সকালের সূর্য দেখিয়া মনে হয়—নিখিল আকাশে ভানু তাহার তেজদীপ্ত প্রভা কখনই হারাইবে না। কখনই দুপুর আসিবে না। সন্ধ্যাও নামিবে না। আসিবে না অমারজনীও। কিন্তু জাগতিক নিয়মে সকল কিছুই আসে একে-একে। জগতের সকল কিছুই রূপকাকারে প্রকাশ করা যায়। আমরাও সেই অর্থে দিনশেষে উপলব্ধি করিতে পারি—আমাদের দেখিবার কেহ নাই। একটি সরকার সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত করিবার অন্যতম শর্ত হইল সরকারটি যতটা সম্ভব ছোট আকারে হওয়া। উন্নয়নশীল বিশ্বে দেখা যায় যে, প্রথম দিকে সকল সরকারই বলিতে চাহে যে, তাহাদের সরকার অবশ্যই ছোট আকারে হইবে। কিন্তু দিন যত যায় ক্রমশ দেখা যায় সেই সরকার অস্বাভাবিকভাবে বিস্তৃত হইয়া গিয়াছে। ইহা আসলে একধরনের আইওয়াশ—ধোঁকা। কিন্তু আর কত? এই ধোঁকার ক্ষেত্রে একটি বিষয় সামনে চলিয়া আসে, তাহা হইল ভোট তথা নির্বাচন। তবে ভোটের ব্যাপারে সাধারণ মানুষের কোনো আগ্রহও নাই, আবার অনীহাও নাই। তাহার কারণও অনেক।

আমরা দেখিয়াছি কয়েক দশক পর পর বিশ্বে অপ্রত্যাশিতভাবে অর্থনৈতিক অস্হিরতার প্রবল ঝড় আসে। সেই ঝড়ে বৃহত্ রাষ্ট্রগুলি ভিতরে ভিতরে কাঁপিতে থাকে, অথচ প্রথম দিকে অর্থাত্ সকালবেলায় উন্নয়নশীল বিশ্বের অনেক সাধারণ রাষ্ট্রই উহাকে আমলে লয় না। তাহারা একধরনের আত্মতৃপ্তিতে ভুগিতে থাকে। উন্নয়নশীল বিশ্বের সাধারণ জনগণ উপলব্ধি করিতে পারে যে, সরকার আসে সরকার যায়, কিন্তু গরিব জনগণ আরো গরিব হয় এবং ধনীরা আরো ধনী হয়। আমরা দেখিয়াছি, গত ৫১ বত্সরে হাজার হাজার নব্য লুটেরা তৈরি হইয়াছে। পরাধীনকালে এই জনপদে কয়েক জন মাত্র বিদেশি লুণ্ঠনকারী ছিলেন, কিন্তু এখন শত-শত স্বদেশি লুণ্ঠনকারী সৃষ্টি হইয়াছেন। দেখা যাইতেছে, প্রায় প্রতিটি খাতে এক বা দুই ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে বাজার নিয়ন্ত্রিত হইতেছে। ফলে বাজার ব্যবস্হায় কোনো প্রতিযোগিতা থাকিতেছে না। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওয়েলথ এক্স-এর তৈরি প্রতিবেদনে ইতিপূর্বে জানা গিয়াছে—ধনী মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির হিসাবে সকল দেশের উপরে অবস্হান করিতেছে বাংলাদেশ। ইহাদের সংখ্যা বাড়িয়াছে ১৭.৩ শতাংশ হারে।

তাহা হইলে সাধারণ জনগণের ভালোভাবে বাঁচিবার উপায় কী? বিশ্বে শোষিত নিপীড়িত মানুষের জন্য অনেক ধরনের অর্থনৈতিক তত্ত্ব আসিয়াছে। আমরা মার্কসবাদের পরিণতি দেখিয়াছি। ‘ডাস ক্যাপিটাল’ গ্রম্হটি গত ১৫০ বত্সর ধরিয়া পৃথিবীকে প্রবলভাবে প্রভাবিত করিয়াছিল বটে, কিন্তু আমরা দেখিয়াছি ঐ গ্রম্হ কেবল শ্রমকেই মূল্য উত্পাদনের একমাত্র উত্স হিসাবে দেখিয়াছিল। সম্পদের অন্যান্য উত্স, যেমন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ইত্যাদিকে আমলেই লওয়া হয় নাই। ছত্রে ছত্রে ইহার অসংগতি ব্যবহারিক ক্ষেত্রে আরো অনেক বেশি। অর্থনীতির গত ১৫০ বত্সর ধরিয়া বিশ্বব্যাপী ক্ষেত্রে যতগুলি পরীক্ষানিরীক্ষা করা হইতেছে, বিবিধ ব্যর্থতার পর এখন বলা চলে—অর্থনীতির সবচাইতে গ্রহণযোগ্য বিষয়টি হইল—ইকু্যয়াল অপরচুনিটি। অর্থাত্ সকলের জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করা। এই সূত্রটাই বর্তমান সময়ে সবচাইতে গ্রহণযোগ্য সূত্র হইলেও ইহার অনুপস্হিতি উন্নয়নশীল বিশ্বে অনেক বেশি পরিলক্ষিত হয়। এই জন্য জনগণের মনে প্রশ্ন জাগে, উন্নয়নশীল বিশ্বে যাহাদের লুটেরা বলা হইতেছে, যাহারা লুট করিতেছে, তাহাদের লুটপাট কে বন্ধ করিবে? কাহারা প্রতিহত করিবে লুটপাটকারীদের? আর এই ক্ষেত্রেই আসে আত্মোপলব্ধির—যাহার কথা কয়েক হাজার বত্সর পূর্বে মহামতি সক্রেটিস বলিয়া গিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন—‘টু নো দাইসেলফ ইজ দ্য বিগিনিং অব উইজডম।’ সত্যিকার অর্থে, নিজেকে জানিবার মধ্য দিয়াই প্রকৃত জ্ঞানার্জন শুরু হয়। এই জন্য আমাদের মরমি সাধক হাছন রাজা বলিয়া গিয়াছেন—বিচার করি চাইয়া দেখি, সকলেই আমি।’ লালন ফকির আরো সহজ করিয়া বলিয়াছেন—‘আমি কী তাই জানলে সাধনসিদ্ধ হয়।’

এখন, সকালবেলার সূর্য যখন সন্ধ্যাকালে অস্ত যাইবে, তখন যদি দিবাকর প্রশ্ন তোলে—কে থাকিবে তাহার সঙ্গে? তখন দেখা যাইবে, সকলেই নিরুত্তর। কিন্তু মাটির প্রদীপ তাহার সামান্য দীপশিখা তুলিয়া ধরিয়া বলিবে—আমি আছি। আমি আছি তোমার সঙ্গে। যদিও মধ্যগগনকালে এই মাটির প্রদীপকে পাত্তাই দেয় নাই মহান দিবাকর। 



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews