ঋতুপঞ্জিকাদৃষ্টে পুরোপুরি শীত আসতে আরো অন্তত এক মাস বাকি, কিন্তু শীতের এবার আগাম আমেজ। উত্তর-দক্ষিণ মিলিয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ইতোমধ্যে শীত পড়া শুরু হয়েছে। তেমনি জাতীয় নির্বাচনের আরো ১৫ মাস বাকি থাকলেও দেশের রাজনীতিতেও এবার একটু আগেভাগেই কথাবার্তা ও তৎপরতায় ভোটের ভাব।

আগামী ডিসেম্বর মাসকে ঘিরে রাজনীতিতে টান টান উত্তেজনা দেখা দিচ্ছে দেশে। নির্দ্বিধায় বলা যায়- পরিবেশ-পরিস্থিতি ঘোলাটে হবে।

বাঙালির গর্বের মাস ডিসেম্বর। অথচ এই গৌরবের মাসটিকে ঘিরেই রাজনীতিতে চলছে আতঙ্কের আগাম বার্তা। ‘বাঙালির গর্ব আর বিজয়ের মাস ডিসেম্বর এ মাসে বিএনপিকে রাস্তায় নামতে দেয়া হবে না’-এমন ঘোষণা ক্ষমতাসীনদের। বিএনপি ‘বাড়াবাড়ি’ করলে তাদের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে আবার জেলে পাঠিয়ে দেবেন বলে সাফ জানিয়েছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই সাথে আবারো জানিয়েছেন- কোন বিবেচনায় তিনি, খালেদা জিয়ার বোন ও ভাইয়ের আবেদনে মানবিক দয়া করে তার শাস্তি বন্ধ রেখে বাসায় থাকার ব্যবস্থা করেছিলেন। এই মানবতার বিপরীতে বিএনপি এখন সরকারকে ‘ধমকায়’। পালানোর পথ মিলবে না বলে প্রধানমন্ত্রীকে শাসায়। তাই বিএনপির এই ‘বাড়াবাড়ি’ তিনি আর সহ্য না করার বার্তা দিয়েছেন যদিও এর আগে আইনমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, নির্বাচনের আগ পর্যন্ত খালেদা জিয়াকে আর জেলে নেবে না সরকার।

এ দিকে আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ হিসেবে বিএনপিও পাল্টা হুঙ্কার দিচ্ছে। তারা এক দফা দাবি দিয়ে সরকার পতনের লক্ষ্য নিয়ে দেশের বিভিন্ন বিভাগে সমাবেশ করে যাচ্ছে। তাদের একটিই কথা,এ সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে তারা যাবে না। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে অনড়। বিভাগীয় সমাবেশ করার পর ১০ ডিসেম্বর ঢাকায় গণসমাবেশের কর্মসূচি রয়েছে বিএনপির। দলটির এক নেতা বলেছেন, ১০ ডিসেম্বরের পর দেশ চলবে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ও তারেক রহমানের কথায়। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মামলা আদালতে নয়, রাজপথে সমাধান করবে, এমনকি আগামী নির্বাচনে তিনি অংশ নেবেন মর্মে রাজনৈতিক ঘোষণা দিয়েছেন তার এক আইনজীবী। আদালত প্রাঙ্গণে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, খালেদা জিয়ার অংশগ্রহণ ছাড়া আগামী জাতীয় নির্বাচন হবে না, হতে দেয়া হবে না। অবশ্য টানা প্রায় ১৪ বছর ব্যাকফুটে পড়ে থাকা দলটির সাম্প্রতিক তৎপরতার মধ্যে নানা মাত্রা যোগ হয়েছে। বিভিন্ন বিভাগে তারা বড় জমায়েতের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মনোবলে চিড় ধরানোর কৌশল নিয়েছে। একইসাথে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা হ্রাস পেয়েছে বলে দেশ-বিদেশে প্রমাণ করতে চাইছে। এ জন্য আওয়ামী লীগও রাজপথে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং তির্যক কথার অবিরাম তীর ছুড়ছে, দেখিয়ে দেয়ার কড়া হুমকিসহ ‘খেলা হবে’ মর্মে হুঙ্কার দিচ্ছে। কঠিন-সঙ্গীন এ সময়টিকে আওয়ামী লীগ বা সরকারই বা কেন খেলার জন্য পছন্দ করেছে? কোন সুখের জেরে? নাকি ভয়ে? জিতবে কারা? -এর চেয়ে গুরুতর প্রশ্ন-কী খেলা হবে? তাস, লুডু, ছক্কা-পাঞ্জা? খেলবে কারা কারা? কতগুলো পক্ষ থাকবে ওই খেলায়? উদ্ভট-উৎকট এসব বাগাড়ম্বরের মধ্যে দেশ বা জনগণের ন্যূনতম স্বার্থ কি আছে? বা থাকতে পারে?

কথাচ্ছলে বলা হয়, রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। আবার রাজনীতিকে কৌশলের খেলাও বলা হয়। তার ওপর বলা হচ্ছে, খেলা হবে-সামনে আরো খেলা আছে। সবই কি আসলে কথার কথা? নাকি অন্য কিছু?

বিশ্বময় রাজনীতিতে এখন শেষ কথার সাইরেন বাজছে। গুণগত মান বদলে যাচ্ছে। ব্রিটেনে গত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে দু’বার প্রধানমন্ত্রী বদল হলো। বরিস জনসন আস্থা ভোটে হেরে গেলে লিজ ট্রাস প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন। তিনি পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে তিন সপ্তাহের মধ্যে পদত্যাগ করেন। এর পর আসেন ঋষি সুনাক। তিনি দায়িত্ব নিয়েই অর্থনীতি ধ্বংসের জন্য পূর্বসূরির সমালোচনা করেননি। আগেরবার যারা তার প্রধানমন্ত্রী হতে বাধা দিয়েছিলেন, তাদের নিয়ে একটি নেতিবাচক কথাও বলেননি। কিংবা বক্তৃতা দিতে উঠেই বিরোধী দলের মুণ্ডুপাত করেননি। কেবল বলেছেন, এই জাতীয় সঙ্কট নিরসনে আমাদের সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।

আমাদের এখানে চিত্রটা একদম বিপরীত। কথার তেজে, টিপ্পনীতে অসৌজন্যমূলক হুইসেল বাজানো মোটেই রাজনীতির পাঠ-পঠন হতে পারে না। দেশে এখন ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা প্রতিদিন মাঠে থাকছেন। বিএনপির সিরিজ কর্মসূচিও চলছে। লাশ পড়ছে বিভিন্ন জায়গায়। তা খেলারই অংশ কি না, প্রশ্ন সামনে আসছে স্বাভাবিকভাবেই। তবে স্পষ্ট জবাব নেই। হাডুডু, লুডু, কানামাছি, গোল্লাছুট; ক্রিকেট-ফুটবল নানা ধাঁচে উত্তেজনাময় রাজনীতি। ভোলা, মুন্সীগঞ্জ, ফেনী, নোয়াখালী, খুলনা, মাগুরা, যশোর, রাজধানীর বনানীসহ কয়েক জায়গায় রণক্ষেত্র হয়েছে।

সামনে যে আলামত বোঝা যাচ্ছে, তাতে ক্ষমতাসীন দল ও বিএনপির সংঘর্ষ হলে নতুন করে মামলা-মোকদ্দমা মিলিয়ে সামনে এ খেলা কোথায় গড়াবে এখনই নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না। এ খেলার রেফারি-আম্পায়ার মাঠে না মাঠের বাইরে তাও স্পষ্ট নয়। সাইডলাইনেও ধোঁয়াশা। খেলার এই ময়দানে জামায়াতে ইসলামী বিএনপি জোটে আর নেই ঘোষণার পর নতুন নামে নিবন্ধন পাওয়ার আবেদন ও ফিরে আসার চেষ্টা। এগুলো খেলার অংশ হলে নিশ্চিন্তে থাকা যায় না। বরাবরই জাতীয় নির্বাচনের আগে রাজনীতিতে ভাঙাগড়া ও নানা মেরুকরণের খেলা হয়। পর্দার আড়ালের খেলাও জমজমাট হয়। এবার নির্বাচনের এক বছর আগেই সেই জম্পেশ খেলার আভাস। দল ও জোট গঠনের পাশাপাশি ভাঙনের বাদ্যও বাজছে। জাতীয় পার্টিতে তা বেশি সুরেলা। বিদেশী কূটনীতিকদের মিশনও জোরদার। দেশের সীমানার বাইরে চলছে তাৎপর্যপূর্ণ তৎপরতা। গুঞ্জন ডালপালা মেলছে। তার ওপর চলমান বিশ্ব উত্তেজনার মধ্যে খেলছে সব দেশই। ভয়ের বার্তা সেখানেও। মন্দের ভালো হিসেবেও এ ভয় অমূলক হোক।

১০ ডিসেম্বরের আগে কি দেশে কোনো নির্বাচন আছে? অথবা বিএনপির আন্দোলনে কি এমন কোনো সাফল্য এসেছে যে, সরকারকে বিদায় নিতে হবে? দৃশ্যত তেমন কোনো আলামত নেই। তবে দল দু’টির মধ্যে ডিসেম্বরে খেলা হবে, মানে উত্তেজনাকর কিছু হবে- সেই বার্তা পরিষ্কার।

কথার কথা, মেঠো কথা- যা-ই হোক এ ধরনের হুমকি-ধমকিমূলক কথা নানান প্রশ্নের সাথে উত্তেজনাও তৈরি করছে দেশের জনমনে।

এমনিতেই সময়টা ভালো যাচ্ছে না। সরকারপ্রধান থেকেই দুর্ভিক্ষের শঙ্কা জানা যাচ্ছে বারবার। নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য মারাত্মক পর্যায়ে। বিদ্যুতের নাজুক পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক গোলমাল, সামাজিক অস্থিরতাসহ মানুষ ভীষণ যন্ত্রণায়। দেশ নানা ঝুঁকি-ঝক্কিতে। তালগোল আরো অনেকদিকেই। পরিস্থিতি সামলাতে গিয়ে হিমশিম অবস্থা সরকারের। নানান তবে-কিন্তু-যদিযুক্ত ব্যাখ্যা থাকলেও এসব তথ্য নিয়ে দ্বিমতের কিছু নেই।

এমন সময়ে বিএনপি উল্লসিত। তারা কি এমন কিছুই চেয়েছিল? এমন কিছুর অপেক্ষা করেছিল? নাকি তাদের আন্দোলনের কোনো সাফল্যেই দেশে এ অবস্থা তৈরি হয়েছে?

কিছুদিন আগেও সমাবেশ দূরে থাক, বাসাবাড়িতেও থাকতে না পারা বিএনপি এখন সারা দেশে বিশাল বিশাল সমাবেশ করছে। এসব কর্মসূচিতে সরকার বাধা দিচ্ছে বলে অভিযোগ বহালই আছে। শক্তি প্রদর্শনের বাহাদুরিটা ক্ষেত্রবিশেষে অতিমাত্রায় চলে যাচ্ছে। এর মধ্য দিয়েই সরকার ও মাঠের বিরোধী দল মানুষকে তাদের শক্তি দেখাতে চাইছে। সরকারি দল ব্যবহার করছে তার রাষ্ট্র ও প্রশাসনিক শক্তিকে। বিএনপি শক্তির জানান দিচ্ছে সরকারি বাধা ডিঙিয়ে সমাবেশ ঘটিয়ে। শক্তির এ জানান দেয়াটা আরো ভিন্নদিকে না গড়ালেই রক্ষা। সরকারের এই আগ্রাসী আচরণ নতুন নয়। রাস্তাঘাট বন্ধ, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়ার দুর্গন্ধময় ইতিহাস বাঙালির ললাটের লিখনের মতো। না তখন, না এখন; সরকারগুলো এতে কখনো বিচলিত হয় না। কেবল কৌশল নেয়, যা কখনো সমাদর পায় না। সমালোচনাই নিশ্চিত হয়। এর পরও ক্ষমতায় পৌঁছলে সবাই ভুলে যায়। আগের সরকার যে কর্মে তিরস্কৃত হয়েছে, সেই কর্ম তারাও করেন। বোধ-বিবেচনা কাজে লাগান না। হালে জল, স্থল ও অন্তরীক্ষে আওয়ামী লীগের প্রচণ্ড দাপটের মধ্যে বিএনপি সমাবেশ ডেকে সহিংসতা করবে, এ কথা কেউ বিশ্বাস করে না। কিন্তু সরকারের আচরণে, ভয় অথবা বিরোধী দলকে দাবড়িয়ে নিজেদের হিম্মত দেখানোর বাতিক ভর করেছে।

পরিশেষে, বর্তমান সময়ে দেশের রাজনীতির পরিবেশ শুধুই তিক্ততার দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। এর সাথে যোগ হয়েছে বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের পারদ। আবার কেউ কেউ কৌশলকে পাশ কাটিয়ে প্রতারণাকে রাজনীতিতে টেনে এনেছে। রাজনীতিতে প্রতিপক্ষকে ঘায়েলের এই চেষ্টা বেশ কয়েক বছর ধরেই দেখছে দেশের সাধারণ মানুষ।

ফলে রাজনীতি যে, রাজার নীতি, সেটি হারিয়ে গেছে। এখন চলছে রাজনীতির নামে বাকযুদ্ধ, মিথ্যাচার, আশার বাণী আর হুঙ্কার। গণতন্ত্রের প্রতি যাদের শ্রদ্ধাবোধ, সম্মানবোধ, দায়িত্ববোধ থাকে তারা এসব আচরণ আর খেলাধুলার হুমকি দিতে পারে না। বর্তমানে দেশে কোটি কোটি মানুষ দরিদ্রতার সাথে যুদ্ধ করছে, দিন দিন মধ্যবিত্ত হয়ে যাচ্ছে নিম্নবিত্ত; ক্ষুধা-যন্ত্রণা, শোষণ-বঞ্চনা, সমাজ-সভ্যতা নিয়ে কারো কোনো কথা নেই। দেশে চলছে শুধু রাজনৈতিক খিস্তিখেউর। চলছে ভোট- রাজনীতি, সিংহাসন-রাজা রাজনিয়মের আদিখ্যেতা।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews