দৃশ্যটি অতিচেনা। এক দল লোক অস্ত্র-লাঠি হাতে নিরস্ত্র আরেক দল মানুষকে ধাওয়া দিচ্ছে; পেটাচ্ছে; রক্তাক্ত করছে। কয়েকজনে মিলে রক্তাক্ত কাউকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাচ্ছে। প্রায়ই সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন স্থির কিংবা চলচ্চিত্র দেখা যায়। শনিবার এমন দৃশ্য দেখা গেল ফেনীতে, ধর্ষণ ও নিপীড়নবিরোধী লংমার্চে। 'ক্ষমতাবানদের' হামলায় ধর্ষণ ও নিপীড়নবিরোধী গণজাগরণ তৈরির জন্য রাস্তায় নামা বেশ কয়েকজন তরুণ-তরুণী রক্তাক্ত হয়েছেন।

শুক্রবার শাহবাগ থেকে 'ধর্ষণ ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ' ব্যানার নিয়ে লংমার্চটি শুরু হয়েছিল। গন্তব্য নোয়াখালী। এ জেলারই বেগমগঞ্জ উপজেলায় নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতন ও ভিডিওচিত্র ধারণের ঘটনা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর সারাদেশে নিন্দার ঝড় বইছে। এ ঘটনায় পুলিশ বাহিনী 'দুঃখিত ও লজ্জিত' বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীও এ নিয়ে কথা বলেছেন। এ ঘটনার পর ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। তাহলে ধর্ষণবিরোধী নিরীহ কর্মসূচিতে হামলা কেন?

আরও বড় প্রশ্ন, কারা হামলা করেছে? লংমার্চকারীরা বলছেন, ফেনীর ছাত্রলীগ-যুবলীগের লোকজন হামলা করেছে। পুলিশও তাদের সহায়তা করেছে বলে তারা অভিযোগ করেছেন। কী লাভ তাদের? কার পক্ষ নিলেন তারা? স্পষ্টতই তারা ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনকারীদের পক্ষ নিয়েছেন।

এই হামলার মাধ্যমে হামলাকারীরা বার্তা দিলেন- নিপীড়কের বিরুদ্ধে কিছু বলতে চাইলে তারা তা এই কায়দায় 'দমন' করবেন। তাদের এ হামলা নিপীড়নবিরোধীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ানোরও অপচেষ্টা, যাতে নিপীড়নের প্রতিবাদও কেউ করতে না পারে। তাই নগদ লাভ নিপীড়কদের। লাভ পিতৃতন্ত্রের- যে তন্ত্র নারীদের দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষ হিসেবে স্থান দিয়েছে।

এমনিতেই আমাদের দেশে ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন মহামারি আকারে বেড়ে চলছে। তার ওপর প্রতিবাদী মুখও যদি বন্ধ করে দেওয়া যায়, তাহলে পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে? একটু পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে ভয়াবহতার খণ্ডচিত্র চোখে পড়তে পারে। খোদ পুলিশের তথ্যমতে, ২০১৯ সালে পাঁচ হাজার ৪০০ নারী ও ৮১৫টি শিশু ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হয়েছে। আগের বছর ২০১৮ সালে শিশু ধর্ষণের মামলা ছিল ৭২৭টি। আর নারী ধর্ষণের মামলা ছিল তিন হাজার ৯০০টি।

মানবাধিকার বিষয়ক বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের ২০১৯ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশে ধর্ষণের ঘটনা আগের চেয়ে দ্বিগুণ বেড়েছে। ২০১৮ সালে সারাদেশে ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ছিল ৭৩২টি। ২০১৯ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় এক হাজার ৪১৩। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের ২০১৯ সালের প্রতিবেদন বলছে, প্রতি মাসে গড়ে ৮৪টি শিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। এক বছরে যৌন নির্যাতন বেড়েছে ৭০ শতাংশ।

সারাদেশে, মূলত হাসপাতালগুলোতে প্রতিষ্ঠিত, ৭৮টি ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টার ও সেলে ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত পাঁচ হাজার ২০৫ জন যৌন সহিংসতার শিকার নারী ও শিশু সেবা নিয়েছে। এর মধ্যে মামলা হয়েছে তিন হাজার ৭৬৩টিতে। এ সময়ে হওয়া ৩০২টি মামলার মধ্যে সাজা হয়েছে ১৮টিতে। সম্প্রতি সহযোগী একটি দৈনিকে প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে, ধর্ষণের বা যৌন হয়রানির মামলার মাত্র ৩ শতাংশ ক্ষেত্রে বিচার হয়।

তবে বিষয়টি এত সরল হওয়ার কথা নয় যে শুধু নিপীড়ক ও পিতৃতন্ত্রের পক্ষ নিয়েই তারা অস্ত্র ধরেছে। নিঃসন্দেহে এই হামলা থেকে নিপীড়করা উৎসাহ পাবে। তারপরও আরও কিছু হিসাব আছে- রাজনীতির, ক্ষমতার।

'বেনিফিট অব ডাউট' দিয়ে বলা যেতে পারে এটি 'অতি উৎসাহীদের' হামলা। এর মধ্য দিয়ে তারা রাজনীতিতে ঊর্ধ্বতনদের নজরে আসতে চেয়েছেন। ভবিষ্যতে 'ভালো' কোনো পদ পাওয়ার রাস্তা তৈরি করতে চেয়েছেন। আমাদের দেশে তো এমনই হয়। উদাহরণ তো নেহাত কম নেই। আমরা পছন্দ করি বা না করি- এভাবে হামলা-মামলার মধ্য দিয়ে 'উপরে' উঠে আসাকেই তো রাজনৈতিক সংস্কৃতি হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে।

অন্যভাবেও ভাবা যায়। আন্দোলন যে একটা আগুন, সেই আগুনকেই হয়তো ভয় তাদের। নিপীড়নবিরোধী আন্দোলনের আগুন যদি অন্যান্য ক্ষেত্রেও ছড়িয়ে পড়ে? তাই আগেভাগেই সব 'অঙ্গার' বানানোর অপচেষ্টা। তাতে আখেরে আর কে বা কারা লাভবান হলো, ভাববার দরকার কী? বর্তমানে নিজের লাভটুকু থাকলেই হলো!

তা ছাড়া সরকারপ্রধান যেখানে ধর্ষণবিরোধী অবস্থান দেখিয়েছেন, সেখানে এ ধরনের হামলা সরল সমীকরণ না হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। আবার এমনও তো নয় যে, তারা পিতৃতান্ত্রিক সমাজকে লালন করে না। নারীদের দমিয়ে রাখার সমাজব্যবস্থা তো তারাই টিকিয়ে রেখেছে। তাই ধর্ষক, নিপীড়ক, পিতৃতন্ত্র লাভবান হলে তাদের ক্ষতি নেই।

তার পরও বলতে হবে- দেশকে, সমাজকে এগিয়ে নিতে হলে ধর্ষক-নিপীড়কদের পাশাপাশি এই হামলাকারী ও তাদের পক্ষ অবলম্বনকারীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। সেই রব তোলা বাদ দেওয়া যাবে না। বাদ দিলে তা নিপীড়কদের প্রশ্রয় দেওয়াই হবে।

এক অর্থে এ হামলায় লাভ আন্দোলনকারীদেরও আছে। তাদের রক্ত ঝরেছে ঠিকই; কিন্তু তাদের দাবি যে ন্যায্য, তা স্পষ্ট হয়েছে। আরও কতদিকে যে তাদের নজর দিতে হবে, তা-ও তারা দেখতে পেয়েছেন। সমাজের নিপীড়কদের বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করতে গিয়ে তারা রাষ্ট্র ও রাজনীতির দেখা পেয়েছেন। তাদের এই দেখাটা যদি দেখার মতো হয়, তবে সমাধানের পথটা বের করতে পারবেন সহজেই। বাস্তবায়নের পথটা হয়তো বন্ধুর ও বিপৎসংকুল হবে। হওয়াই স্বাভাবিক। তাতে থেমে যাওয়ার অবকাশ নেই। এগিয়ে যেতেই হবে। মাভৈঃ!

সাংবাদিক



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews