আমাদের জাতীয় কবি নজরুল লিখেছেন, ‘এমন জীবন তুমি করিও গঠন, মরিলে হাসিবে তুমি, কাঁদিবে ভুবন’। ক্ষণস্থায়ী জীবনের পরিক্রমা শেষে প্রত্যেক মানুষের মৃত্যু অনিবার্য। এ থেকে কারোই পরিত্রাণ নেই। অথবা মৃত্যুই হচ্ছে মহাজীবনের অমোঘ পরিত্রাণের সেতু। জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে প্রতিটি মানুষ তার বিগত যাপিতজীবনের হিসাব মেলাতে চেষ্টা করে। মানবজীবন যতই মহত্তর হোক, লক্ষ্য অজর্নের পথে আত্মতুষ্টি ও পরিপূর্ণ সফলতার কোনো সুযোগ নেই। তিনি যদি কালোত্তীর্ণ কবি, শিল্পী-সাহিত্যিক, কলাকার, বিজ্ঞানী কিংবা দার্শনিক হোন, তার সৃষ্টির মধ্য দিয়েই তিনি যুগে যুগে নতুনভাবে মূল্যায়িত, স্মরিক ও চর্চিত হবেন। আর তিনি যদি রাজনীতিবিদ, রাষ্ট্রনায়ক ও মুক্তি সংগ্রামের যোদ্ধা হোন, ইতিহাসের বাক বদলের সাথে সাথে তিনিও তার কর্ম দিয়ে কালোত্তীর্ণ জাতীয়, আঞ্চলিক ও আর্ন্তজাতিক নেতা হিসেবে স্মরণীয় হবেন। এটাই ইতিহাসের দায় এবং দান। এই মুহূর্তে বাংলাদেশ ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। বেগম খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের অবনতি, এভারকেয়ার হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রের বাইরে পুরো জাতি এখন একটি অস্তমিত সূর্যের শেষ আলোকরশ্মির জন্য মোনাজাতে অশ্রু ফেলছে। এটি এমন এক সন্ধিক্ষণ ও ক্রান্তিকাল; কোনো কোনো জাতি হাজার বছরেও এমন গুরুত্বপূর্ণ ক্রান্তিকালের দেখা পায়না। আমরা বাঙ্গালি মুসলমানরা একটি গণতান্ত্রিক জাতিরাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে গত এক শতাব্দীতে অন্তত চারটি বিপ্লবী ঘটনার জন্ম দিয়েছি। সাতচল্লিশের পাকিস্তান আন্দোলন, একাত্তুরের মুক্তিযুদ্ধ, পঁচাত্তরের সিপাহী জনতার বিপ্লব এবং হাজার হাজার মানুষের জীবন, রক্ত ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের পর বাংলাদেশ আজ নতুন সংকট ও সম্ভাবনার সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছে। অতীতের প্রতিটি যুদ্ধ, সংগ্রাম, আত্মদানের মধ্য দিয়ে অর্জিত স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক বিজয় আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী ষড়যন্ত্রের এজেন্ডায় রাজনৈতিক বিভেদ-বিভক্তি ও দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও হীনরাজনৈতিক স্বার্থের মোড়কে বেহাত ও ব্যর্থ হয়েছে। এবারের জুলাই বিপ্লব নিয়ে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি শক্ত প্রত্যাঘাত-প্রতিক্রিয়া ও প্রতিবিপ্লবের আলামত স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল, যা এখনো সক্রিয় রয়েছে। গত ৫৪ বছরে বাংলাদেশে ভারতের প্রভাবে যে রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ও গোয়েন্দা অ্যাসেট প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিল, জুলাই অভ্যুত্থানের পর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অ্যাসেট আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে শুরু করে মন্ত্রী-এমপি, সামরিক-বেসামরিক সাবেক আমলা থেকে শুরু করে চিহ্নিত পাতি নেতারা পর্যন্ত ভারতে পালিয়ে গিয়ে নিজেদের নিরাপদ দূরত্বে রেখে পুরানো অচল ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক ন্যারেটিভ আউড়ে বাংলাদেশকে অশান্ত ও অকার্যকর করে তোলার বহুমুখী প্রকল্প চালু রেখেছে। গত ১৬ মাসে বাহ্যিকভাবে প্রকাশিত-প্রচারিত হুমকি ও উস্কানিমূলক প্রোগ্রামগুলো জনগণের প্রতিরোধের মুখে ব্যর্থ হলেও সেই বৃটিশ ঔপনিবেশিক আমল থেকেই জাতিগত নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে শক্তিশালী সফ্ট ওয়েপন হিসেবে ‘ডিভাইড অ্যান্ড কনকোয়্যার’ অথবা ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ পলিসি আমাদের রাষ্ট্র ও জাতিবিরোধী শক্তি হিসেবে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করে এসেছে। জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান আমলের ২৩ বছর এবং মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ আমলের ৫৪ বছর, মোট ৭৭ বছরে জমে ওঠা জঞ্জাল ও প্রতিবন্ধকতাগুলো চিহ্নিত করে চিরায়ত স্বপ্ন ও প্রত্যাশার আলোকে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলার নতুন সম্ভাবনাকে ব্যর্থ করে দিতে পুরনো ষড়যন্ত্রের পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে। ক্ষমতার প্রলোভন ও ভয়ের সংস্কৃতিকে কাজে লাগিয়ে বৃহত্তর জাতীয় লক্ষ্য ও স্বার্থের প্রশ্নে প্রতিষ্ঠিত জাতীয় ঐক্যকে নস্যাৎ করে দেশের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ভেতর আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-সংঘাত এবং একসঙ্গে দীর্ঘদিনের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের জোটসঙ্গিদের মধ্যে বিভেদ-বৈরিতা উস্কে দিয়ে আধিপত্যবাদী শক্তি দেশকে পুরনো বন্দোবস্তের পথে আবদ্ধ করতে চাইছে।
চব্বিশের ৫ আগস্টের পর দিল্লি থেকে নির্দেশিত ও প্রযোজিত পতিত স্বৈরাচারের প্রতিটা ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্র ও উস্কানি জনগণের সচেতন প্রতিরোধের মুখে ব্যর্থ হলেও রাজনৈতিক দলগুলোর ভোটের রাজনীতির ভুল হিসাব নিকাশের দ্বন্দ্ব সবকিছু ভন্ডুল করে দিতে চাইছে। গত জুন মাসে অর্šÍবর্তী সরকার, জামায়াত ও বিএনপির মধ্যে একটি ত্রিমুখী দ্বন্দ্ব মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে শুরু করলে অসুখ-অসুস্থ্যতায় জর্জরিত বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার নির্দেশনা ও জাতীয় ঐক্যের সুস্পষ্ট বার্তায় জাতি উত্তরণের নতুন গতিপথ লাভ করে। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস লন্ডনে গিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাথে সাক্ষাৎ শেষে ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ পুর্নব্যক্ত করেন। এরপর জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকের মধ্য দিয়ে জুলাই সনদ প্রণয়ন ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের রূপরেখা অনেকটা এগিয়ে নিতে আওয়ামী ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে একই প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক প্রত্যাশার সাথে ঐক্যের মেলবন্ধনের যে চিত্র দেখা গেছে, তা ছিল বেগম খালেদা জিয়ার সাময়িক সুস্থতা ও প্রজ্ঞাপূর্ণ নির্দেশনার প্রতিফলন। গত ২০ নভেম্বর সশস্ত্র বাহিনী দিবসের জাতীয় অনুষ্ঠানে অসুস্থ খালেদা জিয়ার হাস্যোজ্জ্বল উপস্থিতি, প্রধান উপদেষ্টা, সেনাপ্রধান এবং জাতীয় নেতৃবৃন্দের সাথে কুশল বিনিময়ের দৃশ্য শুধু বিএনপি নেতাকর্মীদেরই নয়, পুরো জাতিকে আনন্দিত ও আশান্বিত করেছিল। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের প্রার্থী মনোনয়ন তালিকায় তিনটি আসনে বেগম খালেদা জিয়ার নাম দেখে বিএনপি নেতাকর্মীরা আনন্দিত হয়েছিল। সশস্ত্র বাহিনী দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার ২দিনের মাথায় খালেদা জিয়ার শ্বাসকষ্টসহ স্বাস্থ্য জটিলতা দেখা দিলে ২৩ নভেম্বরে এভারকেয়ার হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে দেশি-বিদেশি চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত মেডিক্যাল বোর্ডের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা চলছে। হাসপাতালে মুমূর্ষু খালেদা জিয়ার জীবন সংশয় এর আগেও দেখা গিয়েছিল। স্বৈরাচারি শেখ হাসিনা ক্যামেরার সামনে তাচ্ছিল্যের সাথে বলেছিলেন, ‘বয়স হইছে মরে যাবে, এত ..কিসের?’ কিন্তু রাখে আল্লাহ মারে কে? মূলত একজন কর্মী, শিল্লী ও সফল রাজনীতিকের জন্য তার বায়োলজিক্যাল লাইফের চেয়ে কর্মজীবনের সাফল্য-ব্যর্থতা বা জীবন-মৃত্যুর চুড়ান্ত মানদ- ও ইতিহাসে তাঁর অবস্থান নির্ধারিত হয়ে থাকে। যে শেখ হাসিনা খালেদা জিয়াকে এতিমের অর্থ আত্মাসাৎকারি ও দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদ হিসেবে জনগণের কাছে চিহ্নিত ও হেয় করতে চেয়েছিলেন এবং নিজেকে গণতন্ত্রের মানসকন্যা, মাদার অফ হিউম্যানিটি, উন্নয়নের রোল মডেল ও বিকল্পহীন রাষ্ট্রনায়কের আসনে অধিষ্ঠিত করতে গোয়েবলসীয় প্রপাগান্ডার আশ্রয় নিয়েছিলেন, সেই শেখ হাসিনা এখন আর্ন্তজাতিকভাবে গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত হয়ে মৃত্যুদ-ে দ-িত, দেশোদ্রোহী ও মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত আরো শতাধিক মামলার পলাতক-ফেরারি আসামী।
বেগম খালেদা জিয়াকে সবদিক থেকে নি:শেষ করে দিতে যা কিছু করণীয় তার সবই করেছিল শেখ হাসিনা। মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক সেক্টর কমান্ডার, স্বাধীনতার ঘোষক, সাবেক সেনাপ্রধান, সাবেক প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঢাকা সেনানিবাসে জিয়াউর রহমানের মঈনুল রোডের বাড়িটি জিয়া পরিবারের জন্য রাষ্ট্র বরাদ্দ দিয়েছিল। সেখানেই খালেদা জিয়ার জীবনের বেশিরভাগ সময় কেটেছে। তার সন্তান তারেক রহমান ও আরাফাত রহমানের শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি থেকে খালেদা জিয়াকে নির্দয়ভাবে উচ্ছেদ করার দৃশ্য জাতি দেখেছে। দেশের সবচেয়ে সফল রাষ্ট্রপ্রধান এবং দেশের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান রূপকার হয়েও শহীদ জিয়া দেশের কোথাও কোনো সম্পদ অর্জন করেননি, কোথাও নিজের ও পরিবারের জন্য বাড়ি বা ফ্ল্যাট ক্রয় করেননি। উল্লেখ করার মতো কোনো ব্যাংক-ব্যালেন্স রেখে যাননি। জিয়া আরো অন্তত ৫ বছর বেঁচে থাকলে বাংলাদেশ পুরোপুরি ভারতীয় আধিপত্যবাদী প্রভাবমুক্ত হয়ে দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত শক্তির ভরকেন্দ্রে পরিনত হতো বলে অনেকের বিশ্বাস। ভারতীয় প্রেসক্রিপশনে শেখ মুজিবের ভ্রান্ত বাকশাল ও বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদের খোলসকে বঙ্গোপসাগরে ফেলে দিয়ে জিয়া বহুদলীয় গণতন্ত্র ও বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে জাতীয় ঐক্য ও উন্নয়নের রাজনীতির যে ভিত্তি গড়ে দিয়েছিলেন, বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনে সে দৃষ্টিভঙ্গির বাস্তব প্রতিফলন ঘটেছে। তবে একজন নেতা যত যোগ্য বা শক্তিশালী হোন না কেন, রাজনৈতিক দল ও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে সঠিক অনুসারি ও টিমওয়ার্ক না থাকলে সফল হওয়া অসম্ভব। বিএনপির রাজনীতির শুরুতেই জিয়াউর রহমান অনেক উচ্চশিক্ষিত ও যোগ্য লোকদের সমাবেশ ঘটাতে সক্ষম হলেও তারা কেউই জিয়ার যোগ্য উত্তরসূরী হয়ে উঠতে পারেননি। জিয়াউর রহমান দলকে সংগঠিত করে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নেতৃত্ব নির্বাচনের ধারাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার সময় পাননি। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জাত শত্রুদের টার্গেট হওয়া ছাড়া জিয়া হত্যার অন্য কোনো কারণ ছিল না। বহুদলীয় গণতন্ত্রের সফল প্রবক্তা জিয়াকে হত্যা করে সামরিক স্বৈরাচার এরশাদের হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে সামরিক বুটের নিচে চেপে রাখার নীল নকশা বেগম খালেদা জিয়ার আপসহীন নেতৃত্বের কাছে হেরে যায়। নব্বইয়ের গণআন্দোলনে এরশাদের পতনের পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসবে, এমনটাই ধারণা ছিল ভারতীয় আধিপত্যবাদী শক্তির। নির্বাচনের আগে শেখ হাসিনা জনসভায় দম্ভ করে বলেছিল, বিএনপি ১০টির বেশি আসন পাবে না। অন্যদিকে, নির্বাচনের আগেই শেখ হাসিনা সম্ভাব্য মন্ত্রী পরিষদের রূপরেখা চুড়ান্ত করেছিলেন। কিন্তু জনগণ ভুল করেনি। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও ভারতীয় আধিপত্যবাদের প্রশ্নে আপসহীন নেতা হিসেবে জনগণ খালেদা জিয়াকে কখনোই নিরাশ করেনি। একানব্বই থেকে সর্বশেষ সক্রিয়তা পর্যন্ত তিনি যতবার যত আসনে নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন সব আসনে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। অন্যদিকে, শেখ হাসিনা মিরপুরের হারুন মোল্লা কিংবা গোপীবাগের সাদেক হোসেন খোকার সাথে নির্বাচনে হেরেছেন। এরশাদ যেমন রংপুরের নেতা হিসেবে রাজনীতিতে টিকেছিলেন, শেখ হাসিনা তেমনি গোপালগঞ্জের নেতা হিসেবেই দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। খালেদা জিয়াই একমাত্র জাতীয় নেতা, যিনি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নির্বাচন করে কোথাও হারেননি। স্বৈরশাসক ও ভারতীয় আধিপত্যবাদের প্রশ্নে খালেদা জিয়া আপসহীন ভূমিকায় থাকলেও বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার পরও গণতান্ত্রিক যাত্রায় প্রতিপক্ষের ন্যায্য দাবির সাথে আপসের অনন্য দৃষ্টান্ত রেখেছেন। রাষ্ট্রপতির শাসন থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন, তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বাস্তবায়নের প্রশ্নে খালেদা আপসকামি মনোভাব ছিল উন্নত গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন।
খালেদা জিয়া এখন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। হাসপাতালে তার সংকটাপন্ন অবস্থার খবর প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে দলমত, ধর্মবর্ণ নির্বিশেষ দেশের সব মানুষ তার সুস্থতার জন্য দোয়া করছেন। বিদেশ থেকেও বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনেতা খালেদা জিয়ার রোগমুক্তি কামনা করে বার্তা পাঠাচ্ছেন। রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা ভুলে গিয়ে খালেদা জিয়ার জন্য দোয়া-প্রার্থণায় সামিল হচ্ছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা একজন বয়োবৃদ্ধ রাজনৈতিক নেতার জন্য পুরো জাতির এমন আকূল উদ্বেগ ও প্রার্থণায় সামিল হওয়ার দৃষ্টান্ত সাম্প্রতিক অতীতে আর কোনো নেতার ক্ষেত্রে দেখা যায়নি। খালেদা জিয়া বাংলাদেশের জনগণের মণিকোঠায় স্থান পাওয়া জাতীয় নেতায় পরিনত হয়েছেন, জাতির ক্রান্তিকালে তাকে খুব প্রয়োজন, হাসপাতালে ক্রিটিক্যাল অবস্থায় থাকা নেতার জন্য কোটি কোটি মানুষের আর্তির যে ছায়া সারাদেশে দেখা যাচ্ছে, তা থেকে তাই প্রমাণিত হয়েছে। আমাদের জাতীয় ইতিহাসে স্থান পাওয়া জাতীয় নেতাদের মধ্যে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি, শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, মাওলানা ভাসানি, শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমানের পর খালেদা জিয়ার নামটি নিশ্চিতভাবেই সংযোজিত হবে। আত্মঘাতী রাজনীতির মধ্য দিয়ে শেখ মুজিব নিজের লিগ্যাসিকে ধ্বংস করলেও স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে তার অবদানের কারণে তিনি ইতিহাসের কাঠগড়ায় নিজের ভালোমন্দ নিয়েই অবস্থান করবেন। তবে শেখ হাসিনার গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ, রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে দেশকে লুটে নিয়ে বিদেশে পাচার করে নিজে বিদেশে পালিয়ে গিয়েও দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার অপরাধে অনাগত কালেও তার উপর এ দেশের দেশপ্রেমিক-গণতন্ত্রকামী মানুষের ঘৃণা ও ক্ষোভের বহি:প্রকাশ ঘটতে থাকবে। এ দেশের মাটি ও মানুষ মিরজাফর-ঘষেটি বেগমদের কখনো ক্ষমা করেনি, করবে না। একইভাবে শহীদ নবাব সিরাজদ্দৌলা, নিসার আলি তিতুমীর থেকে মুক্তিযুদ্ধের সাত বীরশ্রেষ্ঠ, বীরোত্তম শহীদ জিয়া, জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদ আবু সাঈদ, মুগ্ধসহ অসংখ্য শহীদের প্রতি পতিত ফ্যাসিস্টের দোসরদের ছাড়া এ দেশের ১৮ কোটি মানুষের গভীর শ্রদ্ধা ভালোবাসা চিরদিন অটুট থাকবে। নির্মম প্রতিহিংসাপরায়ণ ফ্যাসিস্টের টার্গেট হয়েও দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য দেশের মাটি কামড়ে পড়ে থেকে জাতিকে দিক নির্দেশনা দিয়ে ঐকবদ্ধ রাখার নেতৃত্ব দিয়ে বেগম খালেদা জিয়া যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা ভবিষ্যতের রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য স্মরণীয়-অনুসরনীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। খালেদা জিয়া এখন বিএনপির দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে স্বৈরাচার ও আধিপত্যবাদবিরোধী প্রতিবাদ-প্রতিরোধের প্রতীক। পরমকরুনাময়ের ইচ্ছায় অবশিষ্ট সময়ে তার ভাগ্যে যাই ঘুটুক; একজন গৃহবধূ থেকে স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনের আপসহীন নেত্রী থেকে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী, ফ্যাসিস্ট হাসিনার নির্মমতায় পুত্র হারানোর শোক ও কারাগারে স্লো-পয়জনিংয়ের শিকার হওয়া নেতা খালেদা জিয়ার দেশমাতা হয়ে ওঠার গল্প আমাদের জাতীয় ইতিহাসে উজ্জ্বল নক্ষত্রের মত জাজ্জ্বল্যমান
থাকবে। জাতির এই ক্রান্তিকালে পুরো জাতি দুরু দুরু বুকে তাঁর সুস্থতার জন্য প্রার্থণা করছে। তিনি যেখানে যেমনই থাকুন, শহীদ জিয়ার আদর্শিক উত্তরসূরি হিসেবে তাঁর দেখানো পথে আধিপত্যবাদী শক্তির ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে জাতি আপসহীনভাবে ঐক্যবদ্ধ থাকবে, এটাই সকলের প্রত্যাশা।
bari_zamal@yahoo.com