১৯৯০-এর দশকে বাংলাদেশে যে আর্থিক সংস্কার হয়েছিল, তার একটি তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব পড়েছিল কৃষিক্ষেত্রে। তিন দশক পেরিয়ে এসে করোনা সমস্যা আমাদের কৃষির কথা পুনরায় ভাবতে বাধ্য করল। করোনার ধাক্কায় দেশে যে আর্থিক মন্দা সৃষ্টি হলো, তার প্রভাববলয়ের বাইরে থাকল শুধু কৃষিক্ষেত্র। মানুষ যখন শহরের কারখানা, দোকান, নির্মাণস্থল ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানে যাওয়া বন্ধ করতে বাধ্য হলো, তখন কম আয়ের শহুরে মানুষ গ্রামে ছুটতে লাগল। প্রবাসে চাকরি হারিয়েও এক দল মানুষ গ্রামের দিকে ছুটল। গ্রাম মানে বিনা ভাড়ায় ঘর পাওয়া। কেননা, পৈতৃক ভিটায় তাদের যেমন-তেমন হলেও একটি ঘর আছে। গ্রাম মানেই কৃষির সুযোগ, সবজি বাগানের হাতছানি। সংকটের সময় গ্রামের কৃষিশিল্পই হয়ে উঠল সামাজিক একটি নিশ্চিত সুরক্ষা জাল।

আধুনিক বাজার অর্থনীতি ব্যবস্থায় সংকটের ধাক্কা গরিব মানুষকে যেন এক পলকে বুঝিয়ে দিল, কৃষি তার জন্য কতটা নির্ভরতার জায়গা। কেননা, সংকটের সময় তার হাতে যথেষ্ট জমানো টাকা ছিল না। তারা চাকরি হারাল, কাজ হারাল, আয় হারাল। পৃথিবীর যেসব দেশ অর্থনীতির বাজার ব্যবস্থার পথে হাঁটছে, বিপদের সময়ে তাদের সাহায্য করার জন্য একটি মজবুত সামাজিক সুরক্ষার নিশ্চিত পরিকাঠামো বিদ্যমান। সংকটের সময় বিপন্ন জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়ায় এই সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা। কিন্তু আমাদের দেশে এমন সামাজিক সুরক্ষা গড়ে ওঠেনি। তারপরও বাজারনির্ভর অর্থনীতির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল আমাদের সমাজ। এই করোনা সংকট আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, আমাদের মতো দেশের অর্থব্যবস্থায় তেমন কোনো সামাজিক সুরক্ষার পরিকাঠামো নেই। পাকাপোক্ত রাষ্ট্রীয় সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা যেহেতু আমাদের দেশে অনুপস্থিত, তাই আমাদের দেশের শহুরে দরিদ্র মানুষ নির্ভর করে গোষ্ঠীভিত্তিক নিরাপত্তার ওপর। শহরে খেটে খাওয়া মানুষ, যারা ছোটখাটো চাকরি করেন, তাদের একটা বিরাট অংশের এখন গ্রামের সঙ্গে সম্পর্ক আরও নিবিড় হয়েছে। গরিব মানুষের কাছে এ সম্পর্কটাই তাদের সামাজিক নিরাপত্তা। তারা নিশ্চিতভাবে জানেন, শহরে বিপদে পড়লে গ্রাম তাদের বাঁচাবে। হঠাৎ তাদের শহরের উপার্জন বন্ধ হয়ে গেলে গ্রামের কৃষি এবং সংশ্নিষ্ট ক্ষেত্র তাদের রক্ষা করবে- এই বিশ্বাসটাই তাদের সামাজিক সুরক্ষার জায়গা। যেসব মানুষের গ্রামের সঙ্গে পারিবারিক সূত্র ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল, এবারের সংকটকালে তাদের শহরে আর্থিক বিপদ হলে বাঁচার একমাত্র পথ ছিল অসংগঠিত খুচরা বিপণন; ফুটপাতে দোকান নিয়ে বসা। তবে গরিবের সুরক্ষার এই খাতটিও ভালো অবস্থায় নেই আজ আমাদের দেশে। গ্রামের অনেক পরিবারই কৃষি থেকে বেরিয়ে অন্য কাজে নিযুক্ত। কৃষি হয়ে উঠেছে অনেক বেশি পুঁজি ও প্রযুক্তিনির্ভর। তারপরও যেটুকু টিকে আছে আজকের কৃষিসমাজ, সংকটকালে সেটুকুই সামাজিক সুরক্ষার কাজটি করে যাচ্ছে। কিন্তু চাহিদার তুলনায় তা পর্যাপ্ত নয়। তাই রাষ্ট্রকে মানুষের সামাজিক সুরক্ষা প্রদানের বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে।

শান্তিতে নোবেলজয়ী ও ক্ষুদ্র ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, 'পৃথিবীর পুরোনো ব্যবস্থা সবাইকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। কাঠামোগত পুনর্বিন্যাস খুবই জরুরি।' করোনা মহামারি আমাদের দেখিয়ে দিয়ে গেল, মহামারিপূর্ব ব্যবস্থাটি মানুষের সর্বাঙ্গীণ কল্যাণের জন্য যথেষ্ট ছিল না। আরও অনেক কিছুই করতে হবে। তাই মহামারিপূর্ব অবস্থায় নয়, তাকে ডিঙিয়ে নতুন পথের সন্ধান করতে হবে। আর সেই পথে সবচেয়ে বড় হয়ে দেখার বিষয়টি হবে মানুষের সামাজিক সুরক্ষার পাকাপোক্ত ব্যবস্থা করা। ঝড় এসে উড়িয়ে নিয়ে গেল। উড়িয়ে নিয়ে গেল চাকরি, আয়, ভাড়া করা বাসস্থান। তারপর কী হলো? কোথায় দাঁড়াল অসহায় মানুষ? কিছু লোক গ্রামে গেল, অন্তত প্রয়োজনীয় ডাল-ভাত জুটাতে পারল। তা-ও যারা করতে পারল না, তাদের সামাজিক সুরক্ষায় ব্যবস্থা কী- এ বিষয়টি ফের সামনে এলো। অধিকাংশ মানুষের মাথার ছাদটুকু ধরে রাখতে ভাড়াটা পর্যন্ত দেওয়ার সক্ষমতা থাকল না।

ভিয়েতনামে দেখেছিলাম, তাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর রাষ্ট্র দায়িত্ব নিয়ে বস্তিগুলো সরিয়ে দিয়ে সেখানে বড় বড় হাইরাইজ বিল্ডিং করে দিয়েছিল। ৩০০-৬০০ বর্গফুটের ছোট ছোট অ্যাপার্টমেন্ট তৈরি করে বস্তিবাসীর একেক পরিবারকে একেকটি ফ্ল্যাটে তুলে দিয়েছিল। হাতে চাবিটি বুঝিয়ে দিলেও মাসে মাসে সামান্য টাকা কেটে নেওয়ার পদ্ধতি বজায় রেখেছিল। মাথা গোঁজার জায়গাটি পেয়ে ভিয়েতনামের দরিদ্র বস্তিবাসী একসময় ঘুরে দাঁড়িয়েছিল, স্বাবলম্বী হয়েছিল। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতেও অ্যাপার্টমেন্টের পরিমাণ খুঁজে পাওয়া যায় ৪০০ থেকে ৬০০ বর্গফুটের মধ্যে। কম খরচে অধিক মানুষের বাসস্থানের সমস্যাটি সম্মানজনকভাবে সমাধানের এটি অন্যতম পথ। বাংলাদেশে এমন ব্যবস্থা সরকারের তত্ত্বাবধানে গড়ে ওঠেনি। প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তিও এভাবে ভেবে দেখেনি। তাই এখানে স্বল্প দামে ছোট ছোট ফ্ল্যাট ব্যাপক হারে তৈরি হয়নি। কিছু কিছু মাঝারি আকারের ফ্ল্যাট তৈরি হলেও মাসিক কিস্তিতে শোধ করার ব্যবস্থা এখানে এখনও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় রূপ নেয়নি। তাই ভাড়া দিয়ে বস্তিবাসী হওয়ার পরিবর্তে অন্য কোনো বিকল্প ব্যবস্থা এখানে গড়ে ওঠেনি।

বাংলাদেশের মতো দেশে সবার জন্য পেনশন ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারেনি এখনও সেভাবে। অথচ সামাজিক নিরাপত্তার খুব বড় একটি জায়গা হতে পারত এ ব্যবস্থা। যেসব দেশে পেনশন ব্যবস্থা শক্তভাবে দাঁড়িয়ে আছে, সেসব দেশে একটি প্রবাদ খুব জনপ্রিয়- 'নির্দিষ্ট বয়সে আপনি পেনশনে যাওয়ার পূর্বে মাথা গোঁজার স্থান এবং চলার সাথী গাড়িটি কিনে ফেলার চেষ্টা করুন।' বাকি থাকবে প্রতিদিনের খাওয়া ও ব্যক্তিগত খরচ। পেনশন নিশ্চিত করে দেবে সেই ব্যবস্থা। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অর্থকষ্টে অন্যের অনুগ্রহের কারণ হতে হবে না আপনাকে।

দেশকে উন্নতির পথে নিয়ে যাওয়ার জন্য কৃষি খাতের আধুনিকীকরণ খুবই জরুরি। কৃষি বাণিজ্যিকীকরণ করলে আজ কৃষি যে সামাজিক সুরক্ষা দিতে পারছে, তাও আর দিতে পারবে না। তাই রাষ্ট্রীয়ভাবে সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা না করে কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ প্রকল্প হাতে নেওয়া ঠিক হবে না। বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মতো একটি শক্ত সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা রাষ্ট্র জাতীয়ভাবে হাতে নেওয়ার বিষয়টি গভীরভাবে বিবেচনা করতে পারে। সরকার ইতোমধ্যে সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু এর পরিসর ও আঙ্গিক আরও বিস্তৃত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে নজর দিতে হবে বিশেষ করে গ্রামের দিকে।

অবসরপ্রাপ্ত মেজর, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী; কলাম লেখক
ceo@ilcb.net



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews