যে আশা, আকাঙ্খা ও প্রত্যাশা বুকে ধারণ করে ১৯৭১ সালে এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, গত ৫৫ বছরেও তা অর্জিত হয়নি। এই ব্যর্থতা ও আশাভঙ্গের পেছনে রয়েছে ভারতীয় আধিপত্যবাদী ষড়যন্ত্র ও অর্থনৈতিক লুণ্ঠন ব্যবস্থা। এ দেশের মানুষকে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিকভাবে বিভক্ত করে বৈষম্য ও লুন্ঠন ব্যবস্থা কায়েম রাখতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার একটি মনগড়া ন্যারেটিভ বানিয়ে অর্ধশত বছর ধরে তা ব্যবহার করা হয়েছে। ভারতীয় মূলধারার গণমাধ্যম, তাদের প্রভাবিত পশ্চিমা গণমাধ্যম এবং দেশে গড়ে ওঠা আদিপত্যবাদী শক্তির বশংবদ অলিগার্ক ও কর্পোরেট মিডিয়া সমানতালে সে সব ফ্যাসিবাদী ন্যারেটিভ প্রচার করে জাতিকে স্পষ্টভাবে দ্বিধা বিভক্ত করে ফেলা হয়েছে। এর একপাশে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মপ্রাণ, গণতন্ত্রকামী সাধারন মানুষ, অন্যদিকে ভারতীয় সমর্থনপুষ্ট একটি রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠি, ক্ষমতাধর চক্রের দ্বারা পরিপুষ্ঠ আমলা ও সুবিধাভোগি চক্র। তারা সেক্যুলারিজম ও মুক্তিযযুদ্ধের চেতনার নামে ভারতীয় হিন্দুত্ববাদী বয়ানের দ্বারা এতটাই প্রভাবিত যে, তারা দেশের শতকরা ৯০ ভাগ মুসলমানের ধর্মবিশ্বাস, সাংস্কৃতিক চেতনা ও দেশাত্মবোধকে জঙ্গিবাদি চেতনা, দেশোদ্রোহিতা ও পাকিস্তানপন্থা হিসেবে প্রচার করে আসছে। কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে দাঁড়ি-টুপি, ধর্মীয় লেবাস. নামাজ ও ইসলামি আমল-আক্বিদার উপর অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। শত শত আলেম-ওলামাকে বন্দি ও নির্যাতন করা হয়েছে। গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। যদিও জামায়াত শিবির কোনো নিষিদ্ধ সংগঠন ছিল না, শুধুমাত্র নিয়মিত নামাজ পড়ার কারণে শিবির ট্যাগ লাগিয়ে মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে মেধাবি শিক্ষার্থীদের আহত-নিহত করার অসংখ্য উদাহরণ আছে। বুয়েটের মেধাবি শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা করার মূল কারণ ছিল, সে বাংলাদেশের উপর ভারতের পানি আগ্রাসন ও ফেনী নদীর পানি নিয়ে শেখ হাসিনার আপসের বিরুদ্ধে ফেইসবুকে একটি পোষ্ট দিয়েছিল। একবিংশ শতকে এসে কোনো সভ্য, গণতান্ত্রিক সমাজে শুধুমাত্র প্রতিবেশি দেশের বিরুদ্ধে যৌক্তিক মতামত তুলে ধরার কারণে একটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে মেরে ফেলার এমন নজির বিশ্বের আর কোথাও পাওয়া যাবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটা করে সরকারি দলের ছাত্র সংগঠনের নেতার ধর্ষনের সেঞ্চুরি উদযাপনের ঘটনাও বিশ্বের আর কোথাও পাওয়া যাবে না। এটা শুধু বাংলাদেশে আওয়ামী দু:শাসনেই সম্ভব। সেই বাহাত্তরের পর শেখ মুজিবের সাড়ে তিন বছর, ছিয়ানব্বই সালে শেখ হাসিনার প্রথম ক্ষমতারোহনের ৫ বছর এবং লগি-বৈঠার পৈশাচিকতার মধ্য দিয়ে এক-এগারো সরকারের সাথে ভারতীয় ষড়যন্ত্রে শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদি শাসনের শেষ ১৫ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অভিন্ন বৈষম্য-দু:শাসন ধারাবাহিকতা দেখা যায়। শেখ মুজিব গণতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতা বদলের সব দরোজা বন্ধ করে ১৯৭৫ এর নভেম্বরে সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থানকে অনিবার্য করে তুলেছিলেন। একইভাবে শেখ হাসিনাও ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় এসে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে,পুলিশি শক্তি ব্যবহার করে বিরোধীদলকে মাঠের বাইরে ঠেলে দিয়ে ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক বন্দোবস্ত কায়েম করে দেশের সম্পদ লুন্ঠন ও পাচারের মাধ্যমে দেশকে আবারো তলাবিহিন ঝুড়িতে পরিনত করেছিলেন। এহেন বাস্তবতায় দেশের কোটি কোটি ছাত্র-তরুণ বৈষম্য-দু:শাসন দূর করতে আধিপত্যবাদী শক্তির ক্রীড়নক ফ্যাসিস্টের সব স্টাবলিশমেন্টের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলার কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। চাকরিতে অযৌক্তিক কোটা ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার বিষোদগার ও রাজাকারের বাচ্চা, নাতিপুতি আখ্যা দেয়া ছিল কোটি তরুণের ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলে দেয়ার মত ব্যাপার।
সরকারের অপরাজনীতি, বৈষম্য, দুর্নীতি-দু:শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র-তরুনদের এমন রক্তাক্ত প্রতিরোধ ও আত্মবিসর্জনের এমন নজির সাম্প্রতিক ইতিহাসে বিরল। এর আগে তিউনিসিয়ায় সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈষম্য, পুলিশি নিপীড়ন ও প্রশাসনিক দুর্নীতির শিকার হওয়ার প্রতিবাদে বাওজিজি নামের তেইশ বছরের এক যুবক প্রকাশ্য নিজের গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিলে সারাদেশে প্রতিবাদের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। চব্বিশ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা স্বৈরশাসক জইন এল আবেদিন বেন আলি পদত্যাগ করে সউদি আরবে পালিয়ে যান। তিউনিসিয়ায় গণবিদ্রোহের আগুন পুরো আরব বিশ্বে ছড়িয়ে পড়লে তা আরব স্প্রিং নামে অভিহিত হয়। একে একে সিরিয়া, লিবিয়া, মিশরসহ পুরো আরব বিশ্ব এই গণআন্দোলনে টালমাটাল হয়ে পড়ে। এই আরব স্প্রিংয়ের জুজু দেখিয়ে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে পশ্চিমা দেশকেগুলো সউদি আরব, আমিরাত, কুয়েত, কাতার, বাহরাইনের শাসকদের সাথে হাজার হাজার কোটি ডলার প্রতিরক্ষা চুক্তি করে মার্কিন অর্থনীতিকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। ইরানের পরমাণু ও ক্ষেপনাস্ত্র প্রকল্প, আইএস জুজু দেখিয়ে আরো হাজার হাজার কোটি ডলারের প্রতিরক্ষা চুক্তি করে মধ্যপ্রাচ্যের পেট্টোডলারের রিজার্ভ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব সম্পদে পরিনত করতে থাকে। অবশেষে ইরান যুদ্ধের মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার ফানুস ফুটো হয়ে যায়। তাদের হাজার হাজার কোটি ডলারের প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা ও বিনিয়োগ চুক্তি অসার প্রমানিত হয়। আর ইরানের দেশপ্রেমিক জনগণ বুঝিয়ে দিয়েছে, জনগণের দক্ষতা ও ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের কাছে বিশ্বের যে কোনো পরাশক্তি পরাজিত হতে বাধ্য। ইরানে ইসরাইল-আমেরিকার পরাজয়ের দৃষ্টান্ত স্থাপিত হওয়ার দু’ বছর আগে বাংলাদেশে চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থান বিশ্বের সামনে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে। ছাত্র-জনতার অকুতোভয় আন্দোলনের কাছে স্বৈরশাসকের বাহিনীগুলো সব সময়ই দুবর্ল ও পরাভুত হতে বাধ্য। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা প্রমাণ করেছে, তারা কোনো আধিপত্যবাদী শক্তির তাবেদারি মেনে নিতে প্রস্তুত নয়। ইসলামি মূল্যবোধে বিশ্বাসি বাংলাদেশের যুব সমাজ একটি অসাম্প্রদায়িক, বৈষম্যমুক্ত ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার থেকে কখনো বিচ্ছিন্ন হবে না।
জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে বাংলাদেশ আজ এক নতুন বাস্তবতায় উপনীত। জুলাই বিপ্লবের প্রথম বার্ষিকীতে দেশ একটি অর্ন্তবর্তী সরকারের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছিল। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ভারতীয় হিন্দুত্ববাদীরা শেখ হাসিনার এমন পতন কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি। তারা শেখ হাসিনার রাজনৈতিক পুর্নবাসনের মাধ্যমে ভারতীয় হেজিমনি পুণ:প্রতিষ্ঠার বহুমুখী চাপ, হুমকি ও আগ্রাসী তৎপরতায় ইন্ধন যুগিয়ে চলছিল। তবে সারাবিশ্ব যখন অর্ন্তবর্তী সরকারকে সমর্থন দিয়ে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক নির্বাচনের প্রত্যাশায় হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল, তখন ভারতীয় প্রপাগান্ডা কিছুটা ব্যাকফুটে গিয়ে কৌশল অবলম্বন করলেও আশা করা হচ্ছিল, নির্বাচনের পর হয়তো হেজিমনি এজেন্ডা পরিহার করে স্বাভাবিক প্রতিবেশিসুলভ আচরণ ও কূটনৈতিক বোঝাপড়ায় এগিয়ে আসবে। কিন্তু না, তারা আগের চেয়ে কুৎসিৎ চেহারা নিয়ে হাজির হওয়ার হুমকি ও উস্কানি অব্যাহত রেখেছে। চব্বিশের ৫ আগষ্ট শেখ হাসিনার পতনের পর ভারতীয় মিডিয়া বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও দাঙ্গার উস্কানি দিয়েছিল। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল, সাধারণ মানুষ ও সনাতন ধর্মাবলম্বীরা সেই ফাঁদে পা দেয়নি। অত:পর র’য়ের বিশেষ এজেন্ডায় ইসকন মন্দিরের বহিষ্কৃত নেতা চিন্ময়কৃষ্ণ দাসের নেতৃত্বে কর্মীরা মাঠে নামে। রংপুরে ও চট্টগ্রামে চিন্ময়কৃষ্ণ দাসের দেশবিরোধী বক্তব্য মানুষের মধ্যে ক্ষোভের জন্ম দেয়, চিন্ময়কৃষ্ণ দাস গ্রেফতার হওয়ার পর চট্টগ্রাম আদালত পাড়ায় ইসকন কর্মীরা দাঙ্গা সৃষ্টি করে একজন আইনজীবীকে প্রকাশ্য কুপিয়ে হত্যা করে। তারা নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টির মাধ্যমে আদালতকে চিন্ময়কৃষ্ণ দাসের জামিন মঞ্জুর করাতে বাধ্য করতে চেয়েছিল। জুলাই অভ্যুত্থানের দুই বছর আমরা এখন এক ভিন্ন বাস্তবতায় ভারতীয় হেজিমনি এজেন্ডায় নতুন সাম্প্রদায়িক উস্কানি দেখতে পাচ্ছি। শিলিগুড়ি করিডোরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা যখন বাংলাদেশের রংপুর দখলের হুমকি দিচ্ছে, তখন গাইবান্ধার পলাশবাড়িতে প্রশাসনের অনুমোদন ছাড়াই ৮১ ফুট উচ্চ উপমহাদেশের বৃহত্তম রামমূর্তি স্থাপনের তোড়জোড় দেখা গেল। সেই এলাকাটি কোনো হিন্দু অধ্যুসিত এলাকা নয়, হঠাৎ করে কিভাবে কোন উৎস থেকে এই মূর্তি স্থাপনের পরিকল্পনা এলো! এতবড় রামমূর্তি স্থাপনের কোনো স্থানীয় আয়োজন বা ঘোষণা আগে কখনোই শোনা যায়নি। তবে সনাতন ধর্মে অসংখ্য দেবতা ও অবতারের মধ্যে রামের সাথে হিন্দুত্ববাদ বা বিজেপির অখন্ড ভারত তথা সম্প্রসারণবাদী রাজনৈতিক এজেন্ডা সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। অর্থাৎ পলাশবাড়িতে বিশালাকৃতির রামমূর্তি প্রতিষ্ঠা করে প্রথমে সেখানে সারাদেশ থেকে হিন্দুদের জড়ো করে একটি ভিন্ন আবহ সৃষ্টি করা, উস্কানিমূলক বক্তব্য ও পরিবেশ সৃষ্টি করে রংপুরে ভারতীয় বাহিনীর হস্তক্ষেপের অজুহাত হিসেবে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধানো এবং গুজব ও প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে শিলিগুড়ি করিডোরে ভারতীয় বাহিনীর উপস্থিতি নিশ্চিত করার পরিকল্পনা হিসেবেই পলাশবাড়ি রামমূর্তি প্রকল্প আমদানি করা হয়ে থাকতে পারে বলে সাধারণ মানুষের ধারণা। এটি একটি কৃত্রিম কভার্ট রাজনৈতিক প্রকল্প, এ অঞ্চলের সনাতন ধর্মাবলম্বীরা রামের পুজারি নয়, এর সাথে সনাতন ধর্মাবলম্বিদের ধর্মীয় ভাবাবেগের কোনো সম্পর্ক নেই। যেখানে ভারতে শত শত বছরের মসজিদ-মাদরাসা, খানকাহ বুলডোজারে গুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে, মুসলমানদের ইতিহাস-ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ও স্থানগুলোর নাম বদলে ফেলা হচ্ছে, সেখানে সরকারের অনুমোদন ছাড়াই বাংলাদেশের স্পর্শকাতর এলাকায় রামমন্দির নির্মাণ করে হিন্দুত্ববাদীদের আখড়ায় পরিনত করার প্রকল্প বাস্তবায়নের কোনো সুযোগ নেই।
শুরুতেই বলেছি, বাংলাদেশে রাজনৈতিক অর্থনৈতিক বিভক্তি, বৈষম্য ও পিছিয়ে পড়ার রাজনৈতিক ন্যারেটিভ ভারতের আধিপত্য ও হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডার অংশ। পশ্চিমা ইসলামোফোবিক এজেন্ডা এবং ভারতীয় হেজিমনিক এজেন্ডায় ষড়যন্ত্রমূলকভাবে ক্ষমতায় বসানো হাসিনার ফ্যাসিস্ট রিজিমের একটি প্রতিকী ন্যারেটিভের বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠা ছাত্র-জনতা চব্বিশের জুলাইয়ে দানবীয় ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে রক্তাক্ত বিপ্লবের জন্ম দিয়েছিল। চব্বিশের জুলাইয়ে ছত্রিশ দিনের রক্তাক্ত জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে জাতি আজ অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে ঐক্যবদ্ধ। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার উত্তরণ, রাজনৈতিক- অর্থনৈতিক মুক্তি, স্থিতিশীলতা ও আধিপত্যবাদী শক্তির হুমকি ও উস্কানির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক নেতৃত্বের দৃঢ়তা জাতিকে নতুন সম্ভাবনার পথ দেখাচ্ছে। তবে যে রাজনৈতিক চেতনা ও ন্যারেটিভ জাতিকে বিভক্ত করে, দেশকে আধিপত্যবাদী শক্তির লুন্ঠনক্ষেত্রে পরিনত করে, বর্তমান সরকার কি সে সব ন্যারেটিভের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করতে পেরেছে? ভারতীয় আধিপত্যবাদী এজেন্ডায় সরকারকে স্বৈরাচার ও বশংবদ হতে উদ্বুদ্ধ করতে মিডিয়া ও সাংস্কৃতিক অধিক্ষেত্রের কুশীলবরা এখন আবার আগের মতো সক্রিয় হতে শুরু করেছে। তারা অশ্লীল শব্দ প্রয়োগের মাধ্যমে জুলাইয়ের চেতনা ও জুলাই বিপ্লবের স্মৃতিকে অবজ্ঞা, বিদ্রুপ ও গালি দেয়ার দৌরাত্ম্য দেখাচ্ছে। ভারতীয় স্বার্থ ও হাসিনার ফ্যাসিবাদী রিজিম টিকিয়ে রাখতে কাজ করা সম্মুখসারির সাংবাদিক ও মিডিয়া মালিকদের কেউ কেউ গ্রেফতার হয়ে জেলে আটক হয়েছে। কেউ কেউ আওয়ামী সন্ত্রাসীদের মতো বিদেশে পালিয়ে গেছে। বাকিরা কৌশলগত নিরবতা অবলম্বনের মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করলেও চিহ্নিত কতিপয় নারী শোবিজ কর্মী ও সাংবাদিক জুলাই বিপ্লব নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য দিয়ে দেশে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। দেশের জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন মেহের আফরোজ শাওনের বান্ধবীর পিতা, পিতার বয়েসী লেখককে বিয়ে করে বেশ কয়েক বছর ঘর-সংসার করেছেন। হুমায়ুন আহমেদ ছিলেন হাসিনার ফ্যাসিবাদি রেজিমের বিরোধী। তার মৃত্যুর পর শাওন হাসিনার সেবাদাস সাংস্কৃতিক কর্মীদের দলে যোগদেন। আর মাহিয়া মাহির পরিচয় একজন চলচ্চিত্র অভিনেত্রি, নাকি হাসিনার লেসপেন্সার মন্ত্রী-এমপিদের মনোরঞ্জনকারি, কোনটি বড় তা নিয়ে কিছুটা সংশয় আছে। টাকলা মুরাদ নামে খ্যাত হাসিনার এক মন্ত্রীর এক অডিও বার্তায় তার পরিচয় কিছুটা ফাঁস হয়ে গিয়েছিল। টিভি টকশোর উপস্থাপকরা হাসিনার ফ্যাসিবাদী রিজিমের ন্যারেটিভ প্রতিষ্ঠার পেছনে অন্যতম ভূমিকা পালন করেছিল। সে দলের অন্যতম সদস্য সোমা ইসলাম সম্প্রতি আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। একাধিক উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, তিনি সম্প্রতি এক সপ্তাহের সফরে দিল্লি- কলকাতা ঘুরে এসে বিপুল উদ্যমে জুলাই অভ্যুত্থানবিরোধী প্রপাগান্ডায় নেমে পড়েছেন। এই তিন নারীর একযোগে জুলাই অভ্যুত্থানবিরোধি প্রপাগান্ডায় নেমে পড়া স্বাভাবিক বা কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। দেশে ঘাপটি মেরে থাকা পতিত স্বৈরাচারের দোসর ও ভারতীয় এজেন্ট এডভোকেট চৈতালি চক্রবর্তীরা দিল্লি-কলকাতায় থাকা নিষিদ্ধ সংগঠনের মোস্ট ওয়ান্টেড নেতাদের নির্দেশনায় এই কর্মতৎপরতা শুরু করেছে পতিত স্বৈরাচারের মিডিয়া ও সাংস্কৃতিক অনুচর হিসেবে।
জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে সরকার ও বিরোধিদলের মধ্যে দৃশ্যমান কোনো বড় মতভেদ দেখা যাচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদ ও জুলাই যোদ্ধাদের প্রতি যে দৃঢ় সমর্থন, শ্রদ্ধা ও জাতীয় ঐক্য পুর্নব্যক্ত করেছেন, তা পুরো জাতির প্রতিনিধিত্বশীল ভূমিকা হিসেবেই দেখা যায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমেদ গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বিচার কার্যক্রম শুরুর প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। এসব ঘোষণা জাতিকে কিছুটা আশ্বস্ত করলেও পতিত স্বৈরাচারের ন্যারেটিভ প্রচারের বিরুদ্ধে নমনীয়তা দেখানো হলে তা হবে সরকারের ‘বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরো’র মত। এমনকি বিএনপির সংসদীয় দলে থাকা ফজলুর রহমান ও নিলোফার চৌধুরী মনির বক্তব্য পতিত ফ্যাসিস্টের ন্যারেটিভ প্রচারের নব্য কুশীলব হিসেবে আবির্ভুত হয়েছেন। সরকারের শীর্ষ মহল থেকে এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কোনো সরকারের পক্ষেও সম্ভব নয়। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই বিপ্লবের মতো গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনার প্রকাশ্য বিরোধিতা ও জাতিকে বিভক্ত করে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টকারী, রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতাবিরোধী এমন যেকোনো বক্তব্য যেকোনো মিডিয়ায় প্রকাশের ক্ষেত্রে র্সকারের কঠোর আইনগত অবস্থান দৃশ্যমান হওয়া জরুরি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পরিষ্কার করেছেন, তিনি প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন না। কিন্ত রাষ্ট্র ধ্বংসকারী ও গণহত্যাকারী ও তাদের প্রকাশ্য সমর্থকদের বিরুদ্ধে নাগরিকদের ঐক্য ও নিরাপত্তার জন্য বিচারের প্রক্রিয়াকে সমুন্নোত রাখার দৃঢ় পদক্ষেপ অনিবার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো বিশেষ দল বা গোষ্ঠি নয়, জাতিকে বিভক্ত করার ভারতীয় আধিপত্যবাদী ন্যারেটিভ আমাদের প্রধান প্রতিপক্ষ। এর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতেই হবে। জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা একক কোনো রাজনৈতিক ধারণা নয়। আধিপত্যবাদ বিরোধী নতুন বাংলাদেশের চেতনাকে ধারণ করে। লাখো মানুষের ত্যাগ ও সহস্র প্রাণের বিনিময়ে জুলাইয়ের বিজয় অর্জিত হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এর বিরোধিতা করার কোনো সুযোগ নেই।