‘করোনা ভাইরাস সংক্রমণের শুরু থেকে আমাদের গ্রামে ভিলেজ ডেভেলপমেন্ট টিম ও আমার ছাত্ররাসহ সবাই মিলে নিয়মিত হাত ধোয়ার বিষয়টি আমরা নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছি। এরপর আমরা গ্রামের কয়েকটা পয়েন্টে নিজেদের উদ্যোগে হাত ধোয়ার জায়গা তৈরি করেছি। গত বছর থেকে সুতি কাপড়ের মাস্ক ব্যবহার,সাধারণ মাস্ক ব্যবহার নিশ্চিত করেছি সবাই মিলে। ফলে আশেপাশের গ্রামের চেয়ে আমাদের গ্রামের মানুষেরা আগে অভ্যস্ত হয়েছে। শুরু থেকে জীবাণুনাশক ছড়ানো হয়েছে নিয়মিত। একইসঙ্গে ত্রাণ সামগ্রী দেওয়ার জন্য যে জায়গাগুলো নির্ধারণ করা হয়েছে,সেসব স্থানে মানুষজন সামাজিক-শারীরিক দূরত্ব মেনে চলেছেন। অন্য গ্রামের চেয়ে এই মেনে চলা আগে থেকে শুরু করেছেন এবং তা অব্যাহত আছে। এক্ষেত্রে গ্রামবাসী, স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকাও অগ্রগণ্য ভূমিকা রেখেছে’ —বলছিলেন টাঙ্গাইলের যমুনা তীরবর্তী গ্রাম শাখারিয়ার মুক্তিযোদ্ধা নয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আঞ্জ আনোয়ারা পারভীন।

আঞ্জ আনোয়ারা পারভীন জানান, এই গ্রামে দি হাঙ্গার প্রজেক্ট বাংলাদেশের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত উজ্জীবক প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া মানুষেরা মিলে গ্রামের জন্য ইতিবাচক ভবিষ্যৎ নির্মাণে সক্রিয় রয়েছেন। তাদেরই উদ্যোগে গ্রামে গড়ে ওঠে ‘গ্রাম উন্নয়ন দল’। বিভিন্ন শ্রেণি পেশার প্রতিনিধিদের নিয়ে গড়ে ওঠা এই দল ইতোমধ্যে গ্রামের তরুণ ও অতি দরিদ্রদের সংগঠিত করেছে। তারা স্থানীয় সমস্যা স্থানীয়ভাবে সমাধানের উপায় খুঁজে ও সমাধানে উদ্যোগ নেয়।

টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার হেমনগর ইউনিয়নের এই শাখারিয়া গ্রামের মতো  স্থানীয় জনগণকে সংগঠিত করে এবং সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে প্রায় ১,২০০টি গ্রামে করোনা সহিষ্ণু পরিবেশ গড়ে তুলতে কাজ শুরু হয়েছে গত বছরের মার্চ থেকে। দি হাঙ্গার প্রজেক্টের ডেপুটি ডিরেক্টর জমিরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, সারাদেশের মধ্যে বর্তমানে মেহেরপুর, নওগাঁ, বরিশাল, ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ, টাঙ্গাইল, কুমিল্লাসহ বিভিন্ন জেলায় এ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ১২শতাধিক গ্রামে করোনা সহিষ্ণু পরিবেশ গড়ে তুলতে কাজ করছেন প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবীরা।

এ বিষয়ে দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-এর গ্লোবাল ভাইস প্রেসিডেন্ট ও কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. বদিউল আলম মজুমদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘পরিস্থিতি বলছে করোনা ভাইরাস সঙ্কট এখনই কাটছে না। সহসাই এই সংকট থেকে মুক্তি মিলবে বলে মনে হচ্ছে না। আবার ভ্যাকসিনের বিষয়টিও এখন সারাবিশ্বে সমভাবে নিশ্চিত হয়নি। রূপান্তর ঘটছে করোনা ভাইরাসের উপসর্গেও। সেক্ষেত্রে আমাদের করোনাসহনীয় জীবনে অভ্যস্ত হতে হবে। আর সে বিবেচনা করেই করোনা সহিষ্ণু গ্রামের বিষয়টি নিয়ে আমরা কাজ করছি।’

এই কার্যক্রমে সফলতা কেমন—এ প্রসঙ্গে ব্যাখ্যা করেন দি হাঙ্গার প্রজেক্টের ডেপুটি ডিরেক্টর জমিরুল ইসলাম। বুধবার (৭ এপ্রিল) সন্ধ্যায় বাংলা ট্রিবিউনের কাছে তার মন্তব্য, ‘আমরা ৪১ টি ইউনিয়নের ৭৯ টি স্পটে প্রায় সাত হাজার মানুষের মধ্যে সার্ভে করেছি। এতে দেখা গেছে, যেসকল গ্রামে আমাদের প্রচারণা, জনসচেতনতা চালিয়েছি, সেসব স্থানে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে অন্তত ৬১ শতাংশ মাস্ক পরছেন। আর যেসব স্থানে আমাদের প্রচারণা হয়নি, সেসব এলাকায় এর পরিমাণ ৩১ শতাংশ।’

জমিরুল ইসলাম জানান, সাধারণ দরিদ্র মানুষকে স্বেচ্ছাসেবীরা টিকা গ্রহণের ক্ষেত্রেও সহযোগিতা করেছেন। অনলাইনে নিবন্ধন, করোনা পরীক্ষা করার উপায়সহ নানাভাবে সাধারণ জনগণ যুক্ত হয়েছেন এই প্রচেষ্টায়।

করোনা সহিষ্ণু করতে গ্রামগুলোতে তিন ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান জমিরুল ইসলাম। এগুলো হচ্ছে, প্রথমত, গ্রামবাসীকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য সচেতন করা। এজন্য প্রচারপত্র বিতরণ, পোস্টার, স্টিকার, হ্যান্ড মাইকে প্রচার চালানো, অনলাইনে প্রচারণা চালানো। নিরাপদ থাকার জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে মাস্ক, হ্যান্ড গ্লাভস বিতরণ, জীবাণুনাশক স্প্রে করা এবং পদ্ধতি মেনে হাত ধোয়ার অনুশীলন করা। দ্বিতীয়ত, যারা ইতোমধ্যে সংক্রমিত হয়েছেন বা সন্দেহভাজন,তাদের চিহ্নিত করে স্বাস্থ্যসেবা দানকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া এবং বিচ্ছিন্ন করে রাখার ব্যবস্থা করা। তৃতীয়ত, সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে আর্থিকভাবে অসহায় হয়ে পড়া পরিবারগুলোকে মানবিক সহায়তা প্রদান। সরকারি সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে সহায়তা এবং স্থানীয় উদ্যোগে অর্থ সংগ্রহ করে সহায়তা প্রদান।

জমিরুল ইসলাম বলেন,‘শাখারিয়া গ্রামের মতোই সারা দেশে স্বেচ্ছাব্রতীদের উদ্যোগের ফলে ইতোমধ্যে সহস্রাধিক গ্রামে করোনা সহিষ্ণু গ্রাম গড়ার সামাজিক আন্দোলন পরিচালিত হচ্ছে। এসব গ্রামে গ্রাম উন্নয়ন দল,অতি-দরিদ্রদের সংগঠন, তরুণদের সংগঠন গড়ে উঠেছে। সংগঠিত স্বেচ্ছাব্রতীরা প্রচারাভিযান পরিচালনার মাধ্যমে সচেতনতা সৃষ্টি করছে। আক্রান্ত ও ঝুঁকিপূর্ণদের চিহ্নিত ও চিকিৎসা বা আইসোলেশনের ব্যবস্থা করছে। সরকারি সহায়তার আওতায় যাতে সঠিক লোকেরা আসে তার জন্য স্থানীয় সরকারের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। আমরা যেসব এলাকায় কাজ করছি, সেসব এলাকায় করোনার কেস কম পেয়েছি, মৃত্যুহার কম পেয়েছি।’

প্রসঙ্গত, করোনা সহিষ্ণু গ্রাম নিয়ে অভিজ্ঞতা বিনিময় লক্ষ্যে বৃহস্পতিবার সকালে একটি অনলাইন আলোচনা রয়েছে। এতে পরিকল্পনা মন্ত্রী আবদুল মান্নান, এমপি আলোচনা আলোচনা করবেন। এছাড়া, জনস্বাস্থ্য ও স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা বক্তব্য রাখবেন।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews