মিয়ানমারে যে ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়েছে, তার বিধ্বংসী শক্তি ছিল ৩৩৪টি পরমাণু বোমার সমান। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতত্ত্ববিদ জেস ফনিক্স সিএনএনকে জানিয়েছেন এ তথ্য। আগামী আরো অন্তত দু’মাস মিয়ানমার ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে থাকবে বলে সতর্কবার্তাও দিয়েছেন এই ভূতত্ত্ববিদ।



Printed Edition
  • ভূমিকম্পের শক্তি ছিল ৩৩৪টি পরমাণু বোমার সমান
  • থাইল্যান্ডে ধসে পড়া ভবনের নিচে প্রাণের চিহ্ন

মিয়ানমারে আঘাত হানা ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের এক মডেলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পেজার নামের এই স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাপনা ভূমিকম্পে হতাহতের সংখ্যা ও অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি সম্বন্ধে অনুমান করে। এই অনুমানের জন্য কম্পিউটার ভিত্তিক এই মডেল যেসব তথ্য-উপাত্তকে বিবেচনায় নেয় তার মধ্যে কম্পনের তীব্রতা এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার জনসংখ্যাও আছে। তবে পেজার ভূমিধস, ভূমিকম্পজনিত মাটির তরলীকরণ ও সুনামির মতো ভূমিকম্প পরবর্তী ক্ষয়ক্ষতিকে বিবেচনায় নেয় না, বলছে বিবিসি।

ইউএসজিএসের এ মডেল মৃতের সংখ্যা ১০ হাজারের বেশি হবে বলে আশঙ্কা করলেও এখন পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ৬৯৪ এবং আহত ১ হাজার ৬৭০ বলে জানিয়েছে মিয়ানমারের কর্তৃপক্ষ। বিবিসির সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পের পর মান্দালয়ে শনিবার সকাল পর্যন্ত একাধিক মৃদু কম্পন অনুভূত হয়েছে। আতঙ্কে শহরটির অনেক বাসিন্দাই খোলা আকাশের নিচে রাত কাটিয়েছেন। মিয়ানমারের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মান্দালয়ে প্রায় ১৫ লাখ বাসিন্দার বাস।

শনিবার সকাল পর্যন্ত মিয়ানমারের বৃহত্তম দুই শহর ইয়াংগন ও মান্দালয়ে বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সেবা ফেরেনি। “বিদ্যুৎ ছাড়া আমরা আমাদের ফোনে চার্জ দিতে পারছি না। তাই দূরে থাকা পরিবারের সদস্যদের সাথে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ না থাকলে ইন্টারনেটও ব্যবহার করতে পারছি না আমরা,” বলেছেন মান্দালয়ের এক বাসিন্দা।

মিয়ানমারে গত শুক্রবার ভয়াবহ ভূমিকম্পে এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। মৃতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়াতে পারে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস)। ভয়াবহ এ ভূমিকম্পের পর মিয়ানমারে দেখা দিয়েছে মানবিক বিপর্যয়। অনেক মানুষ এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে আছেন, বাঁচার জন্য সেখান থেকেই কাঁদছেন তারা। কিন্তু তাদের উদ্ধার করতে কোনো ভারী যন্ত্রপাতি আসেনি। এজন্য খালি হাতেই চলছে উদ্ধারের চেষ্টা। যদিও এর মাধ্যমে সবাইকে বাঁচানো সম্ভব হচ্ছে না।

ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মিয়ানমারের দ্বিতীয় বৃহৎ শহর মান্দালয়। সেখান থেকেই এমন নির্মম তথ্য তুলে এনেছে বার্তাসংস্থা রয়টার্স। হেতেত মিন নামে ২৫ বছর বয়সী এক যুবক রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ভূমিকম্পের পর তার ওপর একটি দেয়াল ভেঙে পড়ে। এতে তার অর্ধেক শরীর চাপা পড়ে যায়। তবে তিনি বেঁচে যান। কিন্তু ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে আছে তার দাদি ও দুই চাচা। তিনি হাত দিয়েই ধ্বংসস্তূপ সরানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তিনি ব্যর্থ হন। “ধ্বংসস্তূপের পরিমাণ অনেক বেশি। কিন্তু কোনো উদ্ধারকারী দল আমাদের এখানে আসেনি।” এসব বলতে বলতে কেঁদে দেন হেতেত মিন। মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলো জানিয়েছে, মিয়ানমারে ভূমিকম্পটি আঘাত হেনেছে খারাপ সময়ে। দেশটি গৃহযুদ্ধের কারণে এমনিতেই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এরমধ্যেই ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ল তারা।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর শিলা ম্যাথিউ এক বিবৃতিতে বলেন, “শক্তিশালী ভূমিকম্পটি সবচেয়ে খারাপ সময়ে মিয়ানমারে আঘাত হেনেছে। তারা আরেকটি বিপর্যয়ের ভার বহন করতে পারবে না।”

আন্তর্জাতিক উদ্ধার কমিটির মিয়ানমার পরিচালক মোহাম্মদ রিয়াস বলেছেন, “পুরো দেশের মানুষ ‘ব্যাপক সহিংসতায়’ বিপর্যস্ত। গৃহযুদ্ধ, কলেরা ও অন্যান্য রোগের প্রাদুর্ভাবে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা (আগেই) শোচনীয় হয়ে পড়ে। ভূমিকম্প এখন এটির ওপর আরো প্রভাব ফেলবে।”

যেসব অঞ্চল ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেখানে সক্রিয় কোনো সরকারই নেই বলে জানিয়েছেন ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের মিয়ানমার একাডেমিক নই নই কয়ো। তিনি আরো জানিয়েছেন, মিয়ানমারের জান্তা তরুণদের জোরপূর্বক সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করেছে। এতে বেশির ভাগ অঞ্চলেই তরুণরা নেই, যা উদ্ধারকাজকে ব্যাহত করছে। তিনি বলেছেন, যদি তরুণরা তাদের নিজ অঞ্চলে থাকতো তাহলে উদ্ধার অভিযানে সবার আগে তারা এগিয়ে আসত। অন্যদের জড়ো করত। কিন্তু এখন এগুলোর কিছুই হচ্ছে না। মিয়ানমারের জান্তার সাথে উদ্ধার অভিযানের ব্যাপারে যোগাযোগ করেছিল রয়টার্স। তবে তারা কোনো উত্তর দেয়নি। অপর দিকে জান্তা বিরোধী সরকার ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট জানিয়েছে, আক্রান্ত এলাকায় তারা তাদের যোদ্ধাদের মোতায়েন করবে।

ভূমিকম্পের শক্তি ছিল ৩৩৪টি পরমাণু বোমার সমান : মিয়ানমারে যে ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়েছে, তার বিধ্বংসী শক্তি ছিল ৩৩৪টি পরমাণু বোমার সমান। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতত্ত্ববিদ জেস ফনিক্স সিএনএনকে জানিয়েছেন এ তথ্য। সিএনএনকে ফনিক্স বলেন, “মিয়ানমারের ভূমিকম্প যে পরিমাণ শক্তি নির্গত করেছে, তা প্রায় ৩৩৪টি পরমাণু বোমার সমান।” আগামী আরো অন্তত দু’মাস মিয়ানমার ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে থাকবে বলে সতর্কবার্তাও দিয়েছেন এই ভূতত্ত্ববিদ। তিনি বলেছেন, “ইন্ডিয়ান টেকটোনিক প্লেট এবং ইউরেশিয়ান টেকটোনিক প্লেটের ওপর মিয়ানমারের অবস্থান। এ দু’টি প্লেটের স্থানান্তরের কারণেই ভূমিকম্প হয়েছে। এই স্থানান্তর আরো দুই মাস পর্যন্ত চলবে; এ কারণে আগামী দু’মাস ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে থাকবে মিয়ানমার।”

থাইল্যান্ডে ধসে পড়া ভবনের নিচে প্রাণের চিহ্ন : থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে শক্তিশালী ভূমিকম্পে ধসে পড়া ৩০ তলা ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে ১৫ জনের জীবনের চিহ্ন শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের জীবিত উদ্ধারে প্রাণান্ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা। শনিবার ব্যাংকক দমকল ও উদ্ধার বিভাগের পরিচালক সুরিয়ান রাভিওয়ান জানান, এই দুর্ঘটনায় অন্তত আটজন নিহত হয়েছেন এবং ৪৭ জন নিখোঁজ রয়েছেন। ব্যাংকক পোস্ট জানায়, নিখোঁজদের পরিচয় এখনো নিশ্চিত করা যায়নি। সুরিয়ান জানান, ৩০ তলা নির্মাণাধীন ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে ১৫ জনের অস্তিত্ব শনাক্ত করা হয়েছে। উদ্ধারকারী দল ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে তাদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা চালাচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, উদ্ধারের জন্য ৭২ ঘণ্টা সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। কারণ দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকলে ও পানিশূন্যতার কারণে ভুক্তভোগীরা শকে চলে যেতে পারেন। তবে আমরা ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই উদ্ধার অভিযান শেষ করার চেষ্টা করছি।

তবে এখন পর্যন্ত আটকে পড়া লোকদের কাছে পানি বা খাদ্য পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। কারণ তারা ধ্বংসস্তূপের প্রায় তিন মিটার গভীরে রয়েছেন। এ দিকে ব্যাংককের গভর্নর চাদচার্ট সিত্তিপুন্ত শনিবার সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তিনি জানান, উদ্ধারকাজ সহজ করতে ক্রেন ট্রাক ব্যবহার করে ধ্বংসস্তূপের কংক্রিটের অংশগুলো সরানো হচ্ছে। এ ছাড়া নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যাংকক মহানগর প্রশাসন ১৩০ জন স্বেচ্ছাসেবী প্রকৌশলী মোতায়েন করেছে।

শুক্রবার মিয়ানমারে সৃষ্টি শক্তিশালী ভূমিকম্পের প্রভাবে ব্যাংককে তীব্র কম্পন অনুভূত হয়। এর ফলে বহু মানুষ আতঙ্কে খোলা স্থানে আশ্রয় নেন। শুক্রবার রাতে ৩০০-এর বেশি মানুষ ব্যাংককের পার্কগুলোতে রাত কাটিয়েছেন। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে এসব পার্ক আরো এক রাত খোলা রাখা হবে বলে জানিয়েছেন গভর্নর।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews