ইরানের শহীদ সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজাতে লাখো মানুষের অংশগ্রহন বিশ^কে এই বার্তা দিচ্ছে যে, এটি শুধুুমাত্র একটি জাতীয় বিদায় অনুষ্ঠান নয় এবং তেহরানে ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া আমেরিকা ও ইসরায়েলের যুদ্ধ ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে দুর্বল করতে পারেনি। বরং ইরান নিজেকে প্রতিরোধী, ঐক্যবদ্ধ এবং নতুন আঞ্চলিক বাস্তবতা গড়ে তুলতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হিসেবে তুলে ধরেছে।
কূটনীতিক এবং বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান তার টিকে থাকাকে দর কষাকষির ক্ষেত্রে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করতে ব্যবহার করছে। এই সংঘাত হরমুজ প্রণালীর ওপর তেহরানের প্রভাবকে আরও জোরদার করেছে, যা তাকে এই যুক্তি দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে যে, তার পারমাণবিক কর্মসূচি সংক্রান্ত যেকোনো ভবিষ্যৎ চুক্তিতে এই গুরুত্বপূর্ণ তেল সরবরাহ পথের চারপাশের অবস্থানের কৌশলগত গুরুত্বকে অবশ্যই স্বীকৃতি দিতে হবে।
ওয়াশিংটনের উদ্দেশ্য ছিল ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে পারমাণবিক কূটনীতি পুনরুজ্জীবিত করা। কিন্তু এখন প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দু ইউরেনিয়াম নয়, বরং ভৌগোলিক অবস্থানের দিকে সরে গিয়েছে। তেহরান হরমুজকে ঘিরে যুদ্ধকালীন অবস্থানকে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সুবিধায় রূপ দিতে চাইছে।
যদিও এখনো যুদ্ধবিরতি ও এর সঙ্গে থাকা সমঝোতা স্মারকের আওতায় চূড়ান্ত চুক্তির জন্য নির্ধারিত ৬০ দিনের সময়সীমা শুরু হয়নি, তবে তেহরানই আলোচনার গতি নির্ধারণ করছে। আমেরিকা-ভিত্তিক ‘মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউট’-এর অ্যালেক্স ভাতাঙ্কা বলেন, ‘প্রতীকী দিকটি ইরানিদের কাছে অর্থনৈতিক আয়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তারা এক ধরনের প্রতীকী স্বীকৃতি চায় যে প্রণালিটি ইরানের। বিষয়টি হলো প্রণালির ওপর ইরানকে সার্বভৌম শক্তি হিসেবে স্বীকার করা।’
একটি ফার্সি প্রবাদ উদ্ধৃত করে ভাতাঙ্কা আরও বলেন, ‘লেবেনচুষের জন্য কেন হীরা হাতছাড়া করবেন?’ তেহরানের হিসাব অনুযায়ী, হরমুজ হলো সেই হীরা, আর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও জব্দ সম্পদ ফেরত পাওয়া হলো লেবেনচুষ। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ বলেছেন, ‘হরমুজ প্রণালি আমাদের সবচেয়ে বড় ক্ষমতার হাতিয়ার; এই ঐশী আশীর্বাদকে আমাদের যথাযথভাবে রক্ষা করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই ইরান সেখানে তার অধিকার ছেড়ে দেবে না।’
ইরান, যা পারমাণবিক বোমা তৈরির কথা অস্বীকার করে, বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহকারী হরমুজ প্রণালী বরাবর ট্রানজিট ব্যবস্থা, সমন্বয় প্রক্রিয়া বা পরিষেবা শুল্কের মাধ্যমে হরমুজের চারপাশে তার অবস্থানকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। সাবেক মার্কিন কূটনীতিক অ্যালান আয়ার বলেছেন, ‘ইরানিরা জানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে চান; তিনি অন্য বিষয়ে এগিয়ে যেতে চান। তারা জানে সময় তাদের পক্ষেই রয়েছে, তাই তারা ট্রাম্পের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম।’
এমিরেটস পলিসি সেন্টারের প্রেসিডেন্ট ইবতেসাম আল-কেতবি বলেছেন, যুদ্ধের কারণগুলোর সমাধান না করে যুদ্ধ বন্ধ করা হলে তা হরমুজকে তেহরানের জন্য একটি স্থায়ী দর কষাকষির উৎসে পরিণত করবে। তিনি বলেন, ‘তারা আমেরিকাসহ বাকিদের বেকায়দায় ফেলেছে। এখন তারা হরমুজের এই গুপ্তধন খুঁজে পেয়েছে, তাই তারা এটি ছাড়বে না।’
বিশ্লেষকদের মতে, শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনকে হয়তো তেহরানের নির্ধারিত শর্তেই হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত হওয়া মেনে নিতে হতে পারে। আইর বলেন, ‘কেউই জিতবে না, তবে আমেরিকার তুলনায় ইরানের ক্ষতি কম হবে।’