিত পরিবারে মানুষ হচ্ছে অনেক শিশু। শুধু মা কিংবা বাবার কাছে মানুষ হওয়া শিশুও রয়েছে। সত্মা কিংবা আত্মীয়-স্বজনের কাছে মানুষ হওয়া মেয়েশিশুও আমাদের কম নয়। আমাদের পরিবারের ধরনের মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন হওয়ায় মা-বাবা নিয়ে গঠিত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে মানুষ হওয়া সন্তানদের পরিবারের সংখ্যা আস্তে আস্তে কমে যাচ্ছে। পরিবার গঠন করা মানে দায়িত্ব নেওয়া। প্রত্যেক সদস্যের বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া, তাদের আগলে রাখা এবং আর্থিক নিরাপত্তা বিধান করা। কিন্তু আমরা যদি সেই দায়িত্ব থেকে সরে আসি, তাহলে পরিবার নামের ধারণাটি সম্পর্কে আমাদের নতুন করে চিন্তা করতে হবে। দায়িত্ববোধ থেকে সচেতনতার ভাব তৈরি হয়। আমরা যদি আমাদের ছেলেমেয়েদের একটি সুন্দর পারিবারিক পরিবেশ দিতে পারি, তাহলে তারা পরিবারের মধ্যেই সব কিছু খুঁজতে শিখবে ও খুঁজে পাবে। আর যদি না পারি, তাহলে তাদের মনে হবে বাইরের জগিট তাদের জন্য ভালো। যখন বাইরের জগেক বড় মনে করবে, তখন নিজেকে হারিয়ে যেতে সময় লাগবে না। এমন মনোভাব নিয়ে চলা কিশোরীদের একসময়ে যেমনটি আগে বলেছি, ওত পেতে থাকা দুষ্ট মানুষ সুযোগ বুঝে তাদের সহজে ফুসলিয়ে পাচার করতে পারে। কেননা ওই সময় তার কাছে পরিবারের বাইরের ব্যক্তিরাই সব কিছু। নিজের মধ্যে হিতাহিত জ্ঞান কাজ করে না। সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার দায়িত্ব পরিবারের। এই মূলমন্ত্র সামনে রেখে পরিবারের মধ্যে সব কিছু খুঁজতে হবে। মেয়েশিশুর প্রতি অযত্ন ও অবহেলা নয়, নয় লিঙ্গবৈষম্য। কিশোরীদের চোখ-কান খোলা রেখে পথ চলতে হবে। অভিভাবকদের ছেলেমেয়ের প্রতি আরো সচেতন হতে হবে, তাদের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। তাদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের প্রতি বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী তাদের কাজ করবে; কিন্তু অভিভাবক হিসেবে আমরা আমাদের দায়িত্ব এড়াতে পারি না।

লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews