এক রাজনৈতিক নেতা দীর্ঘক্ষণ ধরে বক্তব্য দিচ্ছেন। ‘জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে’ ‘সমাজের এই অন্ধকার ক্ষণে’ ‘অবক্ষয়ের এই যুগে’—এই জাতীয় কথাবার্তা। দৃশ্যটা দেখে পাশ দিয়ে যাওয়া ভদ্রলোক সমাবেশের এক শ্রোতাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আচ্ছা, উনি কতক্ষণ ধরে বলছেন?’

‘তা ঘণ্টাখানেক হবে।’

‘মূল বক্তব্যটা কী?’

‘সেটা তিনি এখনো পরিষ্কার করেননি।’

রসিকতা। কিন্তু রাজনীতিকদের বোঝাতে এর চেয়ে সত্য কথা আর হয় না। তাঁরা কথা ঘোরান। প্যাঁচান। তারপর যা বলেন সেটা এমন জিলাপির আকার নেয় যে জট সাধারণত খোলা যায় না।

এতকালের এই যে রাজনৈতিক বক্তব্যের ধরন, এটা বাংলাদেশে পাল্টে যাচ্ছে ইদানীং। এখন এমন তাজ্জব সময় এসে গেছে যে কেউ বোধ হয় আর রাখঢাকের দরকার দেখছে না। তাই নিজ দলের দুই মেয়রের লেগে গেছে সরাসরি। আরেকজন বড় নেতার ভাই এমন সব বলছেন যে ভিডিওটা পুরো দেখার পর আবার রিওয়াইন্ড করলাম, ভুল দেখলাম নাতো! এই বাংলাদেশে অনেক কিছু বদলে গিয়ে অদ্ভুত আকার নিয়েছে। একসময় গৃহপালিত বিরোধী দল নিয়ে আমরা অনেক তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেছি। তখন ভাবিনি এমনও সময় আসবে যে ‘নকল’ বিরোধী দল দেখা যাবে।

যাই হোক, রাজনীতিতে সরকারি দলের এমন প্রকাশ্য গোলাবর্ষণে নতুনত্ব আছে; কিন্তু অভ্যন্তরীণ কোন্দল ব্যাপারটা খুবই পুরনো। একটা গল্প বলি। একজন জাতীয় নেতা নিজের অঞ্চলে দুটি উপদলকে সমানতালে পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। ঢাকায় হয়তো কোনো একটা গ্রুপের নেতারা তাঁর সঙ্গে দেখা করলেন, তিনি তাঁদের পরামর্শ দিলেন। ঠিক তার পরই অন্য গ্রুপকে ফোন করে আরেকটা পরামর্শ। দুই গ্রুপে মারামারি হতো। মামলা-মোকদ্দমা। তারপর দুই গ্রুপই আবার বিচারের জন্য আসে তাঁর কাছে। ছোট এলাকায় এমন ব্যাপার বেশিদিন আড়ালে থাকে না। জানাজানি হয়ে গেল যে নেতা দুই পক্ষকেই প্রশ্রয় দিচ্ছেন। ওরা হতবুদ্ধি। তিনি সবারই নেতা, কেন আলাদাভাবে দুই পক্ষকে পোষেন! একদিন ধরা হলো সর্বজনশ্রদ্ধেয় নেতাকে। নেতা বিব্রত হওয়ার বদলে বরং হাসতে শুরু করলেন, ‘অভ্যন্তরীণ কোন্দল থাকা ভালো। দলের মধ্যে দুই গ্রুপ থাকলে এদের মধ্যে একটা লড়াই থাকে। এক পক্ষ একটা মিছিল করলে অন্য পক্ষের চেষ্টা থাকে এর চেয়েও বড় মিছিল করার। দল আলোচনায় থাকে।’

‘কিন্তু এতে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হব না?’

‘মারামারি-খুনাখুনি না করলে সমস্যা নেই। শোনো, ঐক্যবদ্ধ থাকতে হয় শুধু নির্বাচনের সময়। বাকি সময় কয়েক পক্ষ থাকলেও অসুবিধা নেই।’

চতুর শ্রেণির একজন উপনেতা বললেন, ‘কিন্তু এখন কী হবে নেতা? আমরা তো জেনে গেলাম যে সবই ছিল পাতানো।’

নেতা চুল পাকা প্রাজ্ঞ মানুষ। এবারও হাসলেন, ‘এখনো অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব থাকবে। এক পক্ষ বলবে, নেতা কী বুদ্ধিমান, কী কুশলী! আরেক পক্ষ বলবে, নেতা প্রতারক। তাই না!’

ঠিক সে রকম কিছু অবশ্য হয়নি। দুই পক্ষই নেতার সঙ্গে ছিল। অভ্যন্তরীণ কোন্দলের অভাব দেখে নেতা হাহাকার করে ছিলেন কি না জানি না। যেমন এ-ও জানি না এবারের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের যে ছবি আমরা দেখছি সেটাও তেমনি নিয়ন্ত্রিত কি না!

নিয়ন্ত্রিত ও পাতানো অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব খুব স্বাভাবিক চিত্র নয়। এটা কোনো নেতার বিচ্ছিন্ন ভাবনা হতে পারে। কিন্তু এটা প্রতিষ্ঠিত একটা ভাবনা যে জুতসই বিরোধী দল না থাকলে দলের ভেতরে এমন বিভক্তি খুব স্বাভাবিক। প্রথমত, আমাদের সমাজবাস্তবতাই এমন যে বিরোধিতার জন্য এই দেশ খুব উর্বর জায়গা। যেকোনো ক্ষেত্রে দেখবেন কোনো কিছুর পক্ষে বেশিক্ষণ বলা যায় না, মানে কেউ তেমন শুনতে চায় না। কিন্তু বিরুদ্ধে বললে, কারো বদনাম করলে সঙ্গে সঙ্গে অনেক শ্রোতা। আড্ডা-আলোচনা জমজমাট হয়। এমন সুবিধাজনক ক্ষেত্রে বিরোধী রাজনীতির শূন্যতা সম্ভব নয়। বিরোধী দল জায়গা ছেড়ে দিলে কাউকে না কাউকে তো সেটা নিতে হবে। বিএনপি যথার্থ বিরোধী হওয়ার শক্তি হারিয়েছে, জাতীয় পার্টির বিরোধিতায় কৃত্রিমতা। আওয়ামী লীগের ভেতরের বিরোধীরাই বরং এই শূন্যতা পূরণের জন্য যোগ্য। সুবিধাও আছে। সবাই সরকারি দল করা লোক বলে প্রশাসনের একরকম প্রশ্রয় পাওয়া যায়। ওপরের নেতাদের নানা সমীকরণ থাকে বলে তাঁদের কোনো না কোনো অংশের আশীর্বাদ চলে আসে।

আরেকটা অভিজ্ঞতার গল্প। একটা কলেজে নির্বাচন হবে। ভিপি-জিএস পদে তীব্র লড়াই। আশি-নব্বইয়ের দশকে ছাত্রসংগঠনগুলোতে নেপথ্যে কিছু তাত্ত্বিক ধরনের নেতা থাকতেন। তেমন ইমেজ নেই বলে ভোটে দাঁড়াতেন না; কিন্তু রাজনীতির ছক ভালো বোঝার কারণে কৌশল তৈরিতে খুব মর্যাদা ছিল। তেমনি এক তাত্ত্বিক নির্বাচনের আগে আফসোস শুরু করলেন, ‘ল্যান্ডস্লাইড হবে রে। এ তো মহাসমস্যা।’

নিজের দলের সম্ভাব্য নিরঙ্কুশ জয়ে সমস্যা আবার কী! লোকটা নির্ঘাত রসিকতা করছে। সবাই হাসল। একজন হাসতে হাসতে বলল, ‘শোনাও দেখি তোমার সমস্যাটা, শুনে আরেকটু হাসি।’

‘হাসির কথা না। আসলেই সমস্যা। সিরিয়াস সমস্যা।’ তাঁর মুখে চিন্তার রেখা।

‘সিরিয়াস সমস্যাটা শুনি।’

‘আমরা সব পোস্ট জিতে গেলে দেখবি কমিটি মিটিংয়ে আলোচনায় আমরাই দুই পক্ষ হয়ে যাব। এ একটা মত দেবে, আরেকজন বলবে অন্য রকম করো। এই নিয়ে শুরুতে তর্ক-বিতর্ক হবে। তারপর এক পক্ষ ধরে নেবে ওদের কথা শোনা হচ্ছে না। ধীরে ধীরে ভাগ হবে। বিরাট সমস্যা। দেখ না, বিরোধী দলকে দু-একটা পদ ছেড়ে দেওয়া যায় কি না।’

‘তাতে লাভ কী?’

‘তখন তারা কিছু বললেই আমরা সবাই তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ব। তাদের বিরোধিতা করতে গিয়ে আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকব।’

‘না, তুমি বেশি তাত্ত্বিক’ বলে আলোচনা শেষ করে ভিপিপ্রার্থী ঘোষণা করলেন, ‘সব জিততে হবে। ওদের একটাও পদ দেওয়া যাবে না।’

দল সব কটা পদে জিতল। ফুল গলায় দেওয়া, নতুন দিন আনার ঘোষণা—এ রকম মধুচন্দ্রিমা চলল খুব। ধীরে ধীরে সামান্য বিরোধ। অচিরেই এমন অবস্থা হলো ভিপি ঘোষণা করলেন, জিএসকে তিনি কান ধরে ওঠবস করাবেন গার্লস হোস্টেলের সামনে। জিএস বললেন, ‘ভিপি মানে তো সহসভাপতি, আমি প্রমাণ করে দেব আমাদের এই ভিপির মানে হচ্ছে শয়তানের সহকারী।’

ঠিক তখন ছোট্ট একটা ঘটনা ঘটল। একদিন রাতের বেলা তাদের নেতার পোস্টার কে বা কারা যেন ছিঁড়ে ফেলল। আর যায় কোথায়? ভোরবেলা থেকেই উত্তেজনা। বিরাট সমাবেশ করল ভিপির দল। জিএসের দল তার চেয়েও বড়। আগের বিরোধ ছাপিয়ে সেই দিন দুই পক্ষের গলাতেই বিরোধী দলকে তুলাধোনা করার আওয়াজ। কিছুক্ষণ পর দুই পক্ষের সমাবেশ এক হয়ে গেল।

কেউ কেউ বলল, সেই তাত্ত্বিক নেতা পেছন থেকে এই কাণ্ডটা করিয়েছিলেন যেন প্রমাণিত হয় বিরোধী দলের প্রয়োজনীয়তা আছে। অভিযোগটা ঠিক কি না প্রমাণিত হয়নি, তবে এটা বোধ হয় প্রমাণিত হয়, বিরোধী দল আসলে ক্ষমতাসীন পক্ষেরও দরকার। ওদের দমন করার স্বার্থে হলেও তো নিজেদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হয়। বিরোধীরা ‘প্রয়োজনীয় শয়তান’ আর সেই ‘শয়তান’কে সরকারেরও দরকার।

তা সেই ‘শয়তানে’র অভাবেই নিজেদের মধ্যে হানাহানির এমন সব অনাসৃষ্টি কি না সে গবেষণা বিজ্ঞ নেতা, অভিজ্ঞ বিশ্লেষকরা করবেন। আমরা বরং একটু রসিকতাই করি।

বক্তৃতা দিয়ে শুরু করেছিলাম। বক্তৃতার গল্পেই শেষ হোক। এক নেতা বক্তৃতা দিতে গিয়ে দেখলেন, সবাই চলে গেলেও একজন মানুষ রয়ে গেছে। খুব মনোযোগ দিয়ে তাঁর কথা শুনছে। তিনি বক্তৃতা শেষ করে কৃতজ্ঞতা জানাতে তার কাছে গেলেন। ‘আপনাকে ধন্যবাদ’ ‘আমি কৃতজ্ঞ’—এসব বলতে গিয়ে দেখেন সেই মানুষটার এগুলোতে কোনো উৎসাহ নেই। বরং তিনি ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছেন বক্তৃতা মঞ্চের দিকে। নেতা প্রথমে ভেবেছিলেন, মাইক কম্পানির লোক বোধ হয়। কিন্তু মানুষটা মঞ্চে উঠে বললেন, ‘আমি আসলে এই অনুষ্ঠানের শেষ বক্তা। আমি আপনার বক্তব্যটা শুনলাম। এখন যদি দয়া করে আপনি আমারটা শোনেন। অবশ্য না শুনলেও সমস্যা নেই। আমার খালি মাঠেও বক্তৃতা করার অভ্যাস আছে।’

মাঝেমধ্যে মনে হয়, রাজনীতির নানা খেলায় আমাদের নেতারা মানুষকে এমন বিরক্ত করে দিচ্ছেন, কে জানে হয়তো সেদিন দূরে নয় যেদিন বক্তৃতা শোনার লোক মিলবে না। খালি মাঠেই গর্জাতে হবে।

লেখক : সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews