১৯৯৩ সালে বলিউডের অ্যান্টিহিরো হিসেবে শাহ্রুখ খানের উত্থান যে গল্পের সূচনা করেছিল, তিন দশক পর তা রূপ নিয়েছে ভয়াবহ এক বাস্তবতায় রুপান্তরিত হয়েছে: আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ভারত হিন্দুত্ববাদী শাসন প্রকল্পের রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশকে টিটোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বহিষ্কার কোনো ক্রীড়াগত বিরোধ নয়; এটি একটি সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী শাসকদলের স্বাভাবিক আচরণ, যারা এখন বিশ্বব্যাপী খেলাধুলাকে রাজনৈতিক দমননীতির অংশ হিসেবে বিবেচনা করে।
গত ২ জানুয়ারি ভারতের শাসক দল বিজেপির নেতা সংগীত সোম প্রকাশ্যে ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় মুসলিম ব্যক্তিত্ব শাহরুখ খানকে দেশদ্রোহী আখ্যা দিয়ে বলেন, তার বেঁচে থাকার অধিকার নেই। এর কারণ ছিল তার আইপিএল দল কলকাতা নাইট রাইডার্সেও জন্য বাংলাদেশের ক্রিকেটার মুস্তাফিজুর রহমানকে নির্বাচন। হুমকি ছড়িয়ে পড়ে শুধু শাহরুখ নয়, মুস্তাফিজকে ঘিরেও।
এটি কোনো বিচ্ছিন্ন উন্মাদনা ছিল না; বরং পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনী প্রচারণায় মুসলিমবিদ্বেষী বিজেপির চেনা কৌশলেরই অংশ, যেখানে মুসলমানদের নিয়মিতভাবে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। এরপর আসে আরও ভয়ংকর মোড়। খেলোয়াড় বা খেলাটির মর্যাদা রক্ষার বদলে বিসিসিআই গোপনে হস্তক্ষেপ করে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে অস্পষ্ট কারণ দেখিয়ে কেকেআরকে মুস্তাফিজকে দল থেকে ছাড়িয়ে দিতে অনুরোধ করে।
পরে, সাংবাদিকদের অনুসন্ধানে প্রকাশ পায় যে, কোনো আলোচনা, নথি বা প্রক্রিয়া ছাড়াই সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছিল। একজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বিসিসিআই কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, ‘আমরা নিজেরাই মিডিয়ার মাধ্যমে এটি সম্পর্কে জানতে পেরেছি। কোনও আলোচনা হয়নি। আমাদের পক্ষ থেকে কোনও পরামর্শ নেওয়া হয়নি।’
ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের ছেলে জয় শাহ আইসিসির সভাপতিত্ব করায়, নিরপেক্ষতার প্রহসন আরও তীব্রতর হয়ে ওঠে, যখন বাংলাদেশের ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন যে, যদি একজন বাংলাদেশী ক্রিকেটার ভারতে খেলতে না পারে, তাহলে পুরো বাংলাদেশ দল নিরাপদ বোধ করতে পারে না, তখন আইসিসি উদ্বেগের সাথে নয়, বরং শাস্তি দিয়ে প্রতিক্রিয়া জানায়, বাংলাদেশকে সম্পূর্ণরূপে বহিষ্কার করে।
পিসিবি চেয়ারম্যান মহসিন নকভি একে যথার্থভাবেই দ্বৈত মানদ-’ ও ‘অবিচার’ বলে অভিহিত করেন। এবং পাকিস্তানের টুর্নামেন্ট বর্জনের সিদ্ধান্তের পরই আইসিসির সুর নরম হয়. যা প্রমাণ করে যে, নীতির চেয়ে অর্থই ক্রিকেট শাসকদের চালিকাশক্তি। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সুশান্ত সিং সতর্ক করে বলেন, ‘মুস্তাফিজের ঘটনা শেষ নয়; সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনীতির বেদিতে আরও খেলোয়াড় বলি হবে।’
ক্রিকেটের অর্থনীতি ও শাসনে ভারতের দমবন্ধ করা নিয়ন্ত্রণ হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিকে খেলাটির ভেতর সম্পূর্ণভাবে ঢুকতে দিয়েছে। এখন, ভক্ত বা খেলোয়াড়দের জন্য আর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় না, ভোটারদের সন্তুষ্ট করার জন্য নেওয়া হয়। জবাবদিহিতা না এলে ক্রিকেটের নৈতিক পতন অব্যাহত থাকবে। একটি বৈশ্বিক খেলাকে জিম্মি করে রাখবে সংকীর্ণ, কর্তৃত্ববাদী মতাদর্শ। প্রবীণ সাংবাদিক শারদা উগ্রা বলেন, ‘আইসিসিতে আর কোনো পরিণত, যোগ্য নেতৃত্ব নেই।’