দোরগোড়ায় কড়া নাড়ছে ফুটবল বিশ্বকাপ। এই মহারণকে সামনে রেখে গোটা পৃথিবী যেন প্রস্তুত হতে শুরু করেছে। আসর মাঠে গড়ানোর এখনো ১৫ দিনের মতো থাকলেও পড়তে শুরু করেছে তার রেশ।

বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় এই খেলা নিয়ে গল্প এবং মিথের অভাব নেই। ১৯৩০ সাল ধরে শুরু হওয়া বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার সাথে মিশে আছে নানা ইতিহাস। আছে বিচিত্র সব ঘটনাও।

তেমনি বিশ্বকাপের বিচিত্র কিছু ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে থাকছে আজকের আয়োজন।

কুকুরের ট্রফি উদ্ধার

বিশ্বকাপের মূল আকর্ষণ ট্রফি। এই ট্রফি জয়ের জন্যই লড়াই করে দলগুলো। কিন্তু সেই ট্রফিই যদি লাপাত্তা হয়ে যায় তাহলে কেমন হয়? হ্যাঁ, ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপে সেটাই হয়েছিল। বিশ্বকাপ শুরুর আগে চুরি হয়ে যায় জুলেরিমে ট্রফি।

চারদিকে হুলুস্থুল পড়ে গেল! স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড তদন্তে নামল, চোরকে ধরার জন্য ফাঁদ পাতা হলো, কিন্তু ট্রফির কোনো খোঁজ নেই। এমতাবস্থায় নায়ক বনে যায় এক কুকুর। নাম তার পিকলস।

লন্ডনের একটি ঝোপের নিচ থেকে ট্রফিটি খুঁজে পায় পিকলস। যা কাগজে মোড়ানো ছিল। আর তাতেই পিকলস জাতীয় বীরে পরিণত হয়। এমনকি ইংল্যান্ড চ্যাম্পিয়ন হলে রাজকীয় ভোজে পিকলসকেও নিমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।

ফের চুরি হয়ে যায় বিশ্বকাপ

১৯৭০ সালে পেলের ব্রাজিল তৃতীয়বার ট্রফি জিতলে তখনকার জুলেরিমে ট্রফিটি তারা স্থায়ীভাবে নিয়ে যায় রিও ডি জেনিরোতে। সেখানেই ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশনের দফতরে বুলেটপ্রুফ কাচে নিরাপত্তা দিয়ে রাখা হয় ট্রফিটি।

কিন্তু ১৯৮৩ সালের ১৯ ডিসেম্বর রাতে সেই ট্রফি চুরি হয়ে যায়। চুরির অপরাধে চারজনকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়, কিন্তু ট্রফিটি আর পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হয়, চোরেরা সেটি গলিয়ে স্বর্ণের বার বানিয়ে ফেলে ও কালোবাজারে বিক্রি করে দেয়।

অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বিড়ম্বনা

১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপের ঘটনা। এক অদ্ভুত কারণে ওই বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ শুরু হতে বিলম্ব হয়েছিল। কারণটা ছিল অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড। ইংল্যান্ডের সাতজন খেলোয়াড় হোটেলে তাদের অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড রেখে যান।

ইংল্যান্ডের জাতীয় খেলোয়াড়দের চেহারা পুলিশ চিনলেও তাদের ঢুকতে দেয়নি। কারণ নিয়মকানুন সবার উপরে! পরে হোটেল থেকে অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড আনানোর পর খেলোয়াড়রা মাঠে প্রবেশ করেন এবং খেলা শুরু হয়।

বিশ্বকাপে খেলতে ইউরোপের অনীহা

ইউরোপকে ছাড়া ফুটবলকে কল্পনাই করা যায় না। কিন্তু ইউরোপেরই নাকি ফুটবল বিশ্বকাপে অনিহা জাগে। হ্যাঁ, বিষয়টি সত্যি। ১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে হওয়া প্রথম বিশ্বকাপে কোনো বাছাইপর্ব ছিল না। ফিফা প্রায় সব দেশকেই সেই আসরে খেলার আমন্ত্রণ জানিয়েছিল।

কিন্তু অর্থনৈতিক দুরাবস্থা ও আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে লাতিন দেশ উরুগুয়েতে যাওয়ার আগ্রহ দেখায়নি পুরো ইউরোপ। পরে ফিফা সভাপতি জুলেরিমের কল্যানে নাম দেয়ার শেষ দিনে বিশ্বকাপে যোগ দেয় ফ্রান্স, বেলজিয়াম, যুগোশ্লাভিয়া ও রোমানিয়া।

ভারতের জুতা বিহীন খেলতে চাওয়া

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ১৯৪২ ও ১৯৪৬ সালে বিশ্বকাপ মাঠে গড়ায়নি। ১৯৫০ সালে বিশ্বকাপে অংশ নেয়ার জন্য দলই খুঁজে পাচ্ছিল না ফিফা। তখন সুযোগ মেলে ভারতের। কিন্তু সেই সুযোগ লুফে নিতে পারেনি ভারত।

কথা রটে, ভারত নাকি জুতা ছাড়া খেলতে চেয়েছিল। কিন্তু তাতে সায় দেয়নি ফিফা। পরে আর খেলা হয়নি ভারতের। আবার এও শোনা যায়, অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশন (এআইএফএ) নাকি বিশ্বকাপ থেকে অলিম্পিককেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল।

লাল-হলুদ কার্ডের আগমন

১৯৭০ সালের বিশ্বকাপের সময় প্রথম লাল কার্ড এবং হলুদ কার্ডের ব্যবহার শুরু হয়। এর আগে রেফারিরা খেলোয়াড়দের মৌখিকভাবে বরখাস্ত করতেন। কিন্তু ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপে ঘটে বিপত্তি।

কারণ ওই বিশ্বকাপে আর্জেন্টাইন এক খেলোয়াড়কে বরখাস্ত করা হলে তিনি না বোঝার ভান করেছিলেন। বিষয়টি নিয়ে বেধে যায় হট্টগোল। পরবর্তীতে পরের বিশ্বকাপেই লাল কার্ড ও হলুদ কার্ডের আগমন ঘটে।

বল নিয়ে বিবাদ

প্রথম বিশ্বকাপের ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়ে। ওই সময় অফিশিয়াল বলের প্রচলন ছিল না। এদিকে ফাইনাল খেলতে দু’দলই দু’টি বল মাঠে নিয়ে এসেছিল। দু’দলেরই প্রত্যাশা ছিল তাদের বল নিয়ে খেলা হবে।

এটা নিয়ে রেষারেষি হয়, বেশ তর্কও হয়। শেষ পর্যন্ত পরে রেফারি দু’দলের মন রাখেন। ম্যাচের দুই অর্ধে দু’দলের দুই বল ব্যবহার করেন।

মারাকানা ট্র্যাজেডি

১৯৫০ বিশ্বকাপের ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল ব্রাজিল ও উরুগুয়ে। ম্যাচটি ড্র করলেই শিরোপা নিশ্চিত হতো ব্রাজিলের। তাই বিশ্বকাপ জয় নিয়ে শতভাগ আশাবাদী ছিল দলটা। এমনকি মূল লড়াই শুরুর আগে তাদের দৈনিক ‘ও মুন্দো’ ব্রাজিলকে চ্যাম্পিয়ন বানিয়ে খবর প্রকাশ করে দেয়।

এমতাবস্থায় প্রতিপক্ষ উরুগুয়ে অধিনায়ক যা করেন, তা বড় হাস্যকর। তিনি পত্রিকাটির অনেকগুলো সংখ্যা কিনে নিজেদের হোটেল রুমের টয়লেটে নিয়ে ফেলেছিলেন। সতীর্থদের বলেছিলেন পত্রিকাগুলোর ওপর প্রস্রাব করতে! দলের আত্মবিশ্বাস বাড়াতেই এটা করেছিলেন অধিনায়ক।

শেষ পর্যন্ত তার আত্মবিশ্বাসই জিতল। ফাইনালে লাখো দর্শকের সামনে স্বাগতিক ব্রাজিলকে ২-১ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপ জিতে নেয় উরুগুয়ে। ব্রাজিলিয়ান ভক্তরা এ ঘটনায় অনেক বড় ধাক্কা খায়। এমনকি এতটাই ভেঙে পড়ে যে ফাইনালের পর মারাকানা স্টেডিয়ামের ছাদ থেকে লাফ দিয়ে দর্শকদের আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে।

বিশ্বকাপ পেয়েছিলেন নেলসন ম্যান্ডেলা!

বিশ্বকাপের আসল ট্রফি কোনো দলকেই দেয়া হয় না। এমনকি বিশ্বকাপজয়ী দেশকেও দেয়া হয় রেপ্লিকা ট্রফিটা। তবে একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলেন নেলসন ম্যান্ডেলা। দল নয়, ব্যক্তি হিসেবে বিশ্বকাপ পেয়েছিলেন তিনি।

২০১০ বিশ্বকাপের আগে ফিফা ব্যতিক্রমী এক সিদ্ধান্ত নেয়। কিংবদন্তি এই আফ্রিকান নেতাকে একটি প্রতিরূপ তৈরি করে উপহার দেয় তারা। কোনো ব্যক্তির বিশ্বকাপ ট্রফি উপহার পাওয়ার এটিই একমাত্র ঘটনা।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews