গত সপ্তাহের পুরো সময়টা শিক্ষক সমাজের ওপর আক্রমণের মধ্য দিয়ে পার হয়েছে। স্কুল থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত, শিক্ষার সব স্তরেই শিক্ষকরা অপদস্ত, লাঞ্ছিত, এমনকি হত্যার শিকার হয়েছেন। এর প্রতিবাদে সারা দেশের শিক্ষকসমাজ, শিক্ষার্থীসমাজ, সুশীলসমাজ ও সাংস্কৃতিক সংগঠনসহ সর্বস্তরের মানুষ সোচ্চার হয়েছে; দোষী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেছে। একজন শিক্ষক হিসাবে তো বটেই, একজন সাধারণ নাগরিক হিসাবেও এ ধরনের অপকর্মকারীদের যথাযথ শাস্তি দাবি করছি। হয়তো শাস্তি হবে, কিন্তু প্রশ্ন হলো-এটাই সর্বশেষ কিনা। শুধু একজন বা জনাকয়েক অপরাধীকে শাস্তি দিয়ে আমরা নিশ্চিন্ত হতে পারব কিনা। নাকি এ রকম অপরাধী সৃষ্টি হওয়ার মতো অসংখ্য উপাদান আমাদের সমাজে বিরাজ করছে? এগুলো ভাবার মতো সময় এসেছে।





শিক্ষক লাঞ্ছনার বিষয়টি আজকাল মামুলি হয়ে উঠেছে। যে কোনো অজুহাতে তাদের অপদস্ত করার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এর পেছনে সমাজের অসহিষ্ণুতার সংস্কৃতির পাশাপাশি শিক্ষকদের প্রতিপত্তিহীনতাও একটা কারণ। শিক্ষকদের আর্থিক প্রতিপত্তি নেই, রাজনৈতিক প্রতিপত্তি নেই, নেই প্রশাসনিক বা গভর্নিং বডির দাপট। যে সমাজে সবকিছুর বিচার হয় অর্থের মানদণ্ডে, সে সমাজে একজন সাদামাটা শিক্ষকের গুরুত্ব কতখানি থাকতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। শিক্ষকসমাজের এ ভাগ্যবিড়ম্বনা তারা মেনে নিয়েছেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের দুটি ঘটনা শিক্ষকসমাজের বাইরে গিয়ে সমগ্র জাতিকে নাড়িয়ে দিয়েছে। একটি হলো, নড়াইলে কলেজের অধ্যক্ষকে গলায় জুতার মালা পরিয়ে অপমানিত, লাঞ্ছিত করা; দ্বিতীয়টি হলো সাভারে একজন স্কুলশিক্ষককে পিটিয়ে হত্যা করা। শিক্ষাঙ্গনে এ ধরনের অরাজকতা শুধু অনাকাঙ্ক্ষিতই নয়, বিস্ময়করও বটে।

নড়াইলের সদর উপজেলার মির্জাপুর ইউনাইটেড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের গলায় জুতার মালা পরানোর ঘটনা নিয়ে অনেক প্রশ্নের অবতারণা হয়েছে, যেগুলোর কোনো সদুত্তর পাওয়া যাচ্ছে না। ঘটনাটি একজন শিক্ষার্থীর ফেসবুক স্ট্যাটাস নিয়ে উদ্ভূত। সাম্প্রদায়িক স্ট্যাটাস দেওয়া ওই শিক্ষার্থীকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আইনানুগ ব্যবস্থার জন্য পুলিশের হাতে সোপর্দ করেন। ঘটনার এখানেই সমাপ্তি ঘটতে পারত। কিন্তু না, অভিযুক্ত শিক্ষার্থীকে নিয়ে যেতে পুলিশকে বাধা দেওয়া হয়েছে, এর বিপরীতে অধ্যক্ষকে দায়ী করে, মাইকিং করে লোক সমাগম করে গলায় জুতার মালা পরানো হলো। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কারা পুলিশের কাজে বাধা দিল? কারা মাইকিং করে লোক সমাগম করল? কারাই বা জুতার মালা বানাল? আর কারাই বা অধ্যক্ষের গলায় তা পরিয়ে দিল? এসব প্রশ্নের বিপরীতে উল্লিখিত কলেজের একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। ওই শিক্ষক সরকারি দলের একটি ইউনিয়ন সভাপতি। আরও বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, যখন এই অপকাণ্ডটি সংঘটিত হয়, তখন সেখানকার জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারসহ বিপুলসংখ্যক পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল! এতসব প্রশ্নের জবাব স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দু’কথায় সারলেন এই বলে, ‘এই ঘটনায় আমরা সত্যিই দুঃখিত। জেলা প্রশাসক ও পুলিশের কোনো গাফিলতি আছে কিনা, কার কতখানি অবহেলা রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। জনপ্রতিনিধির ভূমিকা কী ছিল, সেটাও দেখা হচ্ছে।’ ঠিক কতখানি খতিয়ে দেখা হবে এবং সেই খতিয়ে দেখার চিত্র আলোর মুখ দেখতে পাবে কিনা তা নিয়ে এক ধরনের সংশয় তো আছেই। কিন্তু দুর্ভাবনার বিষয় হলো, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়া এবং তার প্রতিক্রিয়ায় আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া একটা সাধারণ চর্চার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকেই মনে করেন, সাধারণ মানুষের ভাবনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা এটি। আমরা কত রকম সমস্যার মধ্যে আছি। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীর পণ্যের দাম আকাশচুম্বী, বেকারের সংখ্যা বাড়ছে, পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত সাধারণ মানুষ। কই, এ নিয়ে তো কোনো বাদ-প্রতিবাদ নেই! আসলে যারা ক্ষমতায় আছেন এবং যারা ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর, তারা উভয়েই চান, মানুষ যেন তার ন্যায্য পাওনার দাবিতে সোচ্চার হতে না পারে। তারা চান মানুষ যেন ইহলৌকিক বঞ্চনা ভুলে পারলৌকিক প্রাপ্তির দিকে বেশি মনোযোগী হয়। যে কারণে এতটা উন্মাদনা।

নড়াইলে কলেজের ঘটনাটিতে অধ্যক্ষকে মেরে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল, আর সাভারে শিক্ষককে পুরোদমে মেরে ফেলা হয়েছে। খেলার মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ওই শিক্ষককে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করে ওই স্কুলেরই ১৬ বছর বয়সি এক শিক্ষার্থী, নাম তার জিতু। পত্রপত্রিকার খবর অনুযায়ী, পারিবারিক প্রভাব ও ক্ষমতার ওপর ভর করে জিতু ইদানীং বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল। তার বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত নেই। নিহত শিক্ষক ছিলেন ওই স্কুলের শৃঙ্খলা বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত। স্কুলের গভর্নিং বডির প্রভাবশালীরা জিতুর আত্মীয়। সুতরাং কাউকে পরোয়া করার কথা মনে করেনি জিতু। সরাসরি আঘাত হেনে হত্যা করে তারই শিক্ষককে। এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে সারা দেশের, সর্বস্তরের মানুষ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। সরকারের তরফ থেকে বরাবরের মতোই বলা হয়েছে, দোষী যেই হোক, তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে সরকার বদ্ধপরিকর। আমরাও তাই চাই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এক জিতুর বিচারের মাধ্যমেই এ ধরনের অবাঞ্ছিত ঘটনার পরিসমাপ্তি ঘটবে? নাকি আমাদের সমাজকাঠামোর ভেতর কিংবা শিশুদের গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এমন কিছু দুর্বলতা লুকিয়ে আছে যা প্রতিনিয়ত জিতুদের জন্ম দেবে? প্রাণ যাবে নিরীহ শিক্ষকের? পথে বসবে তাদের পরিবার? এগুলো আন্তরিকভাবে খতিয়ে দেখার সময় এসেছে।

উঠতি প্রজন্মের জন্য আমরা অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারিনি। আর্থিক বৈষম্য আমাদের দুই দিক থেকে আক্রমণ করছে। যেসব পরিবার আর্থিক সংকটের মধ্যে আছে, তাদের সন্তানরা হীনমন্যতায় ভুগছে। তাই প্রচলিত সমাজব্যবস্থার প্রতি বিক্ষুব্ধ হচ্ছে। অন্যদিকে, অতি সচ্ছল পরিবারের সন্তানরা অতিমাত্রায় ভোগবিলাসে জড়িয়ে দরিদ্র সমাজকে, সমাজের মানুষকে উপেক্ষা করে চলেছে। রাষ্ট্র কর্তৃক বিভাজিত সমাজব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। অসম প্রতিযোগিতা আর বিত্তকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা তাদের অসহিষ্ণু করে তুলছে। বেহালার সুর, পাখির গান, নদীর কলতান, সমুদ্রের ঢেউ, পাহাড়ের নির্জনতা-এর কোনোটিই আমাদের সন্তানদের মনে রেখাপাত করে না। আমাদের সন্তানরা ছুটে চলেছে এক অজানা-অচেনা ভবিষ্যতের দিকে, যেখানে যান্ত্রিকতাই শেষ কথা। এর থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার উপায় বের করা প্রয়োজন। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও বিনোদনের ক্ষেত্র প্রসারিত করা প্রয়োজন।

শিশু-কিশোররা কেন অল্প বয়সেই অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তার কিছু কারণ ড. মাহবুব উল্লাহ ব্যাখ্যা করেছেন। তার বক্তব্যের সারকথন তুলে ধরা যেতে পারে-এক. পরিবারের ভেতরকার সমস্যাগুলো সেই পরিবারের সন্তানটিকে প্রভাবিত করতে পারে। যদি দেখা যায় কিশোরটির পিতা-মাতার মধ্যে সুসম্পর্কের অভাব রয়েছে, তাহলে কিশোর সন্তানটি মনস্তাত্ত্বিকভাবে ভঙ্গুর হয়ে উঠবে। কিশোরটি নেতিবাচক চিন্তাভাবনায় আক্রান্ত হতে পারে; দুই. অনেক সময় দেখো যায় পরিবারপ্রধান একটি সন্তানকে অন্য সন্তানের তুলনায় বেশি শাসন করছেন, তাহলে সেই ছেলেটি হয়ে উঠতে পারে দুর্বিনীত ও উচ্ছৃঙ্খল; তিন. অনেক সময় দেখা যায়, মা-বাবা সন্তানের অগ্রহণযোগ্য আচরণের নিন্দা যতখানি কঠোরভাবে করে থাকেন, ভালো কাজের প্রশংসা ততখানি করতে কার্পণ্য করেন; চার. আমাদের দেশে প্যারেন্টিংয়ের বিষয়গুলো অবহেলিত কিংবা সে বিষয়ে আমাদের অজ্ঞতা রয়েছে। শিক্ষিত পরিবারের মা-বাবা সন্তানের সঙ্গে বিরোধ এড়িয়ে চলেন। সন্তানের যে কোনো আবদার বিনা প্রশ্নে রক্ষা করার চেষ্টা করেন। ক্রমশ তা হয়ে ওঠে ব্যয়বহুল। বিনা প্রশ্নে সব আবদার রক্ষা করার ফল নেতিবাচক হতে পারে। তাই কোনো আবদার কেন গ্রহণযোগ্য নয়, তা বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন আছে; পাঁচ. পারিবারিকের বাইরে সামাজিকভাবে আমরা একটি বিভাজনের মধ্যে আছি। আয়বৈষম্য শিশু মনের ওপর দারুণভাবে প্রভাব ফেলে। এ বৈষম্য দূর করার দায় সরকারের।

সার্বিকভাবেই শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষার পরিবেশ এক ভয়াবহ হুমকির মধ্যে পড়েছে। এ থেকে উত্তরণের পথ খুঁজতে হবে আন্তরিকভাবে। সরকারকে এ ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা অর্জন ও উপায় বের করতে হবে। তা না হলে এ ধরনের নির্মম পরিস্থিতি আবারও আমাদের দেখতে হবে।

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews